RK NEWZ এক বছর আগের সেই কালো ছায়া সরিয়ে কাশ্মীর এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে। পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, হোটেলগুলোতে ৪০ শতাংশ বুকিং শুরু হয়েছে, যা আগামীতে আরও বাড়বে। আবারও উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পর্যটকদের হাসির শব্দ। তবে এই হাসির অন্তরালে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে সেনাবাহিনী। এক বছর আগে জঙ্গিদের গুলিতে রক্তে ভিজেছিল পহেলগামের মাটি। প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৬ জন নিরপরাধ মানুষ। সেই হামলার পর নিরাপত্তার খাতিরে উপত্যকার ৪৮টি পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছিল প্রশাসন। সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও টাটকা, কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না। এক বছর পর তার মধ্যে ৩৯টি পর্যটন কেন্দ্র ফের খুলে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের চোখে ধরা দিল এক বদলে যাওয়া কাশ্মীরের ছবি, যেখানে ভয় কাটিয়ে আবারও বাড়ছে পর্যটকদের ভিড়।
পহেলগামের বৈসরন: যেখানে এখনও যাওয়া নিষেধ
পহেলগামের মূল শহর থেকে ৫ কিমি দূরে অবস্থিত ছবির মতো সুন্দর বৈসরন ভ্যালি। এক বছর আগে এখানে যখন হামলা হয়েছিল, তখন নিরাপত্তার কোনও চিহ্ন ছিল না। আজ ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। পাহাড়ি রাস্তায় প্রতি মুহূর্তে টহল দিচ্ছে সিআরপিএফ ও পুলিশের সশস্ত্র বাহিনী। একটি নির্দিষ্ট সীমার পর এখন সেখানে যাওয়া নিষেধ।
পুলিশ জানাচ্ছে, বৈসরন সংলগ্ন ঘন জঙ্গলে ২৪ ঘণ্টা টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী। স্থানীয় প্রশাসনের সাফ কথা, “যতক্ষণ না সরকারিভাবে ছাড়পত্র মিলছে, ততক্ষণ পর্যটক তো বটেই, স্থানীয়দেরও ওদিকে যাওয়ার অনুমতি নেই।” তিনি আরও জানান, সেখানে সকাল সাতটা থেকে সন্ধে পেরিয়ে শেষ হয় টহলের ডিউটি। সেই হামলার পর থেকে এটাই তাঁদের রুটিন।
টিউলিপ গার্ডেন
শ্রীনগরের জবরওয়ান পাহাড়ের কোলে এশিয়ার বৃহত্তম টিউলিপ গার্ডেনও সেজে উঠেছে ১৮ লক্ষ টিউলিপে। ১৬ মার্চ বাগান খোলার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ২.৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ ভিড় করেছেন। গত বছর হামলার পর এই বাগান খাঁ খাঁ করত, এবার চিত্রটা উল্টো। তবে বাগানের তিনটি গেটে সশস্ত্র বাহিনী এবং ভেতরে সিভিল ড্রেসে গোয়েন্দারা নজরদারি চালাচ্ছেন।
সোনমার্গ
সোনমার্গের পথে নতুন প্রাণের জোয়ার এনেছে ২০২৫-এর জানুয়ারিতে চালু হওয়া ‘জেড-মোরহ’ টানেল। এখানে সিন্ধু নদের পাড়ে এখন থিকথিক করছে ভিড়। থাজিওয়াস হিমবাহে যাওয়ার পথে ঘোড়া চড়ে পর্যটকদের ঢল নামছে।
বাদামওয়ারি ও দ্রাং
শ্রীনগরের বাদামওয়ারিতেও পর্যটক সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশ বেড়েছে। তবে নিরাপত্তার কড়াকড়ি এমনই যে, কোনও বিদেশি পর্যটক এলে প্রতিদিন তার হিসেব পুলিশকে দিতে হয়। অন্যদিকে, গুলমার্গের কাছে দ্রাং গ্রামে এখন আর শুধু প্রকৃতি নেই, পর্যটন কেন্দ্রের পাশেই তৈরি হয়েছে বুলেটপ্রুফ বাঙ্কার। তংমার্গ থেকে দ্রাং পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার রাস্তায় বসানো হয়েছে পাঁচটি চেকিং পয়েন্ট।
প্রশাসনের কড়া নজরদারি
নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রশাসন কতটা কঠোর, তা বোঝা যাচ্ছে একটি তথ্যে – বিদেশি পর্যটকদের তথ্য গোপন করার অভিযোগে এ পর্যন্ত অন্তত ছয়টি মামলা রুজু হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানান, “আমরা কোনও কিছুকেই হালকাভাবে নিচ্ছি না। পর্যটন কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা প্রতিদিন রিভিউ করা হচ্ছে এবং গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান চলছে।”

এক বছর আগের সেই কালো ছায়া সরিয়ে কাশ্মীর এখন ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে। পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, হোটেলগুলোতে ৪০ শতাংশ বুকিং শুরু হয়েছে, যা আগামীতে আরও বাড়বে। গুলির শব্দের বদলে আবারও উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পর্যটকদের হাসির শব্দ। তবে এই হাসির অন্তরালে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে সেনাবাহিনী। সেই অভিশপ্ত দিন। জঙ্গিদের আচমকা হামলায় কেঁপে উঠেছিল ভূস্বর্গ। রক্তাক্ত হয়েছিল কাশ্মীরের পহেলগাম। সেই ভয়াবহ পহেলগাম জঙ্গি হামলার প্রথম বর্ষপূর্তিতে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একইসঙ্গে সাফ জানিয়ে দিলেন, ভারত কোনওদিন সন্ত্রাসের কাছে মাথা নত করবে না। এদিন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) একটি আবেগঘন পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি গত বছরের সেই নারকীয় হামলায় প্রাণ হারানো নিরপরাধ মানুষদের স্মরণ করেন। মোদী লেখেন, “আজ থেকে এক বছর আগে পহেলগামের সেই নৃশংস জঙ্গি হামলায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, দেশ তাঁদের আত্মত্যাগ কোনওদিন ভুলবে না। স্বজনহারা পরিবারগুলো যে অপূরণীয় ক্ষতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, এই কঠিন সময়ে আমি এবং গোটা দেশ তাঁদের পাশে রয়েছে।” এই বার্তায় স্বজনহারাদের প্রতি যেমন গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, তেমনই দেশের একতা ও অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নে ফুটে উঠেছে দৃঢ় সঙ্কল্প। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শোকের এই মুহূর্তে গোটা দেশ ঐক্যবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমরা শোকাতুর ঠিকই, কিন্তু আমাদের সংকল্প অবিচল। ভারত কখনও কোনও ধরনের সন্ত্রাসবাদের সামনে মাথা নোয়াবে না। সন্ত্রাসবাদীদের হীন চক্রান্ত এবং অশুভ উদ্দেশ্য কখনও সফল হবে না।” মোদীর এই বার্তা আসলে সীমান্তপার সন্ত্রাস এবং অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ বা জিরো আপস নীতিরই প্রতিফলন। দেশ যে কোনও মূল্যে উগ্রপন্থার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত, তা আরও একবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দিলেন তিনি। গত এক বছরে পহেলগাম থেকে শুরু করে উপত্যকার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক বদল এলেও, আজকের দিনটি সাধারণ মানুষের কাছে আজও এক যন্ত্রণার স্মৃতি। গত বছরের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে পর্যটকদের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে লস্কর-ই-তইবা সমর্থিত জঙ্গিরা। সেদিন নির্বিচারে চলেছিল গুলিবর্ষণ, প্রাণ হারান ২৬ জন সাধারণ মানুষ-পর্যটক। ঘটনার দায় স্বীকার করে লস্করের শাখা সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’, যদিও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে পরে তারা পিছু হটে।





