RK NEWZ কুর্সিবদল হতেই প্রাক্তন শাসকদলের বহু নেতা-মন্ত্রী আইনি প্যাঁচে জড়াতে শুরু করেছেন। রাজ্য পুলিশ, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে গ্রেফতার হতে শুরু করেছেন অনেকে। বাদ যাননি সরকারি আধিকারিকও। একে একে পুলিশের জালে ধরা পড়ছেন রথী-মহারথীরা। সরকারে পালাবদলের পর নানা অভিযোগে গ্রেফতারির খবর মিলছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সেই তালিকায় এক দিকে যেমন রয়েছেন তাবড় নেতা, তেমনই রয়েছেন সরকারি আধিকারিকেরা। বেশির ভাগই রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূলের নেতা-নেত্রী ও তাঁদের ‘ঘনিষ্ঠ’। ভোট-পরবর্তী হিংসা থেকে শুরু করে তোলাবাজি, দুর্নীতি, আর্থিক তছরুপের মামলায় নাম জড়ানোয় রাজ্য জুড়ে এখন গ্রেফতারির ঢল। প্রায় প্রতি দিনই সংবাদ শিরোনামে উঠে আসছে একাধিক নেতা-মন্ত্রী ও তাঁদের সহযোগীদের নাম। পুলিশ বা ইডির হাতে গ্রেফতারির খবর মিলেছে পর পর। আনন্দবাজারের এই প্রতিবেদনে রইল প্রাক্তন শাসকদলের সেই সমস্ত নেতা-কর্মীর তালিকা, ক্ষমতার বদল হতেই যাঁদের ঠিকানা হয়েছে শ্রীঘর। তালিকার প্রথমেই যে নামটি উঠে এসেছে সেটি হল রাজ্যের প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা সুজিত বসু। পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় দক্ষিণ দমদম পুরসভায় বেআইনি ভাবে চাকরিপ্রাপকদের নাম সুপারিশ করার অভিযোগে ইডির হাতে গত ১১ মে গ্রেফতার হন বিধাননগর বিধানসভা কেন্দ্রের পরাজিত বিধায়ক। বিধানসভা ভোটের আগে একাধিক বার ইডি তলব করেছিল তাঁকে। ভোটপ্রচারে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ইডি দফতরে হাজিরা এড়িয়ে ছিলেন তৃণমূলের এই দাপুটে নেতা। আদালতকেও এই বিষয়ে অবহিত করেছিলেন তিনি। ভোট মিটতে ১ মে ইডির দফতরে এক বার হাজিরা দিয়েছিলেন তিনি। পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তদন্তে হাজিরার জন্য গত ১১ মে সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ তিনি ইডির দফতরে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইডির ‘জাল’ এড়াতে পারেননি তৃণমূলের প্রাক্তন নেতা ও মন্ত্রী। প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা জেরার পরে কেন্দ্রীয় সংস্থা রাত ৯টা নাগাদ তাঁকে গ্রেফতার করার কথা ঘোষণা করে। পৈলানে প্রাসাদোপম বাড়ি। বাড়ি সংলগ্ন বাগানে রয়েছে সুইমিং পুল। রয়েছে দোলনাও। রিসর্টের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডলের বাড়ি এটি। বিপক্ষ দলের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে হুমকিমূলক মন্তব্যের একটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়তেই ১৪ মে সকালে তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছিল পুলিশ। সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরাও। দিলীপ সেই সময় বাড়িতে ছিলেন না। বাড়ির বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ঘুরে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ শুরু করেন প্রশাসনের আধিকারিকেরা। থানায় একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয় তৃণমূল বিধায়কের বিরুদ্ধে। বিরোধীদের উদ্দেশে হুমকিসুলভ মন্তব্য করার অভিযোগে বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ককে খুঁজছিল পুলিশ। গ্রেফতারির আশঙ্কায় রক্ষাকবচ চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন দিলীপ। অবশেষে ২৭ মে তাঁর হদিস পায় রাজ্যের পুলিশ। পড়শি রাজ্যে জগন্নাথদেবের পদপ্রান্তে আশ্রয় নিয়েও হয়নি শেষরক্ষা।।

পুরীর ‘ব্লু লিলি’ হোটেল থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) এবং ডায়মন্ড হারবার পুলিশের যৌথবাহিনীর হাতে আটক হন তিনি। ইতিমধ্যেই দিলীপের পুত্র অর্ঘ্য মণ্ডলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় অশান্তি পাকানোর অভিযোগ ওঠে। গ্রেফতারির সময় তাঁর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়। সোনা পাপ্পুর মামলায় ইডির হাতে গ্রেফতার হওয়া আরও এক ‘রাঘববোয়াল’ কলকাতা পুলিশের ডিসি শান্তনু সিংহ বিশ্বাস। সোনা পাপ্পুর মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশকর্তা শান্তনুকে একাধিক বার তলব করেছিল ইডি। কিন্তু তিনি বার বার হাজিরা এড়িয়েছেন বলে অভিযোগ। ১৪ মে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা নাগাদ শান্তনু সিজিও কমপ্লেক্সে গিয়েছিলেন। রাত সাড়ে ৯টার পর তাঁকেও ‘জালবন্দি’ করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। সোনা পাপ্পু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে শান্তনুর বেশ কিছু আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র হাতে এসেছে ইডির। একের পর এক হাজিরায় অনুপস্থিত থাকার পর ইডি সন্দেহ করেছিল যে তিনি চোখ এড়িয়ে বিদেশে গা-ঢাকা দিতে পারেন। সেইমতো শান্তনুর বিরুদ্ধে লুক আউট নোটিসও জারি করা হয়। শুধু সোনা পাপ্পু নয়, কলকাতা এবং দিল্লির দফতরে একাধিক মামলায় নাম জড়িয়েছে শান্তনুর। শান্তনুর ফার্ন রোডের বাড়িতে তল্লাশির পর থেকেই কার্যত বেপাত্তা ছিলেন এই পুলিশকর্তা। একসময় কালীঘাট থানার ওসি ছিলেন এই শান্তনু।তৃণমূলের জনপ্রতিনিধি। বাদুড়িয়া পুরসভার চেয়ারম্যান। ভোটপর্ব মিটতেই দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সরকারের পালাবদলের পর গ্রেফতারির আশঙ্কায় গা-ঢাকা দিয়েছিলেন এই তৃণমূলের নেতা। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি ত্রাণ নিয়ে কারচুপি, আর্থিক অনিয়ম এবং দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগ ছিল। সেই প্রেক্ষিতে পুরসভার চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দায়ের হয় থানায়। গোপন সূত্রে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে সোমবার রাতে বাদুড়িয়া থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। তার আগেই তৃণমূলের কার্যালয় এবং একটি বাগানবাড়ি থেকে প্রায় ৪ হাজার সরকারি ত্রিপল উদ্ধার করে পুলিশ। সোমবার বাদুড়িয়ার পুরপ্রধানকে একটি হোটেল থেকে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। সেই সময় দীপঙ্করের হেফাজতে থাকা ৮০ লক্ষ টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। বুধবার তাঁর পাটের খেতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠে পুলিশকর্তাদের। টাকাভর্তি মোট চারটি ট্রলি এবং একটি বস্তা উদ্ধার করা হয়েছে মাটি খুঁড়ে। সেই টাকার পরিমাণ ৮০ লক্ষের কাছাকাছি হতে পারে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধান পুলিশের। মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশে আপাতত দীপঙ্কর ছ’দিনের পুলিশি হেফাজতে থাকবেন। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকার সময় তোলাবাজির অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ক্ষমতা পাল্টে যেতেই বেহালা এলাকায় দাপুটে নেতা বলেই পরিচিত তৃণমূল নেতা সুদীপ পোল্লেকে গ্রেফতার করে ঠাকুরপুকুর থানার পুলিশ। কলকাতা পুরসভার ১২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুদীপ। নিউ আলিপুর কলেজে ছাত্র পরিষদ দিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় সুদীপের। প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য বলে পরিচিত সুদীপের তৃণমূলে উত্থান হয় উল্কাগতিতে। একটা সময় বেহালা এলাকায় বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ দিতেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের একটা পানের দোকানও ছিল। দাদাদের সঙ্গে সেই দোকানও চালাতেন সুদীপ। শোভন-ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে ২০১০ সালে পুরসভা নির্বাচনে টিকিট পেয়েছিলেন তিনি। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের টানা ১৫ বছরের কাউন্সিলর তিনি। সুদীপের নামে এক ব্যবসায়ী তোলা চাওয়ার অভিযোগ করেন। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, তাঁর কাছ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা চাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, সেই টাকা না দিলে তাঁর দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন সুদীপ ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গোরা। তোলাবাজি, সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে বিধাননগর পুর নিগমের মোট চার জন তৃণমূল কাউন্সিলরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তোলাবাজি ও ভয় দেখানোর অভিযোগে বাগুইআটি থানার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন সম্রাট বড়ুয়া ওরফে রাখাল। ইডির হাতে ধৃত রাজ্যের প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুর ঘনিষ্ঠ বিধাননগরের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রঞ্জন পোদ্দারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধেও তোলাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি ঘটনার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে বিধাননগর পুরসভার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি সুশোভন মণ্ডল ওরফে মাইকেলকে। অভিযোগ ছিল মুদির দোকানে সংস্কারের জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা তোলা দাবি করেন অভিযুক্ত পুরপ্রতিনিধি এবং তাঁর দলবল। তৃণমূল জমানায় সমরেশ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যে তিনি বাগুইআটির এক প্রোমোটারের থেকে ৫০ লক্ষ টাকা তোলা চেয়েছিলেন। এই ঘটনার সূত্রে অবশেষে শুক্রবার বাগুইআটি থানার পুলিশের জালে ধরা পড়েন সমরেশ। গত বছরের অগস্টে কোচবিহার সফরে এসেছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী। সেই সময় খাগরাবাড়িতে তাঁর উপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল তৃণমূল যুব সভাপতি স্বপন বর্মণের। যুব তৃণমূলের জেলা সভাপতি সেই তরুণ নেতাকে ২৫ মে সোমবার রাতে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর সভায় হামলা ছাড়াও মাথাভাঙার প্রাক্তন বিধায়ক সুশীল বর্মণের গাড়ি ভাঙচুরেও অভিযুক্ত স্বপন। কোচবিহার ঘোকসাডাঙা থানার পুলিশ মাথাভাঙা থেকে স্বপনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার করার সময় তৃণমূল নেতার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১ রাউন্ড গুলি ও একটি পিস্তল। ২৭ মে ভোট-পরবর্তী হিংসা মামলায় ফেঁসে সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার শাহজাহান-ঘনিষ্ঠ কাদের মোল্লা। তাঁর সঙ্গে ধরা পড়েন আরও ১০ জন। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের পর সন্দেশখালিতে বিজেপি কর্মী সুকান্ত মণ্ডল, প্রদীপ মণ্ডল-সহ তিন বিজেপি কর্মীকে খুনের অভিযোগ ওঠে কাদেরের বিরুদ্ধে। তিন বিজেপি সমর্থক ও সক্রিয় কর্মীকে গুলি করার পর কুপিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে। পতাকা খোলাকে কেন্দ্র করে এই বিবাদের সূত্রপাত। সন্দেশখালি-কাণ্ডে অভিযুক্ত শাহজাহান শেখের অনুগামী বলে পরিচিত হাটগাছি গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান আব্দুল কাদের মোল্লা। বিজেপির সমর্থকের উপর হামলা ছাড়াও নিজের দলের বিধায়কের গাড়িতেও হামলার অভিযোগ রয়েছে কাদেরের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালে সন্দেশখালির তৃণমূল বিধায়ক সুকুমার মাহাতোর গাড়িতে ইট-পাটকেল ছোড়ে কাদের ও তাঁর দলবল। থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন বিধায়ক সুকুমার। এসআইআর পর্বে খসড়া তালিকা প্রকাশের আগে নির্বাচন কমিশনের মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটারদের তালিকায় ‘মৃত’ বলে নাম ছিল ডানকুনির তৃণমূলের কাউন্সিলর সূর্য দে-র। তালিকায় নিজেকে ‘মৃত’ দেখার পর সদলবলে শ্মশানে চলে যান ওই কাউন্সিলর। কমিশনের আধিকারিকদের কাছে তিনি দাহকার্য সম্পন্ন করার আর্জি জানান। পরে ঘটনাটি নিয়ে শোরগোল হওয়ায় তাঁর নাম ভোটার তালিকায় সংযুক্ত হয়। হুগলির ডানকুনির সেই জনপ্রতিনিধিকে ২০২৫ সালের ২৮ মে এক ব্যক্তিকে মারধর করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ২০ মে বুধবার রাতে সূর্যকে গ্রেফতার করে ডানকুনি থানার পুলিশ। সরকার বদলের পর তৃণমূল কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জানান আক্রান্ত ব্যক্তি।

তৃণমূলের অন্দরে কাদা ছোড়াছুড়ি বেড়েই চলেছে। দলের কাউন্সিলরদের বিভিন্ন পদ থেকে ইস্তফা নিয়ে এ বার দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিঁধলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা পুরসভার পদ থেকে দলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীর ইস্তফার জন্য অভিষেককেই দায়ী করেছেন তিনি। সেই সঙ্গে সদ্য দলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদারকেও কটাক্ষ করেছেন কল্যাণ। নারদ মামলায় কাকলির যোগের প্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। কলকাতা পুরসভার ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অরূপ তৃণমূলের অন্যতম মুখপাত্র। বুধবার তিনি পুরসভার অ্যাকাউন্টস কমিটির সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। এ ছাড়া, ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ পুরসভার বরো চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে দিয়েছেন। দু’জনে একসঙ্গেই পুরসভায় গিয়ে ইস্তফাপত্র জমা দেন। অরূপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতে গিয়েই কল্যাণ নিশানা করেছেন অভিষেককে। তাঁর কথায়, ‘‘অরূপকে নেতা করেছেন কে? অভিষেক। তাই উনিই দায়ী এ সবের জন্য। অভিষেক যাঁদের নেতা করেছেন, তাঁরাই এখন ওঁর বিরুদ্ধে বলছেন।’’ অরূপকে নিশানা করে কল্যাণ আরও বলেন, ‘‘অরূপের কী যোগ্যতা আছে যে, ও সারা রাজ্যের নেতা হবে? গোটা রাজ্যে বক্তৃতা করে বেড়িয়েছে। আজ কেন যাচ্ছে না?’’ সুশান্তের ইস্তফা নিয়ে কল্যাণ নির্দিষ্ট করে কিছু না বললেও তাঁর সঙ্গে অভিষেকের ঘনিষ্ঠতার কথা তৃণমূলের অন্দরে অনেকেই জানেন। গত জানুয়ারি মাসে নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকে দু’টি সেবাশ্রয় শিবির হয়েছিল অভিষেকের উদ্যোগে। একটি ব্লকের দায়িত্বে ছিলেন এই সুশান্ত। অন্যটিতে যিনি দায়িত্বে ছিলেন, সেই ঋজু দত্ত ফলঘোষণার পরের দিন থেকেই দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব ও আইপ্যাককে নিয়ে তোপ দাগা শুরু করেছিলেন সমাজমাধ্যমে। বাধ্য হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূলকে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করতে হয়। তাঁকে দল থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। ঘটনাচক্রে, সেই ঋজুও অভিষেক-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। কল্যাণের এই বক্তব্য নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন অরূপও। কল্যাণের পুত্র শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিধানসভা ভোটে টিকিট পাওয়া নিয়ে তিনি পাল্টা কটাক্ষ করেছেন। অরূপের কথায়, ‘‘কল্যাণদার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। উনি দুর্দিনের নেতা। আমার না হয় কোনও যোগ্যতা নেই। কিন্তু উত্তরপাড়ায় শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় টিকিট পেলেন কোন যোগ্যতায়? এই প্রশ্ন তো আমি তুলিনি। হুগলির নেতা সুবীর মুখোপাধ্যায় এই প্রশ্ন তুলেছেন। যিনি কল্যাণদার মানসপুত্র হিসাবে পরিচিত। তা হলে কি নিজের পুত্রের জন্য মানসপুত্রকে বলি দিতে হল?’’ বারাসতের সাংসদ কাকলি গত কয়েক দিন ধরেই ‘বেসুরো’ ছিলেন। লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতকের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পর সমাজমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। সম্প্রতি তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে দেখা গিয়েছে। বুধবার সেই কাকলি তৃণমূলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। কারণ হিসাবে আরজি কর-কাণ্ড এবং আইপ্যাক সংক্রান্ত অসন্তোষের উল্লেখ করেছেন। শীর্ষ নেতৃত্বকে দেওয়া চিঠিতে নাম না-করে কল্যাণকে নিশানা করেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘‘যে পদে থাকাকালীন মহিলা সাংসদের উপর অন্য এক জন অশিক্ষিত, অভদ্র দলীয় সাংসদের অশালীন আচরণ বন্ধ করা যায় না বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সহযোগিতা সহানুভূতি পাওয়া যায় না, (তখন) সে পদে থাকার মানে হয় না।’’ কাকলির এই অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে কল্যাণ বলেছেন, ‘‘২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমি সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতক পদে ছিলাম। মাঝখানে কয়েক মাস ওই দায়িত্বে ছিলাম না। ওঁর (কাকলির) আবার কিসের এত কথা? নারদে তো আমি পাঁচ লক্ষ টাকা নিইনি। উনি নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সিন্ডিকেট শব্দের জন্মদাত্রী কে? সকলে জানেন। সেই সিন্ডিকেটের জন্মস্থান রাজারহাট।’’ তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাককেও ফের নিশানা করেছেন কল্যাণ। তাঁর কথায়, ‘‘দলে পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা তুলে দিয়েই সর্বনাশ করেছে আইপ্যাক। আমরা তো কংগ্রেস থেকে তৈরি দল। সব দলে পর্যবেক্ষক ব্যবস্থা আছে। যা নেতৃত্বের সঙ্গে কর্মীদের আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। সেই ব্যবস্থাই তুলে দেওয়া হল। এটা কার মস্তিষ্কপ্রসূত?’’ ইঙ্গিতে এ প্রশ্নেও অভিষেককে নিশানা করতে চেয়েছেন কল্যাণ।

বাদুড়িয়ার পুরপ্রধানের পাটখেত থেকে উদ্ধার হওয়া রাশি রাশি টাকা গোনা হল সারা রাত। বুধবার সন্ধ্যা থেকে টাকা গোনা শুরু হয়। রাতভর টাকা গোনার প্রক্রিয়া চলে। উপস্থিত ছিলেন ব্যাঙ্ক এবং বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকেরা। চার বার গোনার পর টাকার পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয় পুলিশ। বাদুড়িয়ার পুরপ্রধান দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের পাটের খেতে মাটি খুঁড়ে টাকা উদ্ধার করেছিল পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যা থেকে টাকা গোনা শুরু হয়। রাতভর টাকা গোনার প্রক্রিয়া চলে। উপস্থিত ছিলেন ব্যাঙ্ক এবং বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকেরা। চার বার গোনার পর টাকার পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয় পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোরে পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, উদ্ধার হওয়া টাকার পরিমাণ ২ কোটি ২৪ লক্ষ! বাদুড়িয়ার পুরপ্রধানকে একটি হোটেল থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তখনও তাঁর কাছ থেকে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা উদ্ধার করেছিল পুলিশ। মঙ্গলবার আদালত তাঁকে ছ’দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। বুধবার দীপঙ্করকে সঙ্গে নিয়েই তৃণমূল কার্যালয়ের পাশে একটি জমিতে যায় পুলিশ। খেতের একটি জায়গায় মাটি খুঁড়ে ব্যাগভর্তি টাকা উদ্ধার হয়েছে। টাকাভর্তি মোট চারটি ট্রলি এবং একটি বস্তা উদ্ধার করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সব ক’টি ব্যাগের ভিতরেই তাড়া তাড়া ৫০০ টাকার নোট ছিল। প্রাথমিক ভাবে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছিল, মোট ৮০ লক্ষ টাকা উদ্ধার হয়েছে। তবে তখনও সব টাকা গোনা শেষ হয়নি। বিপুল পরিমাণ টাকা গুনতে যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয়। অবশেষে টাকার পরিমাণের কথা জানিয়ে দিল পুলিশ। পুরপ্রধানকে একটি হোটেল থেকে পাকড়াও করার পর সেই রাতেই বাদুড়িয়া পুরসভা পরিচালিত পরিত্যক্ত কম্পিউটার সেন্টার থেকে প্রায় চার হাজার সরকারি ত্রিপল এবং ৮০ লক্ষ টাকা উদ্ধার হয়। বুধবার উদ্ধার হওয়া টাকার পুরোটা গোনা শেষ করা যায়নি। ব্যাগ এবং বস্তবন্দি টাকা নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। কী ভাবে এত টাকা পেয়েছিলেন দীপঙ্কর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেউ বলছেন, আবাসের টাকা সরিয়ে নিয়েছিলেন পুরপ্রধান। কারও অভিযোগ, সবই তোলাবাজির টাকা। পুলিশ তদন্ত করছে।





