টুটু বসুর কথাগুলো ময়দানে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, টুটু বোস বলেছিলেন, ‘মোহনবাগান যে ট্রফিগুলো জিতেছে সেগুলোয় দেবাশিসের কোনও হাত নেই। সঞ্জীব গোয়েঙ্কাকে কে এনেছে? এমন লোক এনেছি, যে পালাবে না ছেড়ে। আর তখন কারা বাধা দিয়েছে, এখন তাঁদের নাম নিতে চাই না। দেবাশিসের জন্যই অঞ্জনের সঙ্গে সম্পর্কটা খারাপ হয়ে গেছিল। ও ভীষণ লোভী। ওকে সামলাতে না পারাটা আমার বড় ব্যর্থতা। ও মিত্র পরিবার ধ্বংস করেছে। অঞ্জন মিত্র মারা যাওয়ার পরে। আমার আর অঞ্জনের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করেছে। অঞ্জনের মেয়ে সোহিনীকে আমি কো–অপ্ট মেম্বার করায় ও আপত্তি তুলেছিল। আমি তা শুনিনি। আমার পরিবারেও ও ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেটা বড্ড বেশি তাড়াতাড়ি করায় সেই চক্রান্ত ধরে ফেলেছি। আমি এখনও বেঁচে আছি। আমার পরিবারে আমি এখনও বটবৃক্ষ। আমি বেঁচে থাকতে সংসারে ফাটল ধরতে দেব না। নির্বাচনে সৃঞ্জয় বনাম সৌমিক লড়াই হবে না।’ মোহন সমর্থকরা বলছেন, মোহনবাগান যে ট্রফিগুলো জিতেছে সেগুলোয় ‘বিভিষণ’দেবাশিসের কোনও হাত নেই।
চিত্র এক : ময়দানে কান পাতলেই একই সুর বাজছে। দেবাশিষ দত্তের বিদায় ঘন্টার ধ্বনি। বিরাট কিছু অঘটন না ঘটলে, দেবাশিষের সচিব পদের ইতি ঘটতে চলেছে। এমনটাই মনে করছে ময়দানি ফুটবল মহল। জনা কয়েক বর্তমান কর্তা নিয়ে চরকি ঘুরছেন দেবাশিষ। হাওড়ায় মোহন সহ সভাপতি অসিত চট্টোপাধ্যায়ের রক্তদানে সদলবলে হাজির দেবাশিষ বাহিনী। দেবাশিষের উপস্থিতি দেখার জন্য বা বর্তমান সচিবের বক্তব্য শোনার জন্য ছিলেন না মোহন জনতা। সবুজ চেয়ারগুলো ছিলো ফাঁকাই। মঞ্চে জোর কণ্ঠে বলে গেলেন, ইলেকশনের জন্য এখানে হাজির হইনি, এসেছি মোহন সহ সভাপতি অসিত দার ডাকেই। প্রশ্ন এখানেই? একসঙ্গে বর্তমান কর্তারা সদলবলে। একই সময়ে হাজির হাওড়ার রক্তদান উৎসবে।
চিত্র দুই : মোহনবাগানের নির্বাচনের ইতিহাসে প্রথমবার লিখিত আকারে ইস্তেহার প্রকাশ! ক্লাবের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস-প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে আজীবন সদস্যপদ-সহ একাধিক প্রতিশ্রুতি সৃঞ্জয়ের প্যানেলের। মোহনবাগান নিয়ে আগামী দিনে কী পরিকল্পনা, নির্বাচনে জয়ী হলে কী কী করবেন, ইস্তেহার আকারে ক্লাবের সভ্য সমর্থকদের সামনে তুলে ধরলেন প্রাক্তন সচিব সৃঞ্জয় বোস। ইস্তেহারে একধিক চমকপ্রদ ঘোষণা।
দুই ভিন্ন চিত্রে ভিন্ন সুরই বেজে চলেছে। ময়দানে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে বর্তমান সচিবের বিদায়ের ঘন্টা ধ্বনি। অপরদিকে শোনা যাচ্ছে প্রাক্তন সচিবের প্রতি সদস্যদের শুভেচ্ছার সুর। বিধাননগরে এক অনুষ্ঠানে ক্লাব সদস্যদের সামনে ইস্তেহার প্রকাশ করেন সৃঞ্জয়। উপস্থিত ছিলেন একাধিক প্রাক্তন ফুটবলার, প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং সৃঞ্জয় প্যানেলের সম্ভাব্য অন্য প্রার্থীরাও। ক্লাবের নির্বাচনে ইস্তেহার প্রকাশ করে প্রচারে রীতিমতো অভিনবত্ব আনলেন প্রাক্তন সচিব। ক্লাবের প্রতি দায়বদ্ধতা স্পষ্ট। সদস্য ভোটারদেরও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্ক বিস্তারিত জানার সুযোগ ‘তোমাকে চাই…’ শীর্ষক ওই ইস্তেহারের প্রচ্ছদেই রয়েছে সৃঞ্জয় বোস এবং টুটু বোসের ছবি। শারীরিক কারণে ইস্তেহার প্রকাশের অনুষ্ঠানে টুটুবাবু উপস্থিত থাকতে না পারলেও সৃঞ্জয়কে শুভেচ্ছা জানান।
ইস্তেহারে একাধিক বড় ঘোষণা করেছে সৃঞ্জয় শিবির। ক্লাবের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরির কথা ইস্তেহারে। “বর্তমান ক্লাব প্রাঙ্গণ যেহেতু সেনা-নিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্রে অবস্থিত, তাই নানাবিধ চাহিদা সত্ত্বেও বহু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এক্ষেত্রে নতুন পথের সন্ধান করাই হবে নতুন কমিটির কাজ। ঐতিহ্যবাহী মোহনবাগান ক্লাব যাতে বিস্তার ও প্রসারের নিরিখে এগিয়ে যায়, ও সাফল্যে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তাই-ই হবে লক্ষ্য। প্রবীণ সদস্য, যাঁরা ৫০ বছর যাবৎ ক্লাবের সদস্যপদ ধরে রেখেছেন, নতুন নিয়ম চালু করে সদস্যপদের জন্য তাঁদের বার্ষিক চাঁদা মকুবের সিদ্ধান্ত নেবে নতুন কমিটি।” সৃঞ্জয় শিবিরের প্রতিশ্রুতি, ক্লাবের কোনও সদস্যের মৃত্যু হলে তাঁর সদস্যপদ হস্তান্তরিত করা হবে তাঁর পরিজনের (স্ত্রী/সন্তান) হাতে।
ক্লাবের সদস্যরা যাতে সদস্যরা যাতে খোলামেলা পরিবেশ ও সবরকম কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পান তা নিশ্চিত করতে চায় সৃঞ্জয়ের প্যানেল। ইস্তেহারে বলা হয়েছে, ক্লাবের বর্তমান পরিকাঠামোয় উন্নয়ন আনাই হবে নতুন গঠিত কমিটির সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মেম্বার্স গ্যালারি, ক্যাফেটেরিয়া-সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সুবন্দোবস্ত করা, এ ছাড়া ক্লাব প্রাঙ্গণের মধ্যে সভ্যরা যাতে আরও নিজেদের মতো করে সময় কাটানোর পরিসর পান, সে-ব্যবস্থা করাই হবে লক্ষ্য। ক্লাবের ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিংয়েও বাড়তি গুরুত্ব দেবে নতুন কমিটি। আন্তর্জাতিক স্তরে মোহনবাগান ক্লাবের নাম যাতে আরও ছড়িয়ে পড়ে, সেই লক্ষ্যে সর্বতভাবে চেষ্টা করবে নতুন কমিটি। এক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ক্লাবের মার্কেটিংও ব্র্যান্ডিং প্রক্রিয়া ঢেলে সাজানো হবে। ক্লাবের ঐতিহ্য উদযাপনে দেওয়া হবে বিশেষ গুরুত্ব। মোহনবাগান দিবস থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি জয়ের মুহূর্ত অর্থাৎ মোহনবাগানের ইতিহাস তুলে ধরা হবে অত্যাধুনিক কায়দায়।
মোহনবাগানে নির্বাচনী হাওয়া। নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নেমে পড়েছে বাগানের শাসক আর বিরোধী দুই শিবিরই। চলছে ঘর ভাঙার পালা। মোহনবাগানের এক অনুষ্ঠানে গা ঘেষাঘেষি করে বসে থাকতে দেখা গেছে মোহনবাগানের সচিব দেবাশিস দত্ত আর মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের অন্যতম কর্তা সৌমিক বসুকে। এই সৌমিক বসু (টুবলাই) হলেন টুটু বসুর ছোট ছেলে। নির্বাচনে দেবাশিস দত্তর প্রতিদ্বন্দ্বী টুটু বসুর বড় ছেলে সৃঞ্জয় বসু (টুম্পাই)। টুটু বসুর প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা। নির্বাচনী প্রচারে নিজেকে কাজে লাগাতে চান একদা বাগানের কল্পতরু। মোহনবাগানে ইলেকশন না সিলেকশন? অনেকটা নির্ভর করছে নবান্নের চাওয়া পাওয়ার দিকে। নবান্ন চাইলে সিলেকশন, না হলে ইলেকশন! বাগানের পোড় খাওয়া কর্তা এবং সমর্থকরা মনে করছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ সৃঞ্জয় বসুও ভীষণভাবে চাইছেন বাগানের হটসিটে ফিরতে। সৃঞ্জয়ের সমর্থনে ‘তোমাকে চাই’ প্রচার শুরু। মোহনবাগানের ম্যাচেও এমন নানা চিত্র দেখা গিয়েছে গ্যালারিতে। ইদানীং বেশ কিছু জায়গায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এক ফ্রেমে দেখা গিয়েছে টুম্পাইকে। নির্বাচন ছাড়াই যদি সবটার সুরাহা হয়! এমন জল্পনা তাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাগানে ইলেকশন না সিলেকশন?
প্রত্যাশিতভাবেই মোহনবাগানের নির্বাচনের আগে বর্তমান সমিতির নিজের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলেন টুটু বোস। মোহনবাগানের বর্তমান কমিটিকে জানিয়েছিলেন আর ক্লাবের সভাপতি পদে থাকতে চাননা না তিনি। কারণ, ময়দানের পোড় খাওয়া ব্যক্তিরা ভালোই বুঝেছিলেন। চাঁচাছোলা ভাষায় বাগানের সচিবকে আক্রমণ করে টুটু বোস বলছেন, দেবাশিস দত্তকে তিনিই মাঠে এনেছিলেন। এরপর তিনিই তাঁর পরিবারে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছেন। বালিগঞ্জ প্লেসে নিজের অফিসেই এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাগানের প্রাক্তন সভাপতি টুটু বোস জানিয়েছিলেন ছেলে সৃঞ্জয় বোসের হয়েই আসন্ন মোহনবাগান নির্বাচনে সমর্থন থাকবে তাঁর। গতবার সৃঞ্জয়ের গোষ্ঠিকে হারিয়েই মোহনবাগানের পদে বসেছিলেন দেবাশিস দত্ত এবং তাঁর কমিটি। এদিন দেবাশিসের দিকেই কটাক্ষ করে টুটু বোস বলেছিলেন, ‘মোহনবাগান যে ট্রফিগুলো জিতেছে সেগুলোয় দেবাশিসের কোনও হাত নেই। সঞ্জীব গোয়েঙ্কাকে কে এনেছে? এমন লোক এনেছি, যে পালাবে না ছেড়ে। আর তখন কারা বাধা দিয়েছে, এখন তাঁদের নাম নিতে চাই না। দেবাশিসের জন্যই অঞ্জনের সঙ্গে সম্পর্কটা খারাপ হয়ে গেছিল। ’
মোহনবাগান নির্বাচনের আগে এমনিতেই আইএসএলের ফাইনালে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে না ডাকা নিয়ে বর্তমান কমিটির ওপর নাকি বিরক্ত। বারপুজোর দিনেও তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়নি। আর যে কমিটির ওপর তিনি বিরক্ত থাকবেন, তার যে কপালে খুব একটা সুখের সম্ভাবনা নেই, তা ময়দানে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে। সৃঞ্জয় বোস এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরাও নির্বাচনের আগে নিজেদের রাজনৈতিক সূত্রগুলোকে আরও পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন, ফলে শাসক গোষ্ঠি যে সমস্যায় পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। সৃঞ্জয় বোসের সমর্থনে এদিন টুটু বোস বলেছিলেন, ‘আমার পরিবারে মোহনবাগানের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফাটল ধরানোর অপচেষ্টা চলেছে। আমার মনে হয়েছিল সভাপতি হয়ে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়, তাই আমি সেই কাজ করব না বলেই সভাপতি পদ ছেড়েছি। এবার আমি পুরোপুরি টুম্বাইকে সমর্থন করব। আপনাদের সবাইকেই বলছি, আমায় ভোট দেওয়া মানে ওকে ভোট দেওয়া। তাই আমায় এবারে ভোটটা দেবেন ’।
সৃঞ্জয় বোসের সঙ্গে সৌমিক বোসের ভুল বোঝাবুঝিও নাকি করার চেষ্টা করেছিলেন দেবাশিস, বিস্ফোরক টুটু বোস বলেছিলেন, ‘দেবাশিসের লোভকে আমি কন্ট্রোল করতে পারিনি, ওর লোভ ওকে আজ না ফেরার জায়গায় নিয়ে গেছে। আমার পরিবারে ও ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছে। সৃঞ্জয় আর সৌমিককে আলাদা গোষ্ঠি করে দিয়েছে, ওরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়়বে, এটা দেখার আগে আমি বিষ খেয়ে নেব। আমি কিন্তু বটবৃক্ষ, আর আমার নাম টুটু বোস। এটাই আমার নির্বাচনে নামার আগে সব থেকে বড় অস্ত্র ’




