RK NEWZ আটলান্টার মেয়র আন্দ্রে ডিকেন্স বছরখানেক আগেই বলে দিয়েছিলেন, ‘‘আমরা চাই না, ওই বাস্তুহীনরা শহরের কোথাও থাকুক। আমরা বাস্তুহীনদের পার্কে থাকতে দেব না।’’ বিশ্বকাপ ফাইনালের ঠিক এক সপ্তাহ আগে মায়ামি থেকে কাতার উড়ে গিয়েছিলেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনো। বিলাসবহুল প্রাইভেট জেটে। প্রয়াত আমির শেখ হামাদ বিন খলিফার অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দিতে। এবং রীতিমতো ভ্রু-টু কুঁচকে, রূপোর সিংহাসনে রাজকীয় ভাবে বসে ছবি তুলেছিলেন। যা মুহূর্তে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সেই একই রোববারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার গিয়েছিলেন ব্যক্তিগত গল্ফ কমপ্লেক্সে। পঞ্চাশ হাজার স্কোয়ার ফুটের যে কমপ্লেক্স রয়েছে আমেরিকার ভার্জিনিয়ায়। যেখানে অতিকায় এক সুইমিং পুল রয়েছে। অলিম্পিক-সাইজের। যেখান থেকে পটোম্যাক নদীর মনোরম দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যায়। গল্ফ কমপ্লেক্স নামক সে ‘অট্টালিকা’ ট্রাম্প গড়ে তুলেছেন সাড়ে চারশোর উপর গাছের প্রাণ নিয়ে! সে দিনই, সে রোববারেই একটা খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। ফ্রিডম পার্কের গৃহহীনদের নিয়ে। যাঁদের দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছিল ট্রাম্প প্রশাসন! উচ্ছেদ-কার্য চালাচ্ছিল নির্বিচারে, কোনও রকম প্রতিরোধকে আমল না দিয়ে। ফ্রিডম পার্ক জায়গাটা আটলান্টার ফিফা ফ্যান জোন থেকে বিশেষ দূরে নয়। এক মাইলেরও কম। ভয় ছিল, অত কাছে হল্লা চললে, দেশ-বিদেশের সমর্থকরা তা জানতে পারবেন। কেউ কেউ দেখতেও পাবেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন কাউকে রেয়াত করেনি। কোনও রকম আগাম সতর্কতা জারি ছাড়া সে দিন সোজা ফ্রিডম পার্কে ঢুকে পড়েছিল সরকারি কর্মীরা। এবং বাস্তুহীনদের তাঁবু থেকে শুরু করে, আসাবাব-পত্র, নিত্য-জরুরি সামগ্রী, ওষুধপত্র–সমস্ত হঠিয়ে দিয়েছিল এক লহমায়। নির্মম ভাবে।বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালের মাত্র একদিন আগে এ ঘটনা ঘটে। আমেরিকায় সরকারি কর্মীদের বলা হয়, সিটি অফিশিয়াল। তা, তাঁদেরই একজন আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে বলে দেন যে, কোনও উচ্ছেদ-পর্ব চলেনি। যা হয়েছে, সবই ‘রুটিন পার্ক মেইনটেনেন্স’। কিন্তু তার পর থেকে ফ্রিডম পার্কে আর অবিন্যস্ত তাঁবু, ব্যাগপত্তর, টেবল-চেয়ার– কিছুই আর দেখা যায়নি।
আর বাস্তুহীনদের ভিটেমাটি ছাড়া করার এ কাহিনি শুধু আমেরিকার নয়। কানাডার। মেক্সিকোর। অবশ্য আটলান্টার মেয়র আন্দ্রে ডিকেন্স বছরখানেক আগেই বলে দিয়েছিলেন, ‘‘আমরা চাই না, ওই বাস্তুহীনরা শহরের কোথাও থাকুক। আর সেটা সমগ্র আটলান্টা শহরের কথা বলছি। বিশ্বকাপ বলে আলাদা কিছু হবে না। এমনিই আমরা বাস্তুহীনদের পার্কে থাকতে দেব না।’’ শুনতে যতই নিষ্ঠুর লাগুক। আদতে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটাই নিয়ম। গত বছর আগস্টে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, ‘‘আটলান্টায় পরিবারের প্রতি কারও কুৎসিত মন্তব্যের কারণে আপনাকে যাতে রাস্তার উল্টোদিকে চলে যেতে না হয়, তা আমরা সুনিশ্চিত করব।’’ যা ‘নিখুঁত’ ভাবে করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্বকাপের আগেই আটলান্টায় বিশ্বকাপ-কেন্দ্রিক এক মাস্টার-প্ল্যান তৈরি করা হয়। যার পোশাকি নাম ছিল, ‘ডাউনটাউন রাইজিং’। উদ্দেশ্য–ফুটবল মহাযজ্ঞের আগে বাস্তুহীনদের আটলান্টা থেকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বার করা! পরে যদিও এই মাস্টার-প্ল্যানের পরিকল্পনা-বিশারদরা দাবি করেছিলেন, তাঁরা পাঁচশোজন বাস্তুহীনকে নতুন বাসস্থানের বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু স্বচক্ষে তার প্রমাণ কেউ পায়নি।
আর সেই বাস্তুহীন-বিদায়ের পদ্ধতিও ছিল প্রবল হৃদয়-বিদারক। চলতি বছরেরই জানুয়ারি মাসে ওল্ড হুইট স্ট্রিটে ঘুমোচ্ছিলেন কর্নলিয়স টেলর। কাউন্সিল কর্মীরা মাঝরাত্তিরে রাস্তা পরিষ্কারের উদ্দেশে এসে উপস্থিত হন। এবং ঘুমন্ত অবস্থাতেই টেলরকে পিষে দিয়ে চলে যান পাঁচ টনের বুলডোজার! টেলরের বাগদত্তা পরে তাঁর দেহাবশেষ খুঁজে পান। চাপ-চাপ রক্তের সঙ্গে যা রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। টেলরের সেই মর্মান্তিক মৃত্যু নড়িয়ে দিয়েছিল মার্কিন জনতাকে। নতুন নতুন সমস্ত ‘প্রোটোকল’ আসে তার পর। প্রায় তিন হাজার বাস্তুহীনকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অন্যত্র। তবে মনে করার কারণ নেই, দারুণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে রাখা হয়েছিল তাঁদের। ফ্রিডম পার্কের লাগোয়া রয়েছে ফুলটন কাউন্টির রিহ্যাব সেন্টার। বাস্তুহীনদের মধ্যে যাঁরা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত এবং নেশায় আসক্ত, তাঁদের সুস্থ করে তোলার প্রয়াস চালায় তারা। তা, সে রিহ্যাব সেন্টারেরই এক কর্মী বলছিলেন যে, ফুটবল বিশ্বকাপের সময় অস্বাভাবিক ভাবে বাস্তুহীনদের সরে যেতে দেখেছেন পথ-ঘাট-পার্ক থেকে। কিন্তু তিনি জানেন না, কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাঁদের। আটলান্টায় সরকারি কোনও পুনর্বাসন প্রকল্পের বন্দোবস্ত নেই। সাইরাস নামের এক বাস্তুহীন পড়েছিলেন কাউন্সিল কর্মীদের পাল্লায়। যাঁর কথা লেখা হয়েছে পূর্বে। যাঁকে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাঝরাতে। আটলান্টার ফিফা হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘‘ওরা আমাকে যেখানে নিয়ে গেল, পুলিশে-পুলিশে ছয়লাপ। বুঝলাম, পুরোটাই ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট ক্যাম্প। আমি পুরোটা দেখেই বেরিয়ে আসি। ওরা আমাদের তুলে শুনশান রাস্তায় নামিয়ে দিত। শহর থেকে যা অনেক দূরে।’’ ‘আমাদের লোকজনকে ওরা সব ধরে-ধরে বার করে দিয়েছে। আমরা থাকতাম যেখানে, সেখানে ওরা আর থাকতে দেয়নি। ওদের বোঝাব কী করে, আমাদের জীবনের মূল্য ডলারের চেয়ে বেশি। কিন্তু ওরা তো আমাদের মানুষ বলেই মনে করে না।’ ‘একদিন মাঝরাতে ওরা আমাকে একটা জায়গায় নামিয়ে দিল তুলে এনে। জায়গাটাকে ওরা বলে, মরমন সেন্টার। কিন্তু আদতে সেটা জেলখানা। পুলিশে-পুলিশে ছয়লাপ। আমি কোনওমতে পালিয়ে এসেছি সেই কালান্তক জায়গা থেকে। ফিরে এসেছি, আমার পুরনো এলাকায়। পুরোটাই ওরা করছে, বিশ্বকাপের জন্য। প্রশাসন চায়, বিদেশি ট্যুরিস্টদের কাছে দেশকে সুন্দর দেখাতে। প্রশাসন চায় না, বিদেশি অতিথিরা আমাদের দুর্দশা দেখুক।’ বক্তাদের কারও নাম ড্রেভন ক্লার্ক। কারও নাম সাইরাস। বক্তারা সবাই বাস্তুহীন। আমেরিকার বাস্তুহীন। বিশ্বকাপের নামে যাঁদের শেষ সহায়-সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন! দুনিয়া বলে, ফুটবল বিশ্বকাপের মতো জাঁকজমকপূর্ণ স্পোর্টস ইভেন্ট আর একটাও নেই। অলিম্পিকও না। কে জানত, সে ঠাঁটবাটের অতলে এমন অন্ধকার থাকবে? মানুষের রক্ত-হাহাকার-যন্ত্রণা নিয়ে লেখা সে কৃষ্ণ-কাহিনী, বুকফাটা আর্তনাদের মলাটে!




