RK NEWZ প্রায় পাঁচ দশক ধরে বাংলা সিনেমার মুখ হয়ে থেকেছেন তিনি। একের পর এক প্রজন্ম বদলেছে, পাল্টেছে টলিউডের ভাষা, বাজার, দর্শকের রুচি, কিন্তু প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় থেকে গিয়েছেন কেন্দ্রবিন্দুতেই। এবার সেই দীর্ঘ অভিনয় জীবনের স্বীকৃতি দিল দেশ। রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত প্রথম ‘সিভিল ইনভেস্টিচার সেরিমনি’-তে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে সম্মানিত করা হবে। বাঙালি সিনেমাপ্রেমীদের কাছে যা নিঃসন্দেহে এবারের পদ্ম পুরস্কারের সবচেয়ে বড় খবর। ২৫ মে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু রাষ্ট্রপতি ভবনের গণতন্ত্র মণ্ডপে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের হাতে তুলে দেবেন পদ্ম সম্মান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। প্রথম পর্বের এই অনুষ্ঠানে মোট ৬৬টি পদ্ম পুরস্কার প্রদান করা হবে। পরে দ্বিতীয় দফার অনুষ্ঠানেও বাকি সম্মান তুলে দেওয়া হবে বলে সূত্রের খবর। এ বছর মোট ১৩১টি পদ্ম সম্মানের ঘোষণা করেছে কেন্দ্র সরকার। তার মধ্যে রয়েছে ৫টি পদ্মবিভূষণ, ১৩টি পদ্মভূষণ এবং ১১৩টি পদ্মশ্রী। প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবসে এই সম্মানপ্রাপকদের নাম ঘোষণা করা হয়। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সমাজসেবা, ক্রীড়া, প্রশাসন এবং জনকল্যাণ-সহ নানা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য দেওয়া হয় এই পুরস্কার।
তবে বিনোদন জগতের তালিকায় বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে সবচেয়ে বেশি চর্চায় প্রসেনজিৎ। ৩৫০-রও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। একসময় বাণিজ্যিক বাংলা ছবির একমাত্র ভরসা ছিলেন, আবার পরবর্তী সময়ে নিজেকে ভেঙে নতুন ধরনের চরিত্রেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘অটোগ্রাফ’, ‘জাতিস্মর’, ‘মনের মানুষ’, ‘গুমনামি’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কাজ— বারবার নিজের অভিনয়ের পরিধি বদলেছেন তিনি। সেই কারণেই এই সম্মান শুধু একজন অভিনেতার প্রাপ্তি নয়, বাংলা সিনেমারও প্রাপ্তি বলে মনে করছেন অনেকে।এবারের তালিকায় বিনোদন দুনিয়ার আরও একাধিক পরিচিত নাম রয়েছে। মালয়ালম সিনেমার সুপারস্টার মামুট্টি পাচ্ছেন ‘পদ্মভূষণ’। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয় জীবনে মালয়ালম, তামিল ও হিন্দি ছবিতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। এর আগে ১৯৯৮ সালে পেয়েছিলেন ‘পদ্মশ্রী’। জনপ্রিয় প্লেব্যাক সিঙ্গার অলকা ইয়াগনিকও ভারতীয় সঙ্গীত জগতে দীর্ঘ অবদানের জন্য পাচ্ছেন ‘পদ্মভূষণ’ সম্মান। মরণোত্তর ‘পদ্মবিভূষণ’ দেওয়া হচ্ছে হিন্দি সিনেমার বর্ষীয়ান অভিনেতা ধর্মেন্দ্রকে। ‘শোলে’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘ফুল অউর পাত্থর’-এর মতো ছবির এই অভিনেতা ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় নাম হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। পদ্মশ্রীর তালিকায় রয়েছেন অভিনেতা ও পরিচালক আর মাধবনও। ‘রেহনা হ্যায় তেরে দিল মে’, ‘থ্রি ইডিয়টস’ এবং ‘রকেট্রি: দ্য নাম্বি ইফেক্ট’-এর জন্য তিনি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিলেন। ‘রকেট্রি’-র জন্য জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন মাধবন। মরণোত্তর পদ্মশ্রী দেওয়া হচ্ছে জনপ্রিয় অভিনেতা সতীশ শাহকে। ‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’, ‘ইয়ে যা হ্যায় জিন্দেগি’, ‘এফআইআর’-এর মতো ধারাবাহিক এবং ‘ম্যায় হুঁ না’, ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’, ‘মুঝসে শাদি করোগি’র মতো ছবিতে তাঁর কমিক টাইমিং এখনও দর্শকের মনে রয়ে গিয়েছে।
থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের বর্ষীয়ান অভিনেতা অনিল কুমার রাস্তোগীকেও পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত করা হচ্ছে। অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। অন্যদিকে, ছয় দশকের অভিনয় জীবনের জন্য পদ্মশ্রী পাচ্ছেন অভিনেতা ও পরিচালক অরবিন্দ বৈদ্য। বর্তমানে তিনি জনপ্রিয় হিন্দি ধারাবাহিক ‘অনুপমা’-য় হাসমুখ “বাবুজি” শাহ চরিত্রে অভিনয় করছেন। এবারের পদ্ম পুরস্কারে শুধু তারকারাই নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ৪৫ জন নেপথ্যের সমাজকর্মীকেও সম্মান জানানো হচ্ছে। প্রান্তিক মানুষ, আদিবাসী সম্প্রদায়, দলিত সমাজ কিংবা দুর্গম অঞ্চলে কাজ করা বহু মানুষ এই তালিকায় রয়েছেন, যাঁরা সারাজীবন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীকল্যাণ, শিশু সুরক্ষা, জীবিকা এবং সমাজসেবার কাজে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। ১৯৫৪ সালে শুরু হওয়া পদ্ম পুরস্কার আজও দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ অসামরিক সম্মান হিসেবে বিবেচিত হয়। পদ্মবিভূষণ দেওয়া হয় ব্যতিক্রমী ও অসামান্য সেবার জন্য, পদ্মভূষণ উচ্চস্তরের বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং পদ্মশ্রী দেওয়া হয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজের জন্য। এবার বাংলার দর্শকের নজর সবচেয়ে বেশি থাকবে একটাই মুহূর্তে— যখন রাষ্ট্রপতি ভবনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘পদ্মশ্রী’ গ্রহণ করবেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এত বছরের জনপ্রিয়তা, লড়াই এবং বাংলা সিনেমাকে টেনে নিয়ে চলার পর এই সম্মান কি অনেক আগেই তাঁর প্রাপ্য ছিল?





