যশস্বী জয়সওয়াল। ছুঁলেন কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকরের রেকর্ড। সেঞ্চুরি করে ইংরেজ শাসন ভারতীয় ওপেনারের। ওভাল টেস্টের তৃতীয় দিনের শুরু থেকেই যশস্বী এবং আকাশ দীপ ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ‘নৈশপ্রহরী’ আকাশ দীপ আউট হন ৬৬ রানে। যশস্বী ১২৭ বলে সেঞ্চুরি করেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টেস্ট সেঞ্চুরি। কেরিয়ারে ষষ্ঠ। ছুঁয়ে ফেললেন কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকরকে। ওপেনার হিসেবে ৩৭টি টেস্টে চারটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। যশস্বী করেন ১০ ম্যাচে।তালিকায় ১৬ ম্যাচে ৫টি সেঞ্চুরি নিয়ে সবার উপরে আছেন কেএল রাহুল। যশস্বীর ইনিংস দেখতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন তাঁর পরিবারও। মা-বাবার সামনে সেঞ্চুরির কৃতিত্ব গড়ার সুযোগ ছাড়লেন না ২৩ বছর বয়সি ব্যাটার। সেঞ্চুরির উপর ড্রেসিংরুমের দিকে উড়ন্ত চুম্বনও ছুড়ে দিলেন। পায়ের পেশিতে সামান্য টান ধরলেও হাল ছাড়ার ক্রিকেটার নন যশস্বী। এই টেস্ট সিরিজে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় ব্যাটাররা ১২টি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। যা কোনও টেস্ট সিরিজে ভারতের নিরিখে সর্বোচ্চ। ১৯৭৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১১টি সেঞ্চুরি করেছিল ভারত। আকাশ দীপ, যশস্বী জয়সওয়ালদের ব্যাটে বেধড়ক মারে ইংরেজ শাসন। রবীন্দ্র জাদেজার হাফসেঞ্চুরি ইংল্যান্ডের জন্য ‘সুন্দর প্রহার’। ভারতের ইনিংস থামল ৩৯৬ রানে। ওভালে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের লক্ষ্য ৩৭৪ রান।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চলতি সিরিজ়ে শুভমন ৭৫৪ রান করেছেন। গড় ৭৫.৪০। একটা সিরিজ়ে ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে সব চেয়ে বেশি রান করার রেকর্ড গাওস্করের। ১৯৭১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ে মাটিতে ৭৭৪ রান করেছিলেন তিনি। মাত্র ২০ রানের জন্য সেই গড়তে পারলেন না শুভমন।ওভাল টেস্টে চতুর্থ দিনের খেলার শেষে মাঠে শুভমনকে জার্সি এবং টুপি উপহার গাভাসকারের। ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেটে ভাঙল ভারতের ৪৫ বছরের রেকর্ড। সানির অন্য একটা নজির অবশ্য শুভমান ভেঙে দিয়েছেন। ভারত অধিনায়ক হিসাবে একটা টেস্ট সিরিজে সবচেয়ে বেশি রান করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ১৯৭৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে সিরিজ়ে ভারত অধিনায়ক হিসাবে ৭৩২ রান করেছিলেন গাওস্কর। এই সিরিজ়ে ৭৫৪ রান করে সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন শুভমন। গাভাসকার বলেন, “ তুমি আমার রেকর্ড ভাঙবে ধরে নিয়ে তোমার জন্য উপহার এনেছিলাম। একটুর জন্য পারলে না। পরের সিরিজে নিশ্চয়ই পারবে। তবু তোমার জন্য যে ছোট্ট উপহার এনেছি সেটা তোমাকে দিতে চাই। খুব বেশি লোককে আমি এই টুপি দিই না। এতে আমার সই রয়েছে। এটা তোমার জন্য।” নিজের জামা অবশ্য গাওস্কর বার করেননি। সেটা ব্যাগের মধ্যেই ছিল। শুভমানকে গাওস্কর বলেন, “এক জন ‘এসজি’ লেখা এই জামাটা আমাকে দিয়েছিল। জানি না তোমার গায়ে এটা হবে কি না। তবু তোমাকে দিলাম।আমার লাকি সাদা জ্যাকেটটা পরে আসব। অস্ট্রেলিয়ার গাব্বায় শেষ দিন ওটা পরেছিলাম। কালও ওটা পরে মাঠে আসব।”

বিশেষ করে বলতে হয় ‘নৈশপ্রহরী’ আকাশ দীপের কথা। টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম হাফসেঞ্চুরি করলেন বাংলার এই পেসার। হাফসেঞ্চুরির পর তাঁকে বাহবা দিল গোটা স্টেডিয়াম। টিম ইন্ডিয়ার ড্রেসিংরুমেও উচ্ছ্বাস চোখে পড়ল। স্কোর বোর্ডে মহাগুরুত্বপূর্ণ ৬৬ রান যোগ করে ফিরলেন জেমি ওভারটনের বাউন্সার সামলাতে না পেরে। টেস্টে ভারতীয় নাইট ওয়াচম্যানের হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানে আকাশ। ভারত অধিনায়ক শুভমান গিল ১১ রানে আউট হন। করুণ নায়ার ১৭। ধ্রুব জুরেল ৩৪ রানে আউট। রবীন্দ্র জাদেজা ৫৪ রান। লর্ডসে জয় এনে দিতে পারেননি। ম্যাঞ্চেস্টারে সেঞ্চুরি করে ড্র করিয়েছিলেন। ওয়াশিংটন সুন্দর চার-ছক্কায় ৪৬ বলে ৫৩ করে আউট হন।

ভারত অল আউট ৩৯৬ রানে। লক্ষ্য ৩৭৪ রানে। হাতে দুদিনের বেশি সময়। ওভালে সর্বোচ্চ ২৬৩ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড আছে। দিনের শেষ ওভারে জ্যাক ক্রলিকে আউট করে মহম্মদ সিরাজ খানিকটা স্বস্তি দিয়েছেন দলকে। ওভাল টেস্ট জিততে ইংল্যান্ডের চাই আরও ৩২৪ রান। ভারতের দরকার ৮ উইকেট। চোট পেয়ে ছিটকে যাওয়া ক্রিস ওকস ব্যাট করতে পারবেন না। ম্যাচের তৃতীয় দিন ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হয় ৩৯৬ রানে। গুরুত্বপূর্ণ সময় যশস্বী জয়সওয়ালের ব্যাট থেকে এল ১১৮ রানের ইনিংস। রবীন্দ্র জাডেজা খেললেন ৫৩ রানের ইনিংস। ধ্রুব জুরেলের ব্যাট থেকে এল ৩৪ রান। ওয়াশিংটন সুন্দরও আগ্রাসী মেজাজে ৫৩ রান করলেন। তবে দিনের শুরুতে ভারতীয় ইনিংসের সুর বেঁধে দেন শুক্রবার নৈশপ্রহরী হিসাবে নামা আকাশদীপ। বাংলার জোরে বোলারের ব্যাটের হাত যে নেতাহই খারাপ নয়, তা প্রমাণ হয়ে গেল ওভালের সবুজ ২২ গজে। যশস্বীর সঙ্গে তৃতীয় উইকেটের জুটিতে শুধু ১০৭ রান তুললেন না আকাশদীপ। জুটির ৬০ শতাংশের বেশি রান এসেছে আকাশদীপের ব্যাট থেকেই। যশস্বী মূলত ২২ গজের এক প্রান্ত আগলে রাখার কাজ করলেন আর আকাশদীপ থাকলেন বিশেষজ্ঞ ব্যাটারের ভূমিকায়! প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আকাশদীপের সর্বোচ্চ রান ৫৩। টেস্টে সেই রানকেও টপকে গেলেন। ৯৪ বলে তাঁর ৬৬ রানের ইনিংস অনেকটা ভরসা দিল ভারতীয় শিবিরকে। প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস দিল শুভমন গিলদের। তাঁর অর্ধশতরানে হাসি ফুটবল কোচ গৌতম গম্ভীরের মুখেও! এ দিন ভারতীয় দলের টেলএন্ডার নিয়ে যাবতীয় সমালোচনার জবাব দিলেন আকাশদীপ। তাঁর ব্যাট থেকে এল ১২টি বাউন্ডারি। আকাশদীপের দেখানো পথে হাঁটতে পারলেন না অধিনায়ক শুভমন ১১। পারলেন না আট বছর পর টেস্ট দলে ফেরা করুণ নায়ারও ১৭। ফলে ২ উইকেটে ১৭৭ রান থেকে ৫ উইকেটে ২২৯ হয়ে যাওয়া ভারত খানিকটা চাপে পড়ে গিয়েছিল। সেই চাপ থেকে উদ্ধার করল যশস্বীর ষষ্ঠ টেস্ট শতরান। ইংল্যান্ডের ফিল্ডারেরা তিনটি ক্যাচ ফেলেছেন যশস্বীর। তাতে তরুণ ওপেনারের কৃতিত্ব কমে যায় না। শুভমন, করুণ, আকাশদীপ, জুরেল, সাই সুদর্শন সকলের ক্যাচ ফেলেছেন ইংরেজরা। এ ব্যাপারে পোপের দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন জ্যাক ক্রলি! যশস্বী-আকাশদীপের তৈরি করে দেওয়া ভিতের উপর অট্টালিকা গড়লেন জাডেজা, জুরেলরা। অর্ধশতরানের ইনিংস খেলে শিবিরে স্বস্তি এনে দিলেন জাদেজা। জুরেলও সাধ্য মতো লড়াই করলেন। ইংল্যান্ডের লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জিং করে তুললেন ওয়াশিংটন। দশম উইকেটের জুটিতে ৪.১ ওভারে ভারত তুলল ৩৯ রান। তাতে প্রসিদ্ধের অবদান শূন্য। চারটে চার আর চারটে ছক্কা মেরে ভারতকে ভাল জায়গায় পৌঁছে দিলেন তরুণ অলরাউন্ডার। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টেস্টে প্রথম শতরান করেছিলেন ওয়াশিংটন। সেই আত্মবিশ্বাসেই এ দিন শাসন করলেন ইংরেজ বোলারদের। তার মধ্যেই ১২৫ রানে ৫ উইকেট জস টংয়ের। জয়ের জন্য ৩৭৪ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে আগ্রাসী মেজাজেই শুরু করেন ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার বেন ডাকেট এবং ক্রলি। এই সিরিজ়েরই হেডিংলে টেস্টে ৩৭৩ রান তাড়া করে ৫ উইকেটে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল ইংল্যান্ড। ওভালেও সেই পথেই এগোনোর চেষ্টা করছেন তাঁরা। দিনের শেষ ওভারে ক্রলিকে ১৪ আউট করে দলকে কিছুটা স্বস্তিতে রাখলেন সিরাজ। ২২ গজে অপরাজিত আছেন বেন ডাকেট ৩৪।

ভারত-ইংল্যান্ড পঞ্চম টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা দেখতে গিয়েছেন ভারতের প্রাক্তন টেস্ট অধিনায়ক। গত আইপিএলের সময় টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। শুভমন গিলদের জন্য এই টেস্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত বেশ চাপে ছিল ভারতীয় শিবির। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং ব্যর্থতা চাপে রেখেছিল শুভমনদের। সেই পরিস্থিতিতে শনিবার সকালেই ওভালে পৌঁছে গেলেন রোহিত। না, তিনি চাপে থাকা ভারতীয় দলকে কোনও পরামর্শ দিতে যাননি। রোহিত গিয়েছেন দু’দলের লাল বলের লড়াই উপভোগ করতে। উল্লেখ্য, ভারতীয় দলের প্রায় সকলের সঙ্গেই খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে রোহিতের। টিকিট কেটে সাধারণ দর্শক হিসাবে খেলা দেখতে গিয়েছেন রোহিত। স্টেডিয়ামে ঢুকেছেন অন্য ক্রিকেটপ্রেমীদের সঙ্গে লাইন দিয়ে টিকিট দেখিয়ে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এক বন্ধু। তাঁদের স্টেডিয়ামে ঢোকার ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে সমাজমাধ্যমে। রোহিত এ ভাবে খেলা দেখতে যাওয়ায় বিস্মিত ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশ। তাঁর সহজ-সরল মানসিকতার প্রশংসা করেছেন অনেকে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের পর আন্তর্জাতিক ২০ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছিলেন রোহিত। গত আইপিএলের সময় টেস্ট ক্রিকেট থেকেও অবসর নিয়েছেন। দেশের হয়ে তিনি শুধু এক দিনের ক্রিকেট খেলছেন। এক দিনের দলের তিনিই অধিনায়ক।




