Saturday, July 11, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ঘুচল ‘চোকার্স’ তকমা!‌ বিশ্বের একমাত্র অধিনায়ক হিসাবে রেকর্ড!‌ মহাকাব্যিক কীর্তি বাভুমার, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে টেস্ট বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন

১৯৯৮ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। নির্বাসন কাটিয়ে ফেরার সাড়ে তিন দশক পর টেস্ট ক্রিকেটের সিংহাসনে। ‘চোকার্স’ তকমা ঘোচালেন বাভুমা। মার্করামেরা ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল জিতলেন। ১০৪ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙে ইতিহাস তেম্বা বাভুমা বিশ্বের প্রথম প্লেয়ার হিসেবে গড়লেন মহাকাব্যিক কীর্তি। আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল ম্যাচে, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে পরাজিত করে দক্ষিণ আফ্রিকা। দক্ষিণ আফ্রিকার সব খেলোয়াড়ই ভালো পারফর্ম করে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকা ২৭ বছর পর কোনও আইসিসি টুর্নামেন্ট জিতল। ১৯৯৮ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছিল। তেম্বা বাভুমার নেতৃত্বে দলের ঐতিহাসিক জয়। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম বার আইসিসি টুর্নামেন্টের নকআউট ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করল। দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহাসিক জয় ২৭ বছরের ট্রফির অপেক্ষার অবসান। দক্ষিণ আফ্রিকা হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। বারবার প্রোটিয়াদের হৃদয় ভাঙা। অধিনায়ক তেম্বা বাভুমা ইতিহাস বদলে দিলেন এবং এই ফাইনাল জিতে। ভক্তদের একটি বিশেষ উপহার দিলেন।ওয়ানডে বিশ্বকাপ হোক বা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, অথবা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি- কোনও টুর্নামেন্টেরই নকআউট পর্বে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একটিও ম্যাচ জিততে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। পরাজয়ের ধারায় অবশেষে ইতি টানলেন বাভুমারা।

অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে জয়ের ফলে বাভুমা ১০৪ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙেও ইতিহাস লিখেছেন। এই জয় অনন্য অধিনায়কত্বের রেকর্ড। ১৯২০-২১ সালে অস্ট্রেলিয়াকে নেতৃত্ব দেওয়া ওয়ারউইক আর্মস্ট্রংয়ের অধিনায়কত্বের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন বাভুমা। বিশ্বের একমাত্র অধিনায়ক হিসাবে একটিও টেস্ট না হেরে ১০টির মধ্যে নয়টি টেস্টেই জিতেছেন। ইতিহাসের দ্বিতীয় অধিনায়ক ১০টি ম্যাচে নেতৃত্ব দেওয়ার পরও অপরাজিত। পার্সি চ্যাপম্যানের পর বাভুমা টেস্ট ক্রিকেটে নয়টি জয় অর্জনকারী দ্বিতীয় দ্রুততম অধিনায়ক হয়ে উঠেছেন। তেম্বা বাভুমা এবং তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকা দল পুরো অস্ট্রেলিয়ান দলের দর্প ভেঙে দিয়েছেন। অজি দলের তিন খেলোয়াড়ের রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছেন। মিচেল স্টার্ক, জশ হেজেলউড এবং প্যাট কামিন্স। জশ হ্যাজেলউড এবং মিচেল স্টার্ক কখনও কোনও টুর্নামেন্টের আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া ফাইনালে হারেননি। অস্ট্রেলিয়ান দলের অধিনায়ক হিসেবে, প্যাট কামিন্স কখনও আইসিসি ফাইনালে হারেননি। শেষ বার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল এবং ২০২৩ বিশ্বকাপ শিরোপাও জিতেছিলেন। তেম্বা বাভুমারা এই তিন খেলোয়াড়ের রেকর্ড ভেঙে দেন এবং আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৫-এর ফাইনাল ম্যাচ জিতে নেন। বাভুমাই একমাত্র অধিনায়ক, যিনি কোনও টেস্ট ম্যাচ হারেননি।

১৯১১ সালে ব্রিটিশ ক্লাব ইস্ট ইয়র্কশায়ারকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জিতেছিল মোহনবাগান। পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই জয়ে যা গুরুত্ব ছিল তার থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার জয় কোনও অংশে কম নয়। অ্যাপার্থেইড পলিসি বর্ণবিদ্বেষ-র কারণে ২১ বছর নির্বাসনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা ফিরে এসে ১৯৯৮ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতেছিল বটে, কিন্তু বিশ্বক্রিকেটে কৌলিন্য পায়নি। উল্টে ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল থেকে জুড়ে গিয়েছে ‘চোকার্স’ তকমা। অ্যালান ডোনাল্ড, শন পোলক, জাক কালিস, এবি ডিভিলিয়ার্সেরা সেই তকমা মুছতে পারেননি। ঘোচালেন টেম্বা বাভুমা, এডেন মার্করাম, কাগিসো রাবাডারা। মার্করাম ১৩৬ রান করে যখন সাজঘরে ফিরছেন, তত ক্ষণে দলের জয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে।

২৭ বছর পর আরও এক বার আইসিসি ট্রফি জয়ী দক্ষিণ আফ্রিকা। নির্বাসন কাটিয়ে ফেরার সাড়ে তিন দশক পর টেস্ট ক্রিকেটের সিংহাসনে। চাপে পড়লেও ‘চোকার্স’ নন বাভুমা, মার্করামেরা। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে সেই তকমা জুটেছিল। অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েই মুছল। দ্বিতীয় ইনিংসে কামিন্স, স্টার্ক, হেজলউডদের তেমন সুযোগ দিলেন না বাভুমা ও মার্করাম। উল্টে যত সময় গড়াল তত কাঁধ ঝুঁলে গেল কামিন্সদের। রক্ষণাত্মক হয়ে পড়লেন অসি অধিনায়ক। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। ব্রিটিশদের হাত ধরে ১৮৮০ সালে সেখানে ক্রিকেট শুরু। ধীরে ধীরে তার বিস্তার। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার পর তারাই তৃতীয় দেশ যারা টেস্ট খেলেছে। এই দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে ঝড় বয়ে গিয়েছিল ১৯৭০ সালে। সেই সময় তাদের ক্রিকেটে অ্যাপার্থেইড পলিসি চলছে। কোনও কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটারদের নেওয়া হচ্ছে না। তারই শাস্তি পায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ২১ বছর নির্বাসিত করা হয় তাদের। আইসিসির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা কিছু টেস্ট খেলেছিল। স্বীকৃতি পায়নি। অবশেষে ১৯৯১ সালে নতুন পলিসি আনার পরে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আবার ক্রিকেট খেলার অনুমতি দেয় আইসিসি। দলে নির্দিষ্ট সংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার রাখতে হবে, সেই মর্মেই আবার ক্রিকেটে ফেরে। নির্বাসন কাটিয়ে ফেরার পর ১৯৯২ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট খেলেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই টেস্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে তৎকালীন বিসিসিআই সভাপতি জগমোহন ডালমিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান আলি বাখারের ভূমিকা ছিল দেখার মতো। বিশেষ করে ডালমিয়ার উদ্যোগেই হয়েছিল সেই ম্যাচ। কপিল দেবের ভারতের কাছে সেই ম্যাচ হেরেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে দীর্ঘ ২২ বছর পর আবার লাল বলের ক্রিকেটে দেখা যায় প্রোটিয়াদের।

ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনের পরের বছর ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে প্রথম বার প্রকৃতির কাছে হার মানে দক্ষিণ আফ্রিকা। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রান তাড়া করছিল তারা। ফাইনালে উঠতে দরকার ছিল ১৩ বলে ২২ রান। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হয়। খেলা শুরু হওয়ার পর ডাকওয়ার্থ লুইস নিয়মে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১ বলে ২২ রান। হারতে হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তার সাত বছর পর প্রথম আইসিসি ট্রফি জেতে দক্ষিণ আফ্রিকা। বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ওঠে তাদের হাতে। সেই শেষ। তার পর থেকে শুধু হতাশা জুটেছে তাদের কপালে। ১১টা আইসিসি প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অ্যালান ডোনাল্ডের ‘ব্রেনফেড’ হয়ে রান আউট ক্রিকেটের ইতিহাসে অমর ফ্রেম হয়ে থেকে গিয়েছে। বাউন্ডারি লাইনের ধারে আর দেখা যাবে না চোখ ধাঁধানো ‘বানি হপ’ ক্যাচ? ক্রিকেটে আসছে নতুন নিয়ম। গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতার ২৬ বছর পর। সেখানে ভারতের বিরুদ্ধে একটা সময় জেতার মুখে ছিল তারা। ২৪ বলে দরকার ছিল ২৬ রান। সেখান থেকে হারে দক্ষিণ আফ্রিকা। কিছুতেই ফাইনালের গণ্ডি পার হতে পারছিল না তারা। চলতি বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে উঠে আবার হারতে হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই অন্ধকার সময়ে আলোর কিরণ নিয়ে এলেন বাভুমা। ২০১৪ সালে অভিষেক হয় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির বাভুমার। তিন ফরম্যাটে খেললেও ধীরে ধীরে ছোট ফরম্যাট থেকে বাদ পড়েন তিনি। ২০১৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার হিসাবে টেস্টে শতরান করেন তিনি। ২০২১ সালে কুইন্টন ডি’কককে সরিয়ে এক দিনের দলের অধিনায়ক করা হয় বাভুমাকে। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়কও। ২০২৩ সালে টেস্টের অধিনায়কত্বও পান বাভুমা। টেস্ট অধিনায়ক হিসাবে তাঁর রেকর্ড দেখার মতো। ১০টা টেস্টে অধিনায়কত্ব করে ৯টা জিতেছেন তিনি। একটাও হারেননি। এই ১০টা টেস্টে তাঁর ব্যাটিং গড় প্রায় ৬০। কেরিয়ারে মাত্র ৪টে শতরান করলেও তাঁর কত ৭০, ৮০, ৯০ রানের ইনিংস যে দলকে জিতিয়েছে তা মনে রাখার মতো।

এ বার যে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠবে তা আগে বোঝা যায়নি। শেষ দুটো সিরিজ়ে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট পায় তারা। সেখানেও তীর্যক মন্তব্য শুনতে হয়েছে বাভুমাকে। বলা হয়েছে, অনেক কম ম্যাচ খেলে ফাইনালে উঠেছে তারা। দুর্বল দলকে ঘরের মাঠে হারিয়েছে। সেখানে ইংল্যান্ড, ভারত সেখানে অনেক বেশি ম্যাচ খেলেছে। ফলে সুবিধা পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এখনও বাভুমাকে কোটার ক্রিকেটারই বলা হয়। তাঁর উচ্চতা নিয়ে মিম হয় সমাজমাধ্যমে। বাভুমা অবশ্য তা নিয়ে বেশি ভাবেন না। ছোটবেলায় তিনি যেখানে ক্রিকেট খেলতেন, সেখানে তিনটে রাস্তা এসে মিশত। তার মধ্যে একটা রাস্তাকে বলা হত লর্ডস। সেই রাস্তায় খেলার বিশেষ সুযোগ পেতেন না বাভুমা। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে নামার আগে তিনি বলেছিলেন, “যে লর্ডসে খেলার সুযোগ পেতাম না, সেই লর্ডসে অধিনায়ক হিসাবে খেলতে নামছি। এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।” সেই লর্ডসে তিনি শুধু খেললেন না, চ্যাম্পিয়ন হয়ে মাঠ ছাড়লেন। তৃতীয় দিন খেলা শেষে ডিভিলিয়ার্স বলছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা জিতলে কেঁদে ফেলবেন তিনি। মার্করাম, বেডিংহ্যাম জুটি দলকে জয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিশ্চয় কাঁদছেন। এত দিন দুঃখে অনেক বার চোখের জল ফেলেছেন। এ বার আনন্দে তা বাঁধ মানছে না। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের পর যে দক্ষিণ আফ্রিকা জিততে পারে তা ক’জন ভেবেছিলেন। প্রথম ইনিংসে যেখানে দল ১৩৮ রান অল আউট হয়ে গিয়েছে সেখানে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮২ রান তাড়া করা প্রায় অসম্ভব ছিল। সেটাই সম্ভব করলেন বাভুমা ও মার্করাম। দৌড়তে পারছিলেন না বাভুমা। খোঁড়াচ্ছিলেন। কিন্তু তার পরেও লড়াই ছাড়েননি। স্টার্ক, কামিন্স, হেজ়লউডদের মোকাবিলা করেছেন।

বাভুমা পাশে পেয়েছেন মার্করামকে। প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে শতরান করলেন। টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে নিজের তৃতীয় শতরান করলেন তিনি। বাভুমা ধীরে খেললেও মার্করাম থাকায় দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোরবোর্ড সচল থাকে। তৃতীয় দিনই শতরান করেছিলেন তিনি। তার পরেও ছাড়েননি। চতুর্থ দিন বাভুমা আউট হওয়ার পরেও খেলে গিয়েছেন। তাঁর ব্যাট থেকে একের পর এক বল বাউন্ডারিতে গিয়েছে আর সাজঘরে বসে হাততালি দিয়েছেন বাভুমারা। শেষ দিকে সামান্য মনঃসংযোগের অভাবে আউট হতে হয় তাঁকে। তত ক্ষণে খেলার ফয়সালা প্রায় হয়েই গিয়েছে। দল যত জয়ের দিকে গেল, গ্যালারিতে বসে মুখের হাসি তত চওড়া হয়েছে প্রাক্তন অধিনায়ক গ্রেম স্মিথের। গ্যালারিতে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়েছিলেন ডিভিলিয়ার্স। বোঝা যাচ্ছিল আবেগ সামলাতে সমস্যা হচ্ছে। দল জিততেই সাজঘরে যে ভাবে ক্রিকেটারেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন তাতে বোধা গেল, এই জয়ের স্বাদ কতটা। অবশ্য বাভুমা ভাবলেশহীন। চেয়ারে বসে শুধু হাততালি দিচ্ছেন। তবে তাঁর চোয়াল বুঝিয়ে দিল, কত সমালোচনার জবাব দিয়েছেন তিনি। সত্যিই এক কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়কের হাত ধরেই শাপমুক্তি হল দক্ষিণ আফ্রিকার।

কম সমালোচনা শুনতে হয়নি। ‘কোটার’ অধিনায়ক বলা হয়েছে। এ-ও বলা হয়েছে যে দুর্বল দলকে হারিয়ে ভাগ্যের জোরে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠেছেন। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা। ২৭ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকাকে আবার বড় প্রতিযোগিতা জিতিয়েছেন বাভুমা। এক কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়কের হাতেই হয়েছে শাপমুক্তি। ম্যাচ শেষে বাভুমা বলেন, “নিজেদের যোগ্যতায় ফাইনালে উঠেছিলাম। তার পরেও অনেকে সন্দেহ করেছিল। বলা হয়েছিল, দুর্বল দলকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছি। এই জয় তাদের জবাব।” টেস্টে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন, তা এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না বাভুমার। একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছেন তিনি। প্রোটিয়া অধিনায়ক বলেন, “মাঠে যা সমর্থন পেয়েছি, মনে হচ্ছিল নিজেদের দেশে খেলছি। আমাদের দেশের ক্রিকেটে এটা বিশেষ মুহূর্ত। টেস্ট বিশ্বকাপ জিতেছি, বিশ্বাস করতে কয়েক দিন সময় লাগবে।”

পর পর ১১টা আইসিসি প্রতিযোগিতায় ভাল খেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। সেমিফাইনালে উঠেছে। কিন্তু ফাইনালে ওঠা হয়নি। গত বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও ট্রফি জেতা হয়নি। বাভুমা জানিয়েছেন, প্রতি বার দরজা থেকে ফিরতে হয়েছে তাঁদের। সেই যন্ত্রণা এ বার মিটেছে। তিনি বলেন, “আমরা বার বার দরজায় ধাক্কা দিয়েছি। কিন্তু বার বার হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। তাতে যন্ত্রণা বেড়েছে। প্রাক্তন ক্রিকেটারদের সেই হতাশা এত দিনে মিটল। সময় এ বার আমাদের সঙ্গে ছিল।” এই জয়ের কৃতিত্ব গোটা দলকে দিলেও বিশেষ দু’জনের কথা জানিয়েছেন বাভুমা। কাগিসো রাবাডা ও এডেন মার্করাম। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট নিয়েছেন রাবাডা। মার্করাম দ্বিতীয় ইনিংসে ম্যাচ জেতানো শতরান করেছেন। তাঁদের কথা শোনা গিয়েছে অধিনায়কের মুখে।

বাভুমা নিজেও দুই ইনিংসেই রান করেছেন। কিন্তু এক বারও নিজের নাম করেননি তিনি। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও জয়ের কৃতিত্ব বাকিদের দিয়ে নিজে নেপথ্যে থেকেছেন অধিনায়ক। বাভুমা এমনই। দল জেতার পর যখন বাকিদের উচ্ছ্বাস বাঁধ মানছে না তখন বাভুমা ভাবলেশহীন চেয়ারে বসে। হাততালি দিচ্ছেন। তবে তাঁর মুখ বুঝিয়ে দিচ্ছিল, সব সমালোচনা, প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আনন্দ সেখানে। বাইরে তা প্রকাশ না করলেও ভিতরে ভিতরে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন। কেপ টাউনে লাঙ্গা এলাকা থেকে উঠে এসেছেন বাভুমা। লাঙ্গায় মূলত কৃষ্ণাঙ্গদেরই বসবাস। উনিশ শতকের শুরুর দিকে ব্রিটিশেরা লাঙ্গায় এসে থাকতে শুরু করে। অন্য অনেক জিনিসের পাশাপাশি লাঙ্গায় আমদানি হয় ক্রিকেটের। সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গ জনজাতির মধ্যে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে খেলাটি। তবে বেশির ভাগেরই পছন্দ ছিল বোলিং। ধীরে ধীরে লাঙ্গা থেকে একের পর এক বোলার উঠে আসতে থাকে। কিন্তু ব্যাটার উঠে আসছিল না। সেই অভাব মিটিয়েছেন বাভুমা।

নেপথ্যে রয়েছেন তাঁর দুই কাকা। ছোট থেকেই বাভুমাকে ক্রিকেট শেখাতেন তাঁরা। মাত্র চার বছর বয়সেই ব্যাট হাতে ধরতে শিখে গিয়েছিলেন বাভুমা। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর অভিষেক। প্রথম টেস্টে মাত্র ১০ এবং ১৫ রান করেছিলেন। পরের টেস্টে অর্ধশতরান করেন। ২০১৫-১৬ মরসুমে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শতরান করে দলে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেন বাভুমা। তবে তখন থেকেই একটা তকমা তাঁর নামের পাশে সেঁটে গিয়েছে। তিনি ভাল খেলেন, কিন্তু তারকা হওয়ার জন্য যে মশলা দরকার সেটা তাঁর মধ্যে নেই। আজও এই তকমা বয়ে বেড়াতে হয়। বাভুমা ক্রিজ়ে নামবেন, ধরে খেলবেন, আস্তে আস্তে রান করবেন, এটাই যেন পরিচিত দৃশ্য। তিনি বিরাট কোহলির মতো কভার ড্রাইভ মারতে পারেন না, রোহিত শর্মার মতো পুল করতে পারেন না, জো রুটের মতো ‌র‌্যাম্প শট মারতে পারেন না। কিন্তু দলের দরকার হলেই তিনি খেলে দেন।

অধিনায়ক হিসাবে ১০টা টেস্টের মধ্যে ৯টা জিতেছেন। সেই ১০টা টেস্টে তাঁর ব্যাটিং গড় প্রায় ৬০। বাইরের লোকেরা যতই সমালোচনা করুক না কেন, এই দলের বিশ্বাস রয়েছে বাভুমার উপর। এই দল তাঁকে অধিনায়ক মনে করেন। নইলে টেস্ট বিশ্বকাপের মেজ ট্রফি তোলার পর যে ভাবে তাঁকে বাকিরা শ্যাম্পেনে স্নান করিয়ে দিলেন তা দেখে মনে হল, রাজার রাজ্যাভিষেক হল। টেস্টের সিংহাসনে বসলেন বাভুমা। সব সমালোচনার জবাব দিয়ে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে পাঁচ উইকেটে হারিয়েছে তারা। ১৯৯৮ সালে আইসিসি নকআউট ট্রফি জেতার ২৭ বছর পর আবার আইসিসি ট্রফি জিতেছে তারা। টেস্ট বিশ্বকাপ জেতার ফলে মোটা অর্থ ঢুকছে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরে। ভারতও পাচ্ছে বেশ কিছুটা অর্থ। ফাইনালের আগেই আইসিসি জানিয়েছিল, এ বারের প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি অর্থ দেওয়া হবে দেশগুলিকে। টেস্ট বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি দেশই কিছু না কিছু অর্থ পাচ্ছে। যারা যত উপরে শেষ করেছে, তত বেশি অর্থ পাবে। চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকা পাবে ৩৬ লক্ষ ডলার বা ৩০.৭৮ কোটি টাকা। এই অর্থ সে দেশের ক্রিকেট পরিকাঠামোর উন্নয়নে অনেকটাই কাজে লাগবে। রানার্স অস্ট্রেলিয়া পাবে ২১.৬ লক্ষ ডলার বা ১৮.৫৬ কোটি টাকা। টেস্ট বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে শেষ করেছে ভারত, ১৪.৪ লক্ষ ডলার বা ১২.১৩ কোটি টাকা। চতুর্থ স্থানে থাকা নিউজিল্যান্ড পাবে ১২ লক্ষ ডলার বা ১০.২৬ কোটি টাকা। পঞ্চম স্থানে থাকা ইংল্যান্ডে পাবে ৯.৬ লক্ষ ডলার বা ৮.২০ কোটি টাকা। শ্রীলঙ্কা শেষ করেছে ষষ্ঠ স্থানে, পাবে ৮.৪ লক্ষ ডলার বা ৭.১৮ কোটি টাকা। সপ্তম স্থানে থাকা বাংলাদেশ এবং অষ্টম স্থানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পাবে যথাক্রমে ৬.১৫ কোটি এবং ৫.১৩ কোটি টাকা। সবার নীচে, নবম স্থানে শেষ করেছে পাকিস্তান। পাবে ৪.১০ কোটি টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles