RK NEWZ একুশের ভোটে বিজেপি নবান্ন দখল করতে না পারায়, তৎকালীন পুলিশমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে শুভেন্দুর সেই দুই বিশ্বস্ত রক্ষীকে রাতারাতি সরিয়ে দেওয়া হয়। শুধু সরানোই নয়, তাঁদের একজনকে বারবার সিআইডি দফতরে ডেকে জেরা করা হয় এবং পরে দূরবর্তী জেলা পুরুলিয়ায় ট্রান্সফার করে সাসপেন্ড পর্যন্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, রাজ্যে বিরোধী দলনেতা হয়ে সাংবিধানিক পদ পাওয়ার পরেও শুভেন্দু অধিকারীর পুরনো দুই পিএসও-কে তাঁর নিরাপত্তায় রাখার আবেদন তৎকালীন সরকার গ্রাহ্য করেনি। নবান্ন সূত্রের পাল্টা দাবি, অতীতে শুভেন্দুর বেলায় যে নিয়ম খাটানো হয়েছিল, আজ মমতার বেলাতেও সরকারি নিয়ম সেই পথেই হাঁটছে। স্বরূপ ও দ্বিবেদী ছাড়া অন্য কাউকে পিএসও হিসেবে মানবেন না, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এমন জেদ প্রশাসনিক নিয়মে খাপ খায় না। তবে ব্যক্তিগত পিএসও বদল হলেও তাঁর সামগ্রিক ‘জেড প্লাস’ নিরাপত্তায় যে কোনও ত্রুটি বা খামতি রাখা হচ্ছে না, তা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছে নবান্ন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অনড় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নবান্নের অলিন্দে এখন একটি পুরনো রাজনৈতিক আখ্যানের চর্চা শুরু হয়েছে। তৃণমূল জমানায় শুভেন্দু অধিকারী যখন রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী ছিলেন, তখন তাঁর স্থায়ী সঙ্গী হিসেবে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর র্যাঙ্কের দু’জন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী (PSO) ছিলেন। পরবর্তীকালে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দিলে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পেলেও, প্রথম তিন-চার মাস ওই দুই পুরনো রাজ্য পুলিশের কর্মী তাঁর সঙ্গেই ছিলেন।
নবান্ন সূত্রের দাবি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বায়না হল- স্বরূপ গোস্বামী ও কুসুম কুমার দ্বিবেদীকেই তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় রাখতে হবে, অন্য কোনও পুলিশকর্মীকে তাঁর পছন্দ নয়। কিন্তু নবান্নের শীর্ষ সূত্র বলছে, সরকারি ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অফিসার বদল হয়, সেখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে বায়না শোনার কোনও ব্যবস্থা প্রশাসনিক নিয়মে নেই। পুলিশ মহলের আরও একটি অভিযোগ, বুধবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে মিছিলটি করেছিলেন, তা আগে থেকে প্রশাসন বা পুলিশকে অফিশিয়ালি জানানোই হয়নি। তা সত্ত্বেও পুলিশ খবর পাওয়া মাত্রই তড়িঘড়ি তাঁর যাতায়াতের পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। নবান্নর শীর্ষ কর্তারা রাতে ‘দ্য ওয়াল’-কে স্পষ্ট জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার যে দাবি করা হচ্ছে, তা মোটেও সত্যি নয়। প্রশাসন সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রথম যেদিন নবান্নে পা রেখে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছিলেন, সেদিনই রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, “প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বয়স হয়েছে। তাঁর যেন কোনও অসুবিধা না হয় তা নিশ্চিত করবেন। তাঁর নিরাপত্তায় যেন কোনও রকমের ত্রুটি না থাকে।”
নবান্নের দাবি, শুভেন্দুর সেই নির্দেশ মেনেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যে ‘জেড প্লাস’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পাওয়ার যোগ্য, তা অক্ষরে অক্ষরে বজায় রাখা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির আশপাশে পর্যাপ্ত পুলিশি প্রহরাও রয়েছে। সমস্যা শুধু তৈরি হয়েছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিশেষ ‘বায়না’ ঘিরে, যা সরকারি নিয়ম মেনে মানা সম্ভব হয়নি। তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন ফেসবুক লাইভ করে দেখান যে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির গেটের সামনে কোনও নিরাপত্তারক্ষী নেই এবং যে কেউ চাইলে অনায়াসে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগ তোলা হয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী তথা অত্যন্ত বিশ্বস্ত দুই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী স্বরূপ গোস্বামী ও কুসুম কুমার দ্বিবেদীকেও আচমকা তুলে নিয়েছে পুলিশ। ডেরেকের এই লাইভ ভিডিও ভাইরাল হতেই রাজনৈতিক মহলে সন্দেহ তৈরি হয়, তবে কি সত্যিই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সব নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হল? শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরই রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা বলয়ে বড়সড় কাঁচি চালিয়েছে নবান্ন। অন্যতম ছিল, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বরাদ্দ বিশাল নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিশেষ পাইলট কারের সুবিধা কেড়ে নেওয়া। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাপারে সৌজন্য বজায় রেখেছিলেন শুভেন্দু। কলকাতা পুলিশকে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, হাজার হোক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবীণ এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর নিরাপত্তায় যেন কোনও ফাঁক না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ১৮৮এ, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার বাসভবন। রাজ্যে পালাবদলের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মমতার বাড়ি যাওয়ার গলির মুখে থাকা ‘সিজ়ারস ব্যারিকেড’ সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে লালবাজার থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের সামনে বাড়তি কোনও নিরাপত্তা থাকবে না। তবে এক জন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে প্রোটোকল অনুযায়ী যতটা নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, সেই পরিমাণ নিরাপত্তা পাবেন মমতা। সূত্রের খবর কলকাতার নগরপালকে সেটুকুই সুনিশ্চিত করতে বলেছিলেন শুভেন্দু।





