RK NEWZ স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের। ভেঙে চুরমার তৃণমূল। তাও আবার কিনা যখন খোদ সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন দিল্লিতে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, দিনের শেষে ফের একপ্রস্থ বৈঠকে বিদ্রোহী বিধায়করা। এবার বীরভূমের চারবারের সাংসদ শতাব্দী রায়ের দিল্লির বাসভবনে। যেখানে উপস্থিত রয়েছেন খোদ শুভেন্দু অধিকারী। আর এই বৈঠক ঘিরেই দানা বাধছে নানা জল্পনা। এবার লোকসভার কায়দায় রাজ্যসভাতেও ‘অপারেশন লোটাস।’ বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির ঠিক এক মাসের মাথায়, গত ৩ জুন আনুষ্ঠানিক ভাঙনের পালা শুরু হয়েছিল তৃণমূলে। সোমবার সেই ফাটল আরও চওড়া হল। লোকসভার ২৮ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে ২০ জনই মমতাকে ছেড়ে যোগ দিলেন বিদ্রোহী শিবিরে। বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে রয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। বিদ্রোহীরা সোমবার চিঠিও পাঠিয়েছেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে। এর পাশাপাশি, সোমবার ইস্তফা দিয়েছেন রাজ্যসভার দুই সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় এবং কোয়েল মল্লিক। আরও কয়েক জন সেই তালিকায় শামিল হতে পারেন বলে জল্পনা রয়েছে। পরিষদীয় এবং সংসদীয় দলে ভাঙনের এই ধারা প্রত্যক্ষ ছাপ ফেলবে তৃণমূলের সংগঠনে। এর পরের ধাপে দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতছাড়া হবে বলেই মনে করছেন তাঁরা। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে তৃণমূল গড়েছিলেন মমতা। ঘটনাচক্রে ‘দল’ যখন তাঁকে ছেড়ে যাচ্ছে, সোমবার দুপুরে ঠিক তখনই দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে ছিলেন তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা-নেত্রী। ভারতীয় রাজনীতির অতীত এবং হালফিলের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধির বিদ্রোহে দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার একাধিক উদাহরণ রয়েছে। এমনকি, ১৯৭৭ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের বিপর্যয়ের জেরে ১৯৭৮ সালে দলে ভাঙন ধরেছিল। লোকসভায় ১৫৩ জন সাংসদের মধ্যে ৭৬ জনের সমর্থন হারানোর পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দলের ‘গাই-বাছুর’ প্রতীক হারাতে হয়েছিল। দেবরাজ আর্স, কে ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি, ওয়াইবি চহ্বাণ, দেবকান্ত বড়ুয়াদের ‘বিদ্রোহের’ জেরে দলের নাম ও প্রতীক ‘ফ্রিজ’ হওয়ায় সেই সময় ‘হাত’ চিহ্ন নিয়ে কংগ্রেস (আই) গড়েছিলেন ইন্দিরা। দক্ষিণের রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশে ১৯৯৫ সালে তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি)-র সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিদ্রোহ করে শ্বশুর এনটি রামা রাওকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রিত্ব দখল করেছিলেন চন্দ্রবাবু নায়ডু। পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকেই নির্বাচন কমিশন দলের নাম এবং দলের প্রতীকচিহ্ন দিয়েছিল। ২০২২ এবং ২০২৩ সালে মহারাষ্ট্র রাজনীতিও দল বেহাত হওয়ার ঘটনাপর্বে সাক্ষী। প্রথম ক্ষেত্রে, শিবসেনার সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক তৎকালীন নমুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের সঙ্গ ছেড়ে বিদ্রোহী নেতা একনাথ শিন্দের পাশে দাঁড়ানোয় সরকারের পতন ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে ভাঙন ধরে শিবসেনার পরিষদীয় দলেও। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ‘শিবসেনা’ নাম এবং ‘তির-ধনুক’ও হাতছাড়া হয়েছিল শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত বালাসাহেব ঠাকরের পুত্র উদ্ধবের। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, ‘এনসিপি’ নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক ‘ঘড়ি’ হারান দলের দলের প্রতিষ্ঠাতা শরদ পওয়ার স্বয়ং! কমিশনের নির্দেশে বিদ্রোহী ভাইপো অজিত পওয়ারের গোষ্ঠীই ‘আসল এনসিপি’ হিসাবে স্বীকৃতি পায়। বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েই শিন্দে এবং অজিত দু’জনেই দল দখল করছিলেন। ঘটনাচক্রে, সোমবার বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতেই বিদ্রোহী সাংসদদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক বসেছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সোমবার সকালে দিল্লিতে গিয়েছেন। দুপুরে ভূপেন্দ্রর বাড়িতে যান। লোকসভার স্পিকারকে তৃণমূলের বিদ্রোহীদের এই চিঠি পাঠানোর কথা প্রকাশ্যে আসার আগে বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে যান বিদ্রোহী সাংসদেরা। সূত্রের খবর, সেখানে কাকলি, শতাব্দীর পাশাপাশি ছিলেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত মাল, বাপি হালদার, জুন মালিয়া, জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া, কালীপদ সোরেন, অরূপ চক্রবর্তী, পার্থ ভৌমিক, শর্মিলা সরকারেরা। বিদ্রোহীদের তালিকায় ইউসূফ পাঠান, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবের নামও ভেসে আসছে। ঘটনাচক্রে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও সোমবার সকালে দিল্লিতে গিয়েছেন। দুপুরে ভূপেন্দ্রর বাড়িতে যান তিনিও। দুপুরের ওই বৈঠকের পরে সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে শতাব্দীর বাড়িতে ফের একবার বৈঠকে বসেন বিদ্রোহীরা। সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রীও গিয়েছেন সেখানে।

ক্রমেই বিক্ষুব্ধ তৃণমূল বিধায়কদের সংখ্যা বাড়ছে। ‘আসল তৃণমূলে’র সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। রাজ্যে বিরোধী দলনেতা ঘোষিত হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মুহূর্তে ঋতব্রতদের শিবিরে রয়েছেন ৫৮ জন বিধায়ক। সেই সংখ্যা আগামী দিনে ৬২ হতে পারে! এমন কথাও বিধানসভার অন্দরে শোনা যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই আরও ২ বিধায়ক বাড়তে পারে। সেই কথাও শোনা গিয়েছে এদিন। তাঁরা আপাতত সমর্থন জানাবেন। বিধানসভার স্পিকারকে সেই সমর্থনের কথা জানানো হবে। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “মাননীয় স্পিকার এখন নেই। আমাদের সংখ্যা অনেক। ববিদার সঙ্গে বহু দিনের আলাপ। তিনি কলকাতার প্রাক্তন মহানাগরিক। আমাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হয়েছে, ববিদা যখনই বিধানসভায় আসুক, আমাদের সঙ্গে যেন ববিদার কথোপকথন হতে পারে। এর বেশি কিছু বলছি না” তিনি আরও বলেন, “শামিম আহমেদ এসেছিলেন, কোনও স্বাক্ষর হয়নি। স্পিকার আসলে যারা চিঠি দিতে চান, পরে আলোচনা করে ঠিক হবে। কাল অনেক নেতৃত্ব থাকবেন। বসে আলোচনা করব।” সোমবার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হামিক গিয়েছিলেন। সেখানে একটি বৈঠক হয়। জানা গিয়েছে, ওই বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ মগরাহাট পশ্চিমের বিধায়ক শামিম আহমেদও ছিলেন। এই নিয়ে তৃণমূলের অন্দরেই জোর চর্চা চলছে। এদিন ঋতব্রত বলেন, “সংখ্যা আগের থেকে বেশি। আজকে কোনও স্বাক্ষর হয়নি, যা হবে সরাসরি মাননীয় স্পিকারের কাছে ব্যক্তিগত চিঠি দিয়ে করতে হবে।” ফিরহাদ হামিকের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, “ববিদার সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। কেউ যদি দেখা করতে আসেন, তার মানে কি যোগ দিতে আসছে? ববিদার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।” তবে তাঁর কথাতেই তিনি জল্পনা জিইয়ে রাখলেন, এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। রাজ্যের বিধায়কদের মতোই একইভাবে তৃণমূলের সাংসদরা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। পরিষদীয় দলের পর এবার তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলেও ভাঙন। জল্পনা সত্যি করে এবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে চিঠি জমা দিলেন ‘বিদ্রোহী’ সাংসদরা। সূত্রের খবর, আপাতত ২৮ জনের মধ্যে ২০ জন সাংসদের সই করা চিঠি জমা পড়েছে। সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে চিঠি জমা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এবার বিধানসভার পর লোকসভার রাশও ‘আসল তৃণমূলে’র হাতে। শোনা যাচ্ছে, ‘বিদ্রোহী’ সাংসদের সংখ্যাটা বেড়ে ২১ হতে পারে। সেই বিষয়ে ঋতব্রত বলেন, “আমার সঙ্গে কারও কোনও আলোচনা হয়নি। গতকাল বেশ কয়েকজন এমপির কথা হয়েছিল। অনেকে দিল্লিতে আরও কয়েকদিন থাকবেন। সংবাদমাধ্যমে দেখেছি লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি জমা পড়েছে। ওখানে যারা আছেন, তাঁদের সঙ্গে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা আছে।” তৃণমূলের প্রবীন বিধায়ক অশোক দেবও তৃণমূলের নতুন কমিটি নিয়ে ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন। ভোটে না জিতলেও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে রাজ্য সভাপতি করা হয়েছে। সেই বিষয়ে ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন তিনি। নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাতেও তিনি মনক্ষুন্ন! এমনও শোনা গিয়েছে। অশোক দেবের কথায়, “যিনি জিততে পারেননি, সেই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে রাজ্য সভাপতি! দল চালাবে কী করে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো কারও সঙ্গে কথা বলে কিছু ঠিক করেন না। উনি একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন!”





