Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

রেকর্ড গড়া আকাশকন্যা প্রিয়া অধিকারী? টানা ছ’দিন নেপালের আকাশে উড়ে শতাধিক উদ্ধার অভিযান!

RK NEWZ নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন ৪০ বছর বয়সি প্রিয়া। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নিরলস কাজ করে চলেছেন। টানা ছ’দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধু আকাশে উড়েছেন। ১০০টি অভিযানে অংশ নিয়ে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আটকে থাকা শত শত বন্যাদুর্গতকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও হেলিকপ্টার উড়িয়েছেন নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টারচালক প্রিয়া অধিকারী। বন্যাবিধ্বস্ত নেপালের রসুয়া জেলার তিমুরে গ্রামের পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর দুর্গম এই এলাকায় বহু মানুষ আটকে পড়েছেন। এখনও অনেকে নিখোঁজ। তাঁদের সন্ধানে এবং দুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে আকাশপথে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। তিমুরে গ্রামের উপর দিয়ে প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার অবিরাম উড়ে উদ্ধারকাজ করে চলেছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা এবং প্রবল স্রোতের কারণে স্থলপথে উদ্ধারকারী দলগুলোর পৌঁছোনো অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে হেলিকপ্টারই এখন দুর্গতদের কাছে পৌঁছোনোর অন্যতম প্রধান ভরসা। ফলে ক্লান্তি বা বিশ্রামের কোনও অবকাশই ছিল না প্রিয়ার কাছে। তিমুরে-সহ একাধিক গ্রামের বন্যাকবলিত মানুষদের কাছে দেবদূতের মতো হয়ে উঠেছেন প্রিয়ার মতো হেলিকপ্টার চালকেরা। আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে শ’খানেক উদ্ধার অভিযানে শামিল হয়েছেন এই মহিলা কপ্টারচালক। ৪০ বছর বয়সি প্রিয়া নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন। নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় জীবিতদের কাছে পৌঁছোতে প্রায় কোনও বিরতি না নিয়েই হেলিকপ্টার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ভয়াবহ এই দুর্যোগ ইতিমধ্যে প্রায় ১,০০০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। গৃহহীন অসংখ্য মানুষ। উদ্ধারকারী দলগুলোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুর্গত এলাকায় খাবার, ওষুধ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ তো রয়েছেই। পাশাপাশি আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নিরলস কাজ করে চলেছেন ক্যাপ্টেন প্রিয়া। দিনের পর দিন টানা হেলিকপ্টার চালানোর পর ক্লান্ত প্রিয়া নিজেও। সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়া জানান, জীবনে এত ব্যাপক ও ভয়াবহ দুর্যোগ ইতিপূর্বে কখনও প্রত্যক্ষ করেননি। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং অসংখ্য মানুষের অসহায় পরিস্থিতি দেখে গভীর ভাবে মর্মাহত তিনি। দুর্যোগের ভয়াবহতার সঙ্গে একটানা উদ্ধার অভিযানে প্রভাব পড়ছে কপ্টারচালকদের শরীরে ও মনে। যদিও এই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত তাঁরা। বছরের পর বছর ধরে হিমালয়ে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার চালিয়েছেন প্রিয়া। কিন্তু নেপালের বিপর্যয়ের মতো ঘটনা তাঁর দেখা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বলে জানিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে হিমালয়ের দুর্গম ও উঁচু পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজে হেলিকপ্টার চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন প্রিয়া। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় উদ্ধার অভিযানের ব্যাপকতা তাঁর বহু বছরের অভিজ্ঞতাকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে বলে জানিয়েছেন নেপালের প্রথম মহিলা কপ্টারচালক। নেপালের রসুয়া জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি তিমুরে গ্রামে এখন প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার উদ্ধারকাজে ব্যস্ত। সেখানে এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। প্রিয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা জানান দিয়েছে, এতগুলো হেলিকপ্টারের মধ্যে সমন্বয় করাই উদ্ধার অভিযানের বড় চ্যালেঞ্জ। যখন একই জায়গায় জীবিতদের উদ্ধারের জন্য একসঙ্গে কয়েকটি হেলিকপ্টার পৌঁছে যায়, তখন আসল সমস্যা দেখা দেয়। বন্যার পর জমে থাকা পুরু কাদা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। কিছু জায়গায় হেলিকপ্টার নিরাপদে অবতরণ করলেও ইঞ্জিন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই জীবিতদের উদ্ধারের সময়ও পাইলটদের হেলিকপ্টার চালু রাখতে হচ্ছে। তাঁদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে প্রকৃতি। তিমুরে গ্রামের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সেই ভয়াবহ দৃশ্যের কথা স্মরণ করে এখনও শিউরে উঠছেন প্রিয়া। আকস্মিক বন্যার পর এলাকায় বিভিন্ন জায়গায় মৃতদেহ ছড়িয়েছিটিয়ে থাকার ভয়াবহ দৃশ্য নাড়া দিয়েছিল তাঁর ইস্পাতকঠিন স্নায়ুকেও। দুর্যোগের প্রথম দু’দিনের মধ্যেই সেখান থেকে ২০০ জনের বেশি জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা হয়। এই উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর পাঁচ-ছয়টি হেলিকপ্টার যোগ দেয়।সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।” তবে এই ভয়াবহ ধ্বংসের মধ্যেও জীবিত মানুষদের দেখতে পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন তিনি। প্রিয়া বলেন, “যখনই আমি হেলিকপ্টার নিয়ে নামতে যাই, চারপাশে অনেক মানুষকে দেখতে পাই। আমি তাঁদের দিকে হাত নেড়ে বলি, ভাগ্য ভাল বলে বেঁচে গিয়েছেন।’’ প্রিয়া এ-ও স্বীকার করে নিয়েছেন, যাঁদের তিনি উদ্ধার করছেন তাঁরা তাঁর পরিচিত বা আত্মীয় নন। তবুও প্রতিটি উদ্ধার অভিযান তাঁর মনে গভীর আবেগ তৈরি করছে। আকাশ থেকে জীবিত মানুষ ও মৃতদেহ দেখার সেই অনুভূতি বোঝানোর ভাষা নেই এই আকাশকন্যার। বন্যার ব্যাপকতাকে নেপালের ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন প্রিয়া। প্রিয়ার বিমানচালক হওয়ার পথ শুরু হয়েছিল ককপিট থেকে অনেক দূরে। লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। পরে কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ করেন। এর পর একটি হেলিকপ্টারে চড়ার পর তাঁর উড়োজাহাজ চালানোর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি পরে কপ্টারচালক হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন।হেলিকপ্টার চালানোর বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে ফিলিপিন্সে পাড়ি দেন প্রিয়া। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি ক্যাপ্টেন হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে উত্তীর্ণ হন। এই প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার পর ২০১৭ সালে তিনি পূর্ণকালীন হেলিকপ্টার চালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাইলট হিসেবে কাজ করার পর ধীরে ধীরে বিভিন্ন উদ্ধার অভিযানে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। হিমালয়ের দুর্গম ও বিপজ্জনক এলাকায় হেলিকপ্টার চালানো সহজ নয়। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পাহাড়ে বাধার কারণে সেখানে উ়ড়ান ও অবতরণ দুটোই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ সব পরিস্থিতির মধ্যেই নিয়মিত উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়ে থাকেন প্রিয়া। হিমালয়ে কাজ করার সময় তিনি মাউন্ট এভারেস্টে বিপদে পড়া ও আহত পর্বতারোহীদের উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে আহত বা অসুস্থ পর্বতারোহীদের হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসাই ছিল এই সব অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। এই ধরনের অভিযানগুলি পরিচালনা করার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সুউচ্চ এলাকায় বাতাসের ঘনত্ব কম থাকায় হেলিকপ্টারের কর্মক্ষমতা কমে যায়। ফলে চালককে আবহাওয়া, পাহাড়ের অবস্থান এবং হেলিকপ্টারের সক্ষমতা— সবকিছু খুব সতর্ক ভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বছরের পর বছর ধরে দুর্গম ও উঁচু পাহাড়ি এলাকায় হেলিকপ্টার চালানো এবং উদ্ধার অভিযানে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা প্রিয়াকে কঠিন ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করেছে। কিন্তু নেপালের এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তবুও এত ক্লান্তি, ঝুঁকি আর ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি থেমে যাননি। জীবিত মানুষদের কাছে পৌঁছে তাদের নিরাপদে উদ্ধারের জন্য তিনি বার বার আকাশে উড়ে চলেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles