‘আমি কি ঘেয়ো কুকুর নাকি যে সকাল-সন্ধ্যা এ বাড়ি, ওই বাড়ি ঘুরে বেড়াব? যারা নিজেরা এই দল, ওই দল ঘুরে বেড়ায়, তারা এই ধরনের প্রচার করে। বিজেপি কর্মীরা বিকাউ নয়। মারলে রাজ্য ছাড়া হতে পারে, কিন্তু ঝান্ডা ছাড়া নয়। বিজেপির বহু কর্মী এই বাংলায় রাজনৈতিক লড়াইয়ে নিহত হয়েছেন। তাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতেই আজকের সভা। তবে আমার মনে হয় তৃণমূল এবার নিজেরাই শহিদ হয়ে যাবে। বিজেপি একুশে জুলাই শহিদ শ্রদ্ধাঞ্জলি সভা করছে এটা কি কোনও চমক নয়? তৃণমূল তো এতদিন এই দিনটায় নিজেদের একটা বাৎসরিক অনুষ্ঠান করে আসছে। ডিম ভাতের প্রোগ্রাম চলে। আমরা মনে করি, শহিদ তো আমাদের হয়েছে। যে শহিদদের নিয়ে এত নাটক, তারা তো কংগ্রেসের। তৃণমূলের সঙ্গে ওদের কী সম্পর্ক?’ কড়া ভায়ায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বিঁধলেন দিলীপ ঘোষ। এককথায় একুশে জুলাইয়ের দিন চমক। ‘শহিদ স্মরণ’। দূরত্ব প্রায় ১২৭ কিলোমিটার। ধর্মতলা তৃণমূলের ‘শহিদ’। অন্যদিকে পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরে বিজেপির ‘শহিদ’। বঙ্গ বিজেপি শুভেন্দু নেতৃত্বে উত্তরকন্যা অভিযান করতে চলেছে। সেই দিনেই অন্য কর্মসূচি দিলীপের। একুশে যেন ‘লড়াই’ রয়েছে বজায়। এদিন দিলীপ বলেন, ‘ উত্তরবঙ্গে বিজেপি কর্মীরা যাবেন। কিন্তু এখানে শুধু মেদিনীপুরের কর্মীরাই আসছেন।’

আমরা জয় মা কালী, জয় মা দুর্গা ও জয় শ্রী রামও বলব। সব বলব। কিন্তু কখনও জয় বাংলা বলব না। বাংলাদেশ থেকে স্লোগান নিয়ে আসবেন। পশ্চিম বাংলাদেশ বানানোর চেষ্টা করছেন। ২১ জুলাই মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আক্রমণ করেন দিলীপ ঘোষ। ধর্মতলায় তৃণমূলের শহিদ দিবসের সমাবেশের পাল্টা পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের গিরি ময়দানে শহিদ শ্রদ্ধাঞ্জলি সভা করে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে তাদের দুই শতাধিক কর্মী নিহত হয়েছেন। সেই নিহত কর্মীদের শ্রদ্ধা জানাতেই সভা করে বিজেপি। সেখানে উপস্থিত বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ দিলীপ ঘোষ মমতাকে একের পর এক আক্রমণ করে বলেন, “দিলীপ ঘোষ বিজেপিতে যাবে বলে যাঁরা কর্মীদের বিভ্রান্ত করেছিলেন, তাঁরা ডিম-ভাত খাওয়া পার্টি। বিজেপির কর্মীরা বিশ্বাস করেননি। তবে মাথায় একটু সন্দেহ এসেছিল। জেনে রাখুন, রক্ত দিয়ে, ঘাম দিয়ে পার্টি দাঁড় করিয়েছি। যতক্ষণ না নবান্নে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা বসছেন, ততক্ষণ এই লড়াই চলবে। ১০ বছর আগেও দিলীপ দলের কর্মী ছিলেন। আজও একজন কর্মী আছি। বিজেপি যতক্ষণ না ক্ষমতায় আসছে, কর্মী হিসেবে লড়াই করব। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরও দিলীপ কর্মী হিসেবে কাজ করবে। যাঁরা ঘাম ঝরিয়ে, রক্ত দিয়ে পার্টিকে দাঁড় করিয়েছেন, তাঁরা একটু বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। সাংবাদিক বন্ধুরা সকাল পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করেছেন, দিলীপদা কোন মঞ্চে থাকবেন? সবাই জানত, পশ্চিমবঙ্গে ২১ জুলাই একটাই মঞ্চ হত, সেটা ধর্মতলায়। খড়্গপুরে মঞ্চ হতে পারে, এটাই চমৎকর।” মা দুর্গা, মা কালীর আশীর্বাদে সব কিছু কেটে যাবে। সব বলব কিন্তু জয় বাংলা বলব না। বাংলাদেশের থেকে স্লোগান নিয়ে আসেন। বাংলাদেশ থেকে ভোটার নিয়ে আসা হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেবী দুর্গা, কালীকে স্মরণ করে দুর্গাপুরের সভায় বক্তব্য শুরু করেছিলেন। বেশ কিছুটা সময় বাংলা ভাষাতেও বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি।

একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে হুঙ্কার দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমোকে পাল্টা খোঁচা দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। মমতার ভাষা আন্দোলনের ডাক নিয়েও কটাক্ষ করলেন। একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে মমতা বলেন, বিজেপিকে কেন্দ্র থেকে ক্ষমতাচ্যুত না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠকে, রাজ্যে পরিবর্তন হচ্ছে জানিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি বলেন, “আমরা মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করি। তিনি শতায়ু হোন। কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী তাঁর জীবদ্দশায় কোনওদিন বিজেপিমুক্ত ভারত, বিজেপিমুক্ত কেন্দ্রীয় সরকার দেখে যেতে পারবেন না। আমাদের লড়াই, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই। বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই। সীমাহীন লোভ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার লড়াই। তৃণমূল কংগ্রেস বাংলা ভাষাকে আক্রমণ করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে আক্রমণ করছে তৃণমূল। ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।” মুখ্যমন্ত্রীকে জবাব দিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী বাঙালির উপর আক্রমণের কথা বলেন। বলছেন, জলের লাইন কেটে দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। হ্যাঁ হয়েছে। কারণ সেখানে (দিল্লিতে) বিজেপি সরকার রয়েছে। যারা আদালতের নির্দেশকে মান্যতা দেয়। একটি লাইন থেকে যেভাবে বিদ্যুৎকে ছড়ানো হয়েছিল, আদালতের নির্দেশে তা কাটা হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, বাঙালিকে তাড়াতে চায়। যারা ওপারে হিন্দুদের উপর অত্যাচার করে আবার এপারে এসে ঢুকছে। আমরা তাদের চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চাই। সিপিএমের আমল থেকে যেভাবে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় নাম তোলা হয়েছে, রেশন কার্ড পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, খাস জমি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই একই পথ অনুসরণ করে তৃণমূল কংগ্রেস আরও কদর্যভাবে পশ্চিমবঙ্গে তা বাস্তবায়িত করছে। রোহিঙ্গাদের ডেকে এনে বিভিন্ন বস্তিতে বসানো হয়েছে। কলকাতার ভিতরে বসানো হয়েছে। বিধাননগরে বসানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব জেলায় রোহিঙ্গাদের বসানো হয়েছে। বাংলাদেশের মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের এনে ভুয়ো আধার কার্ড বানিয়ে দেবেন, রেশন কার্ড বানিয়ে দেবেন। আর তাঁরা সেইসব কার্ড নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কাজ করবেন। আর তল্লাশিতে ধরা পড়ে যখন তাঁরা বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত হবেন, তখন মুখ্যমন্ত্রী বলবেন, বাঙালিদের উপর আক্রমণ। তৃণমূল কংগ্রেস চায়, রাজ্য নির্বাচন কমিশন যেমনভাবে কাজ করে, তেমনই কাজ করুক জাতীয় নির্বাচন কমিশন। নাম বাদ যাবে। লক্ষ লক্ষ নাম বাদ যাবে। পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকা হবে। এটা রাজ্যের মানুষ চায়। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমিয়ে দিয়েছেন। বেকারত্ব কমছে কীভাবে? চপ শিল্প, চায়ের দোকান, বিভিন্ন ছোট ছোট বিক্রেতাকে এমএসএমই-তে ঢুকিয়ে দেন ইন্সপেক্টররা। সেটাই এই পরিসংখ্যান। গত ১১ বছরে কত পরিযায়ী শ্রমিক পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ভিনরাজ্যে কাজ করছেন, মুখ্যমন্ত্রী তার উত্তর দিন। পশ্চিমবঙ্গের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা কেন বাংলা ছেড়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন? সামান্যতম আর্থিক সাচ্ছন্দ্য থাকলে বাবা-মা সন্তানকে উচ্চমাধ্য়মিকের পর ভিনরাজ্যে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কেন? পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বুঝতে পেরেছেন। এবার তাঁরা স্থির করেছেন, তৃণমূলকে বিসর্জন দেবেন। আজকে ওই মঞ্চ শহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নয়। বিজেপিকে আক্রমণ করার জন্য। বিভাজন করে আর পারছেন না। তাই বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরেছেন। ২০১৮ সালে বাংলা ভাষার জন্য দাড়িভিটে অল্পবয়সী ছেলে শহিদ হয়ে গেল। কী ব্যবস্থা নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? আমাদের মেধা আছে। সম্পদ আছে। আমরা গুজরাটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারি। গুজরাটকে অর্থনৈতিক দিক থেকে ছাপিয়ে যেতে পারি। সমস্ত সম্ভাবনা পশ্চিমবঙ্গের কাছে আছে। অভাব যেটা রয়েছে, সেটা ইচ্ছাশক্তির। তৃণমূল নামক অশুভ শক্তির হাত থেকে এ রাজ্যকে পরিত্রাণ দিতে চাই।”




