Friday, July 17, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

লর্ডসের ময়দান থেকে দেশের দাদা হয়ে ওঠা! জন্মদিনের স্মৃতিচারণে সৌরভ-ডোনার প্রেম পর্বের কত কথা?‌

মহারাজের শুভ জন্মদিন। ৫২ পেরিয়ে ৫৩-তে পা দিলেন বাংলার গর্ব সৌরব গঙ্গোপাধ্যায়। সৌরভ তার ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে “মহারাজ” ডাকনামটি পেয়েছিলেন। ডানহাতি হওয়া সত্ত্বেও, সৌরভ বাঁ-হাতে ব্যাটিং শুরু করেছিলেন কারণ তাঁর দাদা স্নেহাশিসের কিট দিয়ে তিনি ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। দাদা স্নেহাশিস গাঙ্গুলি ছোট থেকেই বাঁ-হাতি ছিলেন। বড় হওয়ার সময়, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাবা চণ্ডীদাস গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ছেলের দক্ষতা ও ফিটনেস বৃদ্ধির জন্য বাড়িতে একটি জিম তৈরি করেছিলেন। ১৯৯০ সালের রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে সৌরভের অভিষেক। একটি তিক্ত-মধুর দিন। কারণ এই ম্যাচেই তাঁর দাদা স্নেহাশিস স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েন। যার ফলে ছোট ভাই মাঠে নামার সুযোগ পান। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে তিনটি সেঞ্চুরি করা ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় ছিলেন সৌরভ। ২০০২ সালে ভারতকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথভাবে জন্য জিতিয়েছিলেন। টেস্ট কেরিয়ার জুড়ে, প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভের ব্যাটিং গড় কখনও ৪০ এর নিচে নামেনি। তৎকালীন অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিনের খারাপ আচরণের অভিযোগ করে নভজ্যোত সিং সিধু ভারতীয় দল ছেড়ে যাওয়ার পরেই সৌরভ লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টে খেলেন। যেসব টেস্ট ম্যাচে সৌরভ সেঞ্চুরি করেছেন, সেগুলিতে ভারত কখনও হারেনি। ১৬টি টেস্ট সেঞ্চুরিতে ১২টিতে জয় এবং ৪টি ড্র। কুমার সাঙ্গাকারা বছরের পর বছর ধরে অসংখ্যবার সৌরভের প্রতিপক্ষ হিসেবে খেলেছেন। সাঙ্গাকারার কথায়, সৌরভ “গেমসম্যানশিপের শিল্পে একজন ওস্তাদ” ছিলেন। টেস্ট বোলার হিসেবে, ইডেন গার্ডেন্স ছিল সৌরভের সবচেয়ে সফল শিকারের মাঠ। পাঁচটি উইকেট নেন। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ২৮ রানে ৩ উইকেট ছিল দীর্ঘ ফরম্যাটের খেলায় তাঁর সেরা বোলিং পারফরম্যান্স।

সৌরভ এবং ডোনার প্রেম কাহিনি সিনেমাকেও হার মানিয়ে দিতে পারে। ছোট থেকে দুজনে প্রতিবেশী। পরে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ধীরে ধীরে সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এক সফল দাম্পত্য জীবনে উপনীত হন দুজন। সৌরভ এবং ডোনা দুজনেই কলকাতার বেহালায় প্রতিবেশী হিসেবে বড় হয়ে উঠেছেন। ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে পরিচয় ছিল। সৌরভ গলিতে ক্রিকেট খেলতেন। বল ডোনার বাড়িতে পড়লে কুড়োতেও গিয়েছেন একাধিকবার। পরে একবার টিউশন পড়ার জন্যও ডোনাকে পৌঁছে দিয়ে এসেছিলন সৌরভ। আজতক বাংলাকে ডোনা জানিয়েছিলেন, সেটাই তাদের প্রথম একসঙ্গে বাইরে বেরনো। চাইনিজ রেস্টুরেন্টটেও নাকি গিয়েছিলেন সেদিন। লুকিয়ে বিয়ে করেন দুজনে। যদিও একে অপরকে ভালোবাসতেন। বিয়ের বিষয়ে পরিবারের তরফে সম্মতি নিয়ে একটু টানাপোড়েন ছিল। যে কারণে তাদের লুকিয়ে বিয়ে করতে হয়। পরে ম্যারেজ রেজিস্ট্রার সেই খবর ফাঁস করে দেন। ১৯৯৬ সালের ১২ই আগস্ট, পরিবারের কাউকে না জানিয়েই সৌরভ ও ডোনা আইনিভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। গোপন বিয়ের পরেই সৌরভ শ্রীলঙ্কা সফরে চলে যান। গোপন বিয়ের খবর একসময় দুই পরিবারেই পৌঁছে যায়। প্রথমে প্রচণ্ড রাগ ও ক্ষোভ থাকলেও, ভালোবাসার গভীরতা বুঝতে পেরে অবশেষে উভয় পরিবারই তাদের সম্পর্ক মেনে নেয়। এক বছর পর ১৯৯৭ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি, দুই পরিবারের উপস্থিতিতে সমস্ত রীতিনীতি মেনে সৌরভ ও ডোনার সামাজিক বিবাহ সম্পন্ন হয়। ছোট থেকে দুজনের মধ্যে ভালোবাসা ও প্রেম ও দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে তাঁদের বিবাহিত জীবন একটা যথার্থ প্রেমের উদাহরণও বটে। নানা সময় সৌরভ স্বীকার করেছেন, তাঁর জীবনে ‘ম্যাডামের’ ভূমিকা। ফলে জন্মদিনে এই প্রেম কাহিনির কথা যেন না বললেই নয়।

লর্ডসের ময়দান থেকে দেশের দাদা হয়ে ওঠা! সৌরভের কথা আজও রক্ত গরম করে তরুণ প্রজন্মকে। অনেকেরও আদর্শ তিনি। ভারতীয় ক্রিকেটে এনেছেন বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন। ১৯৭২ সালের ৮ই জুলাই বেহালায় জন্ম। ১৯৯৬ সালে লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অভিষেক টেস্টেই সেঞ্চুরি করে ক্রিকেট বিশ্বে সাড়া ফেলে দেন সৌরভ। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় দল ২০০০-এর দশকে টেস্ট এবং ওয়ানডে উভয় ফর্ম্যাটেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে। ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায় তাঁর নেতৃত্বে ভারত ২০০৩ সালে। সৌরভের নেতৃত্বেই ভারত ২০০০ সালের আইসিসি নকআউট ট্রফি বর্তমানেচ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতে, যা ছিল আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টে ভারতের প্রথম বড় জয়। বিদেশের মাটিতে টেস্ট জেতার ক্ষেত্রে তিনি ভারতকে নতুন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ভারত অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিরুদ্ধে তাদের ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজ জেতে। যুবরাজ সিং, হরভজন সিং, বীরেন্দ্র শেবাগ, জহির খান এবং মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে তাঁর নেতৃত্বেই জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এককথায় তিনিই তৈরী করেন টিম ইন্ডিয়া।

‘‘দারুণ বোলিং করেছিস। তোকে এবার পাঁচ উইকেট নিতে হবে। শুধু সামনে বল করবি আর সুইং করাবি। তা হলেই হবে।’’ কথাগুলো আকাশকে বলেছিলেন স্বয়ং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। আকাশ দীপের টেস্টের দু’ইনিংস মিলিয়ে দশ উইকেট! বাংলাও উৎফুল্ল। আকাশ বাংলার ক্রিকেটার। তাঁর হাত ধরেই এজবাস্টনে ইতিহাস সৃষ্টি। এজবাস্টনের আকাশ সাফল্য এনে দিলেন সিএবি-র ‘ভিশন ২০২০’ প্রোজেক্টকেও। বর্তমানে যা ভিশন ২০২৫ বলে পরিচিত। যার সূচনা হয়েছিল ভারতবর্ষেরই এক অন‌্যতম শ্রেষ্ঠ অধিনায়কের হাত ধরে। কিংবদন্তি সৌরভ গঙ্গোপাধ‌্যায়! সৌরভ বহু আগে বুঝেছিলেন যে, প্রতিভা তুলে নিয়ে আসতে গেলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প প্রয়োজন। রাতারাতি ‘তারকা’ তৈরি করা যাবে না। সেই ভাবনা থেকেই শুরু ‘ভিশন ২০২০’। প্রথমে পেস বোলিং কোচ হিসেবে ওয়াকার ইউনিসকে নিয়ে এসেছিলেন সৌরভ। স্পিন বিভাগে মুথাইয়া মুরলিধরন। ব‌্যাটিং ভিভিএস লক্ষ্মণের উপর। ওয়াকার ইউনিসচলে যাওয়ার পর সেই জায়গায় আসেন টি এ শেখর। বাংলার রণদেব বসুদের মতো প্রাক্তন ক্রিকেটারের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতেন আকাশরা। বঙ্গ পেসারের উত্থানের নেপথ‌্য অনেকের অবদান রয়েছে। আকাশ তখন সদ‌্য বাংলা ক্রিকেটে পা রেখেছেন। ইউনাইটেডের হয়ে খেলছেন। মনোজ তিওয়ারি ক্লাব ম‌্যাচে আকাশকে দেখার পরই ফোন করেন রণদেবকে। বলেন, ছেলেটার উপর নজর রাখতে। মনোজের কথা শুনে রণদেবও ক্লাব ম‌্যাচে আকাশকে দেখতে চলে যান। সঙ্গে জয়দীপ মুখোপাধ‌্যায়। প্রথম দেখার পরই রণদেব, জয়দীপরা বুঝে যান এই ছেলের মধ্যে দেশের হয়ে খেলা মশলা রয়েছে। রণদেব বসু, সৌরাশিস লাহিড়ী, লক্ষ্মীরতন শুক্লাদের অবদানও আকাশের ক্রিকেট জীবনে অপরিসীম। বাংলার অনূর্ধ্ব ২৩ টিমের কোচ থাকার সময় সৌরাশিস প্রতিটা মুহূর্তে আগলে রেখেছিলেন আকাশকে। মাঝে চোট-সমস‌্যায় ভুগছিলেন আকাশ। কিন্তু সৌরাশিস টিমের থেকে কখনও দূরে রাখেননি তাঁকে। বাংলা কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্লা আবার আকাশকে বুঝিয়েছিলেন, পাটা উইকেটে কোন লাইন-লেংথে বোলিং করলে সাফল‌্য পাওয়া যাবে। লক্ষ্মীরতন শুক্লা বলেন, ‘‘আকাশের ক্রিকেটজীবনে সবচেয়ে বড় অবদান সৌরাশিসের।’’ ‘ভিশন প্রোজেক্ট’ শুরু করে শুধু আকাশ-মুকেশদের তুলে আনা নয়। এজবাস্টন টেস্ট চলাকালীন আকাশকে কিছু পরামর্শও দেন। সাফল‌্যের মন্ত্র দিয়ে দেন। প্রথম ইনিংসে আকাশ চার উইকেট নেওয়ার পর সৌরভ এক বার্তায় আকাশকে বলেন, ‘‘দারুণ বোলিং করেছিস। তোকে এবার পাঁচ উইকেট নিতে হবে। শুধু সামনে বল করবি আর সুইং করাবি। তা হলেই হবে।’’ এজবাস্টন টেস্ট দেখতে গিয়েছিলেন সৌরভ। সৌরভ বললেন, “আকাশ-মুকেশ দু’জনের কথাই বলতে হবে। দু’জনেই ভিশন ২০২০ থেকে উঠে এসেছে। আসলে এভাবেই ক্রিকেটারদের তুলে নিয়ে আসতে হয়। ঠিক এই লক্ষ‌্য নিয়েই আমরা ভিশন প্রোজেক্ট শুরু করেছিলাম। যাতে ক্রিকেটারদের সঠিক ট্রেনিং করানো যায়। আর সবসময় সাপোর্ট করা যায়। এজবাস্টনে ভারতীয় দল দুর্দান্ত খেলেছে। প্রথমে ব‌্যাটিং। তারপর বোলারদের এরকম পারফরম‌্যান্স। বিশেষ করে আকাশ আর সিরাজ। দু’জনেই ব্রিলিয়ান্ট বোলিং করল। ইংল‌্যান্ডের থেকে ভারতীয় বোলিং অ‌্যাটাককে অনেক বেশি ভয়ংকর দেখিয়েছে। মনে রাখতে হবে ভারত এরকম পারফর্ম করল বুমরাহকে ছাড়া। অধিনায়ক হিসেবে গিলের কাছে এর থেকে ভালো টেস্ট জয় আর কিছু হয় না। ” সিএবি প্রেসিডেন্ট স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় ভিশন প্রোজেক্টের কথা প্রসঙ্গে বলেন, “এটা সিএবির প্রাক্তন সচিব আর প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ‌্যায়ের প্রোজেক্ট। ঠিক এই কারণের জন‌্যই অ‌্যাসোসিয়েশনের পদে ক্রিকেটার দরকার। কারণ ক্রিকেটারদের নির্দিষ্ট একটা ভিশন থাকে। যেটা তারা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আকাশ, মুকেশ ভিশন থেকে উঠে এসেছে। সৌরভ যেটা করেছিল, সেটা আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। অনেক প্লেয়ার উঠে আসছে।”

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু বিখ্যাত উক্তি —
ক্রিকেট আমার কাছে শুধু একটা খেলা নয়, এটা আমার জীবন।
নেতৃত্ব মানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া, শুধুমাত্র কথা বলা নয়।
বিশ্বাস রাখো নিজের উপর, কঠিন সময়েও মাথা উঁচু করে দাঁড়াও।
হারলে শেখা যায়, কিন্তু জিতলে আরও আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
প্রতিটি পরাজয় একটি নতুন শুরুর সুযোগ নিয়ে আসে।
চাপ হলো এমন এক জিনিস যা আপনাকে আরও ভালো পারফর্ম করতে সাহায্য করে।
সাফল্য কোনো একক ঘটনা নয়, এটা প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টার ফল।
নিজের খেলা উপভোগ করো, ফল আপনা আপনি আসবে।
টিম ওয়ার্ক হলো সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
কখনো হাল ছেড়ো না, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles