Sunday, July 5, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনেই প্রমাণ?‌ ক্রমশ একা হয়ে পড়ছেন মমতা!‌ ক্ষমতাকেই মতাদর্শ দিয়ে কোনও রাজনৈতিক দলের একতা টিকিয়ে রাখা শক্ত?

RK NEWZ ফিরহাদ থেকে চন্দ্রিমা, প্রিয়জনরাই ক্রমশ নিঃস্ব করছে মমতাকে! দুঃসময়ে নেত্রীর সঙ্গ ছাড়লেন। রাজ্যে পালাবদলের পরই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল তৃণমূল। সময় যত এগোচ্ছে ততই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছেন মমতা। বর্তমানে হাতে গোনা দু-একজন ছাড়া কয়েকদশকের সঙ্গীরাও আর তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গে নেই। কেউ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিঁধে, কেউ আবার দলের নীতি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিঁধে দল ছাড়ছেন। কারণ যাই হোক, ক্রমশ একা হয়ে পড়ছেন মমতা। একটা সময় ইন্দিরা গান্ধীর আদর্শ ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল ফিরহাদ হাকিমকে। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল তৈরি হওয়ার পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গী ফিরহাদ। তাঁকে তৃণমূল সুপ্রিমোর একদা ডান হাত বললে অত্যুক্তি হবে না। মমতা সরকারের একাধিকবারের বিধায়ক, মন্ত্রী তিনি। কিন্তু পালাবদল হতেই সুকৌশলে মমতাকে ছেড়ে ঋতশিবিরে হাত মিলিয়েছেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের সঙ্গী অরূপ বিশ্বাস। তিনি দলনেত্রীর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেনও বটে। সেই কারণেই তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষের পদ পেয়েছিলেন। কিন্তু ভাঙনের মরশুমে দেখা গেল তিনিও কালীঘাট তৃণমূলের পাশে নেই। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরই মেসি কাণ্ডে বেশ চাপে পড়েছিলেন অরূপ। তারপর দীর্ঘদিন বেপাত্তা ছিলেন। পরবর্তীতে আচমকাই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের তরফে আয়োজন করা জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে দেখা যায় তাঁকে। মালা রায়ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে অত্যন্ত বিশ্বস্ত সৈনিকদের একজন। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে দলের সঙ্গেই তিনি। ‘আসল তৃণমূল’ কারা তা নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হতেই দলের কমিটি ভেঙে মমতা যে নতুন কমিটি গঠন করেছিলেন তাতেও জায়গা পেয়েছিলেন মালা। কিন্তু তারপর আর সক্রিয়ভাবে দলের কাজে দেখা যায়নি। কালীঘাটের বৈঠকেও গরহাজির ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে দিল্লি গিয়ে যোগ দেন বিদ্রোহী শিবিরে। একাধিকবারের বিধায়ক, তৃণমূলে সরকারের একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। কালীঘাট তৃণমূলের নতুন কমিটিতে রাজ্য সভাপতির পদে ছিলেন তিনি। গতকাল অর্থাৎ শুক্রবার পর্যন্ত মমতার সঙ্গেই ছিলেন চন্দ্রিমা। কিন্তু মেট্রোপলিটনের তৃণমূল কার্যকালয়ের দখলকে কেন্দ্র করে দলনেত্রীর কথায় অভিমান হয়েছে তাঁর। যার জেরে রাতারাতি দলের সব পদ ছেড়েছেন চন্দ্রিমা। তৃণমূলের দীর্ঘদিনের সঙ্গী দেবাশিস কুমার। একসময় দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতি ছিলেন। একাধিকবার বিধায়ক হয়েছেন তৃণমূলের টিকিটে। রাজ্যে পালাবদলের পর আর সেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দেখা যায়নি তাঁকে। এই মুহূর্তে তিনি বিদ্রোহী শিবিরে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে হাত রেখে মমতার হাত থেকে তৃণমূলকে কেড়ে নেওয়ার খেলায় মেতেছেন সেই দেবাশিস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চার দশকের সঙ্গী ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। লোকসভার মুখ্যসচেতক পদ নিয়ে অশান্তির জেরে মমতার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ান কাকলি। প্রকাশ্যে মমতা-অভিষেককে আক্রমণ করেন তিনি। ক্ষোভের জেরে কাকলিপুত্র তাঁর বিয়েতে দেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপহার ফেরানোর সিদ্ধান্তও নেন। এই মুহূর্তে কাকলির নেতৃত্বে বিদ্রোহী ২০ তৃণমূল সাংসদ যোগ দিয়েছেন এনসিপিআই নামে একটি দলে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা থেকেই দলের সঙ্গে ছিলেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ওরফে বালু। নেত্রীও তাঁকে ভরসা করেছেন।বিধায়ক-মন্ত্রিত্ব সবই পেয়েছেন। পরবর্তীতে রেশন দুর্নীতি মামলায় জেলযাত্রা হওয়ার পরও সেই ভরসা অটুটই ছিল। বারবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বালুকে ফাঁসানো হয়েছে।’ দলের নতুন জাতীয় কর্ম সমিতির সদস্য করা হয়েছিল তাঁকে। তারপরই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান বালু। শিবির বদল করেননি তিনি তবে মমতার সঙ্গেও নেই বালু।

১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। তারা তাদের পরিচয় গড়ে তোলে ‘মা, মাটি, মানুষ’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে। দলটি নিজেদের বাঙালি অস্মিতা এবং আমজনতার স্বঘোষিত অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরেছিল। যে সব কৃষকের জমি জোর করে দখল করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ, তাদের অধিকার আদায়ের প্রবক্তা হিসেবে দলটি নিজেদের তুলে ধরে। এই বার্তাই ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের চৌত্রিশ বছরের শাসনের অবসান, এবং ২০১৬ ও ২০২১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনে সাহায্য করে। তৃণমূল আর ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতা হারানোর পর তাদের জনপ্রতিনিধিদের গোষ্ঠীগুলি আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পড়েছে— সাংসদ, বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা দলত্যাগ করেছেন। আজ দলটির সামনে প্রশ্ন শুধু আগামী নির্বাচনে জয়লাভ নিয়ে নয়, বরং ক্ষমতার অনুপস্থিতিতে দলটিকে একসঙ্গে ধরে রাখার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী কোনও ভিত্তি বা বাঁধন তাদের আছে কি না। একটি দলকে কী একত্রিত করে এবং তাকে ঐক্যবদ্ধ রাখে? উত্তরটি হতে পারে, হয় মতাদর্শ কিংবা ক্ষমতা। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কার্ল ফ্রিডরিখ মতাদর্শকে আইডিয়ার একটি ‘অ্যাকশন-ওরিয়েন্টেড’ বিন্যাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দিক-নির্দেশ এবং উদ্দেশ্য দেয়। মতাদর্শ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। প্রথমত, এটি একটি রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখে। মানুষ একসঙ্গে থাকে, কারণ তারা একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যে বিশ্বাস করে। দ্বিতীয়ত, এমন মতাদর্শগত উদ্দেশ্য থাকার ফলে, ক্ষমতায় না থাকলেও, ভোটাররা দলটিকে সমর্থন করে। তৃতীয়ত, মতাদর্শ একটি দলকে পরাজয়ের পরও টিকে থাকতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টতই বলেন, ‘মতাদর্শহীন কোনও রাজনৈতিক দল আসলে কোনও দলই নয়।’ একটি সুসমন্বিত মতাদর্শ ছাড়া কোনও দলকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতালিপ্সু একদল মানুষের সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এই ধরনের দলগুলি প্রায়শই ক্ষমতা হারানোর পর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, দলত্যাগ এবং দিশাহীনতার শিকার হয়। বিজেপি বা কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মতো দলগুলি যে ভাবে একটি সুস্পষ্ট বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তৃণমূল কখনওই সে ভাবে স্পষ্ট সংজ্ঞায়িত মতাদর্শগত কাঠামো তৈরি করেনি। তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল তাদের নীতি, স্লোগান এবং অন্যান্য দল ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা। কোনও একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের অনুপস্থিতি দলটিকে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় করে তোলে, রাজনৈতিক অবস্থান পাল্টাতে সাহায্য করে। ফলে নির্বাচনে আকৃষ্ট করার শক্তিও শীর্ষে পৌঁছয় এবং বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতা ধরে রাখতে সফল হয় তারা। কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী এবং দুয়ারে সরকার-এর মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কিন্তু এই প্রকল্পগুলির সঙ্গে কোনও সুসমন্বিত রাজনৈতিক দর্শনের সম্পর্ক ছিল না, বরং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতর যোগ ছিল তৃণমূলের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের কৌশলের। এই প্রকল্পগুলি যে প্রতিভাবান ভোট-কুশলী তৈরি করেন, তিনি বারংবার বলেছিলেন যে, দীর্ঘ কাল টিকে থাকতে এবং কোনও নির্বাচনী বিপর্যয়-সহ সব ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে তৃণমূলের নিজস্ব একটি মতাদর্শ থাকা উচিত। একই ভাবে, বাঙালি অস্মিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি যে মনোনিবেশ, তা গভীরে প্রোথিত মতাদর্শগত অঙ্গীকারের থেকে বেশি কাজ করেছিল রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে। এটি আসলে পশ্চিমবঙ্গকে ভারত থেকে অর্থনৈতিক এবং আবেগগত ভাবে দূরে সরিয়ে দেয়। সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলের অধীনে এই রাজ্যকে অনুন্নত দেখাচ্ছিল এবং কখনও কখনও তা পরিণত হচ্ছিল দেশের অন্যান্য অংশের অবজ্ঞার শিকার বা ঠাট্টার পাত্রে। পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট শিল্পনীতি এবং রাজস্ব নীতির অভাবেও মতাদর্শের সেই অনুপস্থিতি প্রতিফলিত হয়। তৃণমূলের অনেক প্রধান রাজনৈতিক থিমই ক্ষমতায় বা সরকারে থাকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির জন্য রাজ্যের সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন ছিল। প্রশাসন যখন দলের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন বাঙালি অস্মিতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি বেশি প্রভাব ফেলে। রাজ্যের হাতে আরও ক্ষমতার দাবি তখনই জোরালো ভাবে প্রতিধ্বনিত হয়, যখন তা শাসক দলের দ্বারা উত্থাপিত। এই থিমগুলির যে রাজনৈতিক জোর, তার বেশির ভাগই তৃণমূলের সরকারি ক্ষমতা থেকে অর্জিত, ফলে তা স্বাধীন ভাবে ব্যক্ত কোনও মতাদর্শগত অঙ্গীকারের পরিবর্তে ক্ষমতার ধারাবাহিক প্রয়োগের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, তৃণমূলকে মূল স্লোগান ‘মা, মাটি, মানুষ’ থেকে সরে গিয়ে যে কোনও মূল্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার দিকে চলে যেতে দেখা যায়। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উন্নতির আকাঙ্ক্ষা ক্রমবর্ধমান ভাবে সেই আদর্শগুলিকে ছাপিয়ে যায়, যা প্রাথমিক ভাবে দলটির ভাবমূর্তিকে গড়ে তুলেছিল। এটি ক্রমশ এমন একটি দলে পরিণত হয়, যারা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চায়, যারা স্ব-উন্নয়ন, মতাদর্শগত বিবর্তন বা শৃঙ্খলা গড়ে তোলার চেয়ে গদি আঁকড়ে রাখার ব্যাপারে বেশি উদ্বিগ্ন।

দলটি যত দিন পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছিল, তত দিন এই মতাদর্শগত অস্পষ্টতা মূলত নির্বাচনী সাফল্য এবং এর নেতা-কর্মী-সমর্থকদের পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক লাভের অঙ্কের আড়ালে ঢাকা ছিল। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর, আদর্শগত ভিত্তির অনুপস্থিতি প্রকট হয়ে ওঠে। দল ভেঙে পড়ে। রাজ্যে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল বলে দাবি করে। ভবিষ্যৎ বলবে যে, নতুন নেতৃত্বের অধীনে তৃণমূল তার মূল নীতিতে অটল থাকবে, না কি কোনও বিবর্তিত বা নতুন মতাদর্শ নিয়ে আসবে। পরবর্তী সম্ভাবনা প্রবল, কারণ দলটিতে এখন আর পিসি-ভাইপো দলের স্বজনপোষণ নেই, যেখান থেকে বুদ্ধি ও রাজনৈতিক দক্ষতাসম্পন্ন মানুষদের বাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল, যেমন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রক্ষমতার হাতিয়ারগুলি যখন আর হাতে থাকবে না, তখন আগে যে সব রাজনৈতিক থিম ছিল, যার কোনওটাই সুসমন্বিত মতাদর্শগত কাঠামোর মধ্যে বিকশিত হয়নি, সেগুলো তৃণমূলের সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখতে যথেষ্ট হবে কি না। আগামী বছরগুলিতে এটিই দেখার যে, তৃণমূল কংগ্রেস তার পুরোনো বা নতুন যে কোনও অবতারেই হোক, এমন কোনও সুস্থায়ী মতাদর্শগত ভরকেন্দ্র তৈরি করতে পারে কি না, যা তাকে নির্বাচনী পরাজয় সত্ত্বেও টিকে থাকতে সাহায্য করবে। ইতিহাসই নির্ধারণ করবে তৃণমূল কংগ্রেস কোনও দীর্ঘস্থায়ী আইডিয়ার জন্য লড়েছিল, না কি স্রেফ ক্ষমতা দখলের জন্য। এ ক্ষেত্রে ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তিন দশকেরও বেশি সময় শাসন করার পর ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম) ক্ষমতা হারায়। দলটি বিলুপ্ত হয়নি, কারণ তাদের সমর্থন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মতাদর্শে নিহিত ছিল। এটি এমন একটি মতাদর্শ, যা সরকারি ক্ষমতার বাইরেও স্বাধীন ভাবে বিদ্যমান এবং তা শ্রেণি রাজনীতি, শ্রমিক অধিকার, ভূমি সংস্কার ও অর্থনৈতিক সমতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত। নির্বাচনী পরাজয় একটি দলকে দুর্বল করতে পারে, তবে মতাদর্শই নির্ধারণ করে যে, তারা টিকে থাকতে এবং নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারবে কি না। রাজনৈতিক ভাষ্যকার মোহাম্মদ হেশাম আতিক যুক্তি দিয়েছেন যে, মতাদর্শ একটি দলের ‘ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি’ হিসেবে কাজ করে। এটি একটি দলকে স্বতন্ত্র চরিত্র দেয় এবং এমন এক আনুগত্য তৈরি করে, যা নির্বাচনের গণ্ডিরও বাইরে। সুস্পষ্ট মতাদর্শগত ভিত্তিহীন দলগুলি প্রায়শই ক্ষমতা হারানোর পর দুর্বল হয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ বিভাজন বৃদ্ধি পায়, নেতা ও কর্মীরা দল ছাড়তে শুরু করে, এবং রাজনৈতিক আনুগত্য সুদৃঢ় বিশ্বাসের পরিবর্তে সুবিধে পাওয়ার কৌশলে পরিণত হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক দলত্যাগ ও বিভাজন তাই একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। এই দলের অসংখ্য নেতা ও কর্মী কি কোনও অভিন্ন নীতিমালার প্রতি দায়বদ্ধ ছিলেন, না কি তারা শাসক দলের অংশ হওয়ার কারণে সম্পদ ও সুবিধে পাওয়ার জন্যই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? তৃণমূলের জন্য আর একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর তাদের নির্ভরশীলতা। এই নির্ভরশীলতা আরও গভীর হয়েছে, কারণ তৃণমূলের এমন কোনও স্পষ্ট ভাবে ব্যক্ত মতাদর্শ নেই, যা তার নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। মূলত ক্যারিশম্যাটিক নেতাদের ঘিরে গড়ে ওঠা দলগুলি রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ে প্রায়শই বড় মাপের অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়, কারণ তাদের সাংগঠনিক সংহতি দীর্ঘমেয়াদি নীতির প্রতি অঙ্গীকার নয়, ব্যক্তিগত আনুগত্যের উপর বেশি নির্ভর করে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অভিজ্ঞতা এই চ্যালেঞ্জের একটি দৃষ্টান্ত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও দলটিকে কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে, কারণ তারা তাদের নেতাদের ঊর্ধ্বে একটি সুস্পষ্ট ও স্থায়ী মতাদর্শগত পরিচয় গড়ে তুলতে ব্যর্থ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা কংগ্রেসি সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করার সময় দেখেছেন যে, একটি দলের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য ঐতিহাসিক বৈধতা এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব ‘প্রয়োজনীয় কিন্তু যথেষ্ট নয়’। আসলে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং সুসমন্বিত মতাদর্শ, যা ব্যক্তি-নেতাদের ছাড়াও টিকে থাকতে পারে, তা একটি রাজনৈতিক দলকে তাদের ক্ষমতার মেয়াদের বাইরেও টিকিয়ে রাখে। অসংখ্য আঞ্চলিক দলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা, যদিও তাঁদের বেড়ে ওঠা কংগ্রেস ও তৃণমূলে, মতাদর্শগত ভাবে শক্তিশালী বিজেপিতে নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles