অনেকটা আকাশগঙ্গা বলা যেতে পারে। ১৩ হাজার ছায়াপথ অনায়াসে ধরে যেতে পারে ‘কিপু’র মধ্যে। মহাশূন্যের বৃহত্তম ‘মহাকাঠামো’। আবিস্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা! বহরে ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ। মহাকাশ গবেষণায় সন্ধান। সবচেয়ে বড় ‘মহাকাঠামো’। পাঁচটি মহাকাঠামো পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ব্রহ্মাণ্ডের প্রায় ১৩ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এই মহাকাঠামোগুলি। তারা আর গ্রহদের মিলে এক-একটি নক্ষত্রমণ্ডল। কোটি কোটি নক্ষত্র মিলে এক একটি ছায়াপথ। সেই ছায়াপথেরাও অনেক সময়েই পুঞ্জীভূত হয়ে থেকে এক-একটি ক্লাস্টার। এক বা একাধিক ক্লাস্টার নিয়ে এক-একটি মহাকাঠামো বা সুপারস্ট্রাকচার। একটি মহাকাঠামোকে বিজ্ঞানীরা ব্রহ্মাণ্ডের অন্তর্গত বৃহত্তম কাঠামো বললেন। চেহারা দেখে মহাবিশ্বের ‘দানব’ও বলা যায়। প্রায় ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ অর্থাৎ এক বছরে আলো যতটা পথ অতিক্রম করে সেই দূরত্বকে এক আলোকবর্ষ জুড়ে ছড়িয়ে। মহাকাঠামোকে দেখতে অনেকটা প্যাঁচালো। দড়ির গিঁটের মতো। কৃত্রিম উপগ্রহের এক্স রে টেলিস্কোপের ছবি বলছে। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘কিপু’। শব্দটি এসেছে প্রাচীন ইনকা সভ্যতা থেকে। সেই সময় কোনও তথ্যের রেকর্ড রাখার জন্য ‘কিপু’ নামে গিঁটযুক্ত একটি দড়ি ব্যবহার করা হত। মহাজাগতিক কাঠামোর নামকরণ ‘কিপু’ এতটাই বড় যে, তার হিসাব কষতে গিয়ে মাথা গুলিয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রচুর নাম না-জানা ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি। ‘কিপু’ একা নয়, এমন আরও অনেক মহাকাঠামো ছড়িয়ে রয়েছে ব্রহ্মাণ্ডে। ‘কিপু’র মতো দানবাকার চেহারা আর কারও নেই। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব ৪২ থেকে ৮১ কোটি আলোকবর্ষের মধ্যে। মহাজাগতিক কাঠামোর মধ্যেই ছায়াপথ রয়েছে। বা উল্টোটাও বলা যেতে পারে, অনেকগুলি ছায়াপথকে নিয়ে তৈরি হয় একটি মহাজাগতিক কাঠামো। আসলে মাধ্যাকর্ষণের টানে ছায়াপথগুলি একে অপরের কাছাকাছি চলে এসে একটি গুচ্ছ তৈরি করে। ছায়াপথগুলির এমন এক বা একাধিক গুচ্ছকে নিয়ে গঠিত হয় মহাজাগতিক কাঠামো। ছায়াপথের নাম ‘মিল্কি ওয়ে’ বা আকাশগঙ্গা। সূর্যের মতো বহু নক্ষত্রকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ছায়াপথটি। আকাশগঙ্গাও একটি কাঠামোর অংশ। নাম ‘ভার্গো’। আকাশগঙ্গার নিকটতম ছায়াপথ ‘অ্যান্ড্রোমেডা’ও এই কাঠামোরই অংশ। ‘ভার্গো’ আরও বড় একটি মহাজাগতিক কাঠামো ‘লানিকিয়া’র অংশ। ‘কিপু’র কাছে এরা সকলেই যেন তুচ্ছ। ‘লানিকিয়া’র থেকে প্রায় আড়াই গুণ বড় ‘কিপু’। মহাজাগতিক কাঠামো ‘লানিকিয়া’র ব্যাপ্তি ৫২ কোটি আলোকবর্ষ জুড়ে। ‘কিপু’ ছড়িয়ে রয়েছে ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ জুড়ে। আকাশগঙ্গার মতো ১৩ হাজারটি ছায়াপথ অনায়াসে ধরে যেতে পারে ‘কিপু’র মধ্যে। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষক হ্যান্স বোরিঙ্গারের নেতৃত্বে এক দল বৈজ্ঞানিক সম্প্রতি এই কাঠামোটি খুঁজে পেয়েছেন। জার্মানির রোস্যাট এক্স-রে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে মহাকাশ জরিপ করার সময় এটির সন্ধান মেলে। ‘কিপু’ ছাড়াও চারটি মহাকাঠামোর খোঁজ মিলেছে। বাকি চারটিও আকারে বড় হলেও ‘কিপু’র মতো নয়। গবেষণায় সন্ধান পাওয়া পাঁচটি মহাজাগতিক কাঠামোকে ‘সুপার ক্লাস্টার’ বলে বর্ণনা করেছেন বিজ্ঞানীরা। বাকিগুলির নাম দেওয়া হয়েছে— ‘সার্পেন্স-কোরোনা বোরিয়ালিস, হারকিউলিস, স্কাল্পটর-পেগাসাস এবং শ্যাপলি। ‘কিপু’র তথ্য বিশ্লেষণ করার আগে পর্যন্ত ‘শ্যাপলি’কেই সবচেয়ে বড় মহাজাগতিক কাঠামো হিসাবে বিবেচনা করা হত। কিন্তু ‘কিপু’ সব হিসাব গুলিয়ে দিয়েছে। ব্রহ্মাণ্ডের ১৩ শতাংশ জুড়ে পাঁচ ‘দানব’। এই পাঁচটি কাঠামো মিলিয়ে মোট ১৮৫টি ছায়াপথপুঞ্জ রয়েছে। তার মধ্যে শুধুমাত্র ‘কিপু’তেই রয়েছে ৬৮টি ছায়াপথপুঞ্জ। তবে শুধু ছায়াপথই নয়, ‘কিপু’তে রয়েছে প্রচুর ‘ডার্ক ম্যাটার’ দৃশ্যমান নয়। এই অংশগুলিতে এখানে আলো বা তড়িদচৌম্বকীয় বিকরণ পৌঁছাতে পারে না। ফলে এর মধ্যে কী রয়েছে তা টেলিস্কোপের মাধ্যমে বিজ্ঞানী জানতে পারেন না। গবেষকদের অনুমান, ব্রহ্মাণ্ডের মোট ছায়াপথপুঞ্জের ৪৫ শতাংশই রয়েছে এই পাঁচটি মহাজাগতিক কাঠামোয়। গবেষণায় মহাবিশ্বের প্রায় ১৩ শতাংশ জুড়ে এই পাঁচটি মহাজাগতিক কাঠামো ছড়িয়ে।
আকাশ ভরা সূর্য-তারা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড। পৃথিবী তারই এক কোণের বাসিন্দা। পৃথিবী এবং সূর্যের মতো এমন অজস্র গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহ, ধূমকেতু রয়েছে ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে। পাক খেয়ে চলবে একে অপরের চারপাশে? কালের নিয়মে কখনও কেউ ধ্বংস হবে। কখনও আবার কোনও উৎস থেকে জন্ম নেবে নতুন মহাজাগতিক অস্তিত্ব? গ্রহ-নক্ষত্র সম্বলিত এই ব্রহ্মাণ্ড ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। মহাশূন্যে ঘটে চলেছে তার বিস্তৃতি। বিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশ এ বিষয়ে এক মত ছিলেন যে, এই প্রসারণ অনন্ত। এর কোনও শেষ নেই। অনন্তকাল ধরে মহাশূন্যে এমন ভাবেই প্রসারিত হবে ব্রহ্মাণ্ড। ভিতরে কালের নিয়মে গ্রহ-নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু ঘটে চলবে। তাতে ব্রহ্মাণ্ডের সার্বিক পরিধিতে কোনও পরিবর্তন হবে না। বিজ্ঞানীদের একাংশের গবেষণা ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মহাবিশ্বের প্রসারণ অনন্ত, অসীম। মানতে রাজি নন। প্রসারণ শেষে এক দিন আবার শুরু হবে সঙ্কোচন। ধীরে ধীরে চুপসে যাবে ব্রহ্মাণ্ড। সঙ্কুচিত হয়ে আসবে তার ব্যাপক পরিধি। বিজ্ঞানীদের সেই তত্ত্ব নিয়েই সম্প্রতি পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। মিলেছে উত্তর! ব্রহ্মাণ্ডের সেই পরিধির সময়সীমাও বলে দিয়েছে গবেষণা! আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, চিনের সংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পদার্থবিদেরা এই সংক্রান্ত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, ব্রহ্মাণ্ডের আয়ু ৩.৩৩ হাজার কোটি বছর। তার মধ্যে প্রায় ১.৪ হাজার কোটি বছর কেটে গিয়েছে। ব্রহ্মাণ্ডের বয়স এখন ১.৩৮ হাজার কোটি বছর। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, হাতে আছে আরও প্রায় দু’হাজার কোটি বছর। যবনিকা পতন! ব্রহ্মাণ্ডের ইতি! দু’হাজার কোটি বছরের মধ্যে আরও ৭০০ কোটি বছর ধরে ব্রহ্মাণ্ডের সম্প্রসারণ ঘটবে। ১.৩ হাজার কোটি বছরে চলবে সঙ্কোচন। সঙ্কুচিত হতে হতে একটি মাত্র বিন্দুতে পরিণত হবে মহাবিশ্ব। একটি বিন্দু, যার কোনও দৈর্ঘ্য নেই, প্রস্থ নেই, নেই উচ্চতা! ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্বের বিপরীতে এ যেন এক বিপুল ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ তত্ত্ব। গোটা বিষয়টিকে একটি বিশাল গার্ডারের রবার ব্যান্ডের সঙ্গে তুলনা। গার্ডারকে টানলে তা ক্রমশ প্রসারিত হয়, ব্রহ্মাণ্ডও তেমন কোনও অদৃশ্য শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দিন দিন ছড়িয়ে পড়ছে। একটা এমন সময় আসবে, যখন এই শক্তি প্রসারণের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াবে। তখন গার্ডারের সঙ্কোচন অনিবার্য। ‘ডার্ক এনার্জি সার্ভে’র মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা। ব্যবহার করেছেন ‘ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কোপিক ইনস্ট্রুমেন্ট। এই ‘ডার্ক এনার্জি’ বা ‘আঁধার শক্তি’তেই গবেষণার মূল নিহিত। অদৃশ্য রহস্যময় শক্তি যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ৭০ শতাংশ তৈরি করেছে বলে দাবি গবেষকদের। এই শক্তিই রয়েছে ‘গার্ডারের’ প্রসারণের নেপথ্যেও। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ‘আঁধার শক্তি’ হল একটি মহাজাগতিক ধ্রুবক, যা ব্রহ্মাণ্ডের উপর নিরন্তর চাপ বহাল রাখে। কিন্তু নতুন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এই ডার্ক এনার্জি ধ্রুবক না-ও হতে পারে। এটি নিজেও হতে পারে গতিশীল। অতিসূক্ষ্ম কণা অ্যাক্সিয়ন এবং ঋণাত্মক মহাজাগতিক ধ্রুবকের সাহায্যে তাঁরা একটি মডেল তৈরি করে উঠে এসেছে ৭০০ কোটি বছরের প্রসঙ্গ। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রসারিত হতে হতে ব্রহ্মাণ্ড যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছোবে, তখন তার আকার হবে বর্তমানের চেয়ে ৬৯ শতাংশ বড়। অর্থাৎ, আগামী ৭০০ কোটি বছরে ব্রহ্মাণ্ড আরও ৬৯ শতাংশ প্রসারিত হবে। তার পর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং ঋণাত্মক মহাজাগতিক ধ্রুবকের কাজ শুরু হবে। শুরু হবে সঙ্কোচন। তার পরে আসবে ‘শেষের সে দিন’! ২ হাজার কোটি বছরের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। এই সময়সীমা পর্যন্ত পৃথিবী বা সূর্য, কেউই ‘বেঁচে’ থাকবে না। পৃথিবীতে প্রাণ থাকবে আরও ৬০ কোটি বছর। ২ হাজার কোটি বছরে সূর্যেরও মৃত্যু হবে। আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বিলীন বতে পারে অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সির সমসময়ে।




