সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার ঘটনায় প্রশ্ন তুললেন কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী। রাজ্যে লাগাতার চলতে থাকা রাজনৈতিক হিংসার নিন্দা করার পাশাপাশি এই ঘটনায় শাসকদলের অন্দরের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলতে ছাড়েননি। ‘রাজনৈতিক সন্ত্রাস দেখতে আমরা অভ্যস্ত’। নজিরবিহীন হেনস্থার ঘটনা প্রসঙ্গে অধীর স্পষ্ট জানান, বাংলায় এই ধরণের হিংসা নতুন কিছু নয়। তাঁর কথায়, “আমরা বাংলার মানুষ, এখানে রাজনৈতিক সন্ত্রাস দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। তবে আমরা চাই বাংলায় এবার একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হোক।” একই সঙ্গে একজন জনপ্রতিনিধির ওপর এই ধরণের শারীরিক আক্রমণের তীব্র সমালোচনা করে অধীররঞ্জন চৌধুরী বলেন, “একজন সাংসদকে মারধর করার মধ্যে কোনও বাহাদুরি নেই।”হামলার নিন্দা করলেও এই ঘটনার আবহে তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্ব ও কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন এই কংগ্রেস নেতা। দলের শীর্ষ নেতার বিপদে কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা বা অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করে অধীরবাবু প্রশ্ন তোলেন, “যে নেতা ৭ লক্ষ ভোটের রেকর্ড ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন, বিপদের দিনে তাঁর নিজের এলাকায় দলের কোনও নেতা বা কর্মী তাঁকে বাঁচাতে কেন এগিয়ে এলেন না?” সোনারপুরে ভোটপরবর্তী হিংসায় নিহত এক তৃণমূলকর্মীর বাড়িতে গিয়েছিলেন অভিষেক। এলাকায় পৌঁছোতেই জনরোষের কবলে পড়েন তিনি। তাঁকে লক্ষ্য করে জুতো এবং ডিম ছোড়া হয়। পাথরও ছোড়েন কেউ কেউ। সঙ্গে চলে ‘চোর চোর’ স্লোগান। আঘাত থেকে বাঁচতে অভিষেক মাথায় হেলমেট পরে নিয়েছিলেন। তার পরেও ধস্তাধস্তিতে তাঁর জামা ছিঁড়ে যায়। নিহত তৃণমূলকর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দীর্ঘ ক্ষণ সেখানেই বসেছিলেন অভিষেক। বিকেলে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দাবি, হামলা বিজেপির পরিকল্পিত। আগে থেকেই অভিষেকের সফরের কথা জেনে তাঁরা তৈরি ছিলেন। আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অভিষেক। ঘটনার সময়কার ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা বিশ্লেষণ করে এখনও অবধি ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছে প্রশাসন।
অভিষেকের ওপর হামলা নিয়ে বিস্ফোরক শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করেছেন যে সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই। সুস্থ সমাজে এই হিংসা কাম্য নয় বলেও জানান তিনি। শমীকের দাবি, এটি সম্পূর্ণ তৃণমূলের অন্দরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। যারা এতদিন দলে থেকে ‘অভুক্ত’ ও বঞ্চিত ছিলেন, আজ তাঁরাই দলের নেতাদের ওপর আক্রমণ করছেন। ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত দলীয় কর্মীর বাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও হামলার মুখে পড়েন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন রাজ্য থেকে দিল্লি, তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি, ঠিক তখনই এই হামলা প্রসঙ্গে মুখ খুলল বঙ্গ বিজেপি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক নেই। এটি আদতে তৃণমূলের অন্দরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং ‘তৃণমূল বনাম তৃণমূলের’ লড়াই। সোনারপুরের ঘটনা প্রসঙ্গে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “যা ঘটেছে তা কোনও সভ্য, সুস্থ সমাজে কাম্য নয়। আমরা যেকোনও ধরণের হিংসার বিরোধিতা করি। কাল যা হয়েছে, তা হওয়া উচিত ছিল না। তবে এটার সঙ্গে বিজেপি কোনওভাবে যুক্ত নয়। এটা সম্পূর্ণ তৃণমূলের সঙ্গে তৃণমূলের গণ্ডগোল।” তৃণমূলকে তীব্র কটাক্ষ করে বিজেপি সভাপতি আরও যোগ করেন, “তৃণমূল আদপেই কোনও রাজনৈতিক দল নয়। আমি গত ৬ মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে বলে এসেছি যে, তৃণমূল কংগ্রেস চলে যাচ্ছে। আর তৃণমূল চলে যাওয়ার পর ওরা নিজেরাই নিজেদের আক্রমণ করবে। যারা এতদিন দলে থেকে অভুক্ত ছিলেন, বঞ্চিত ছিলেন, আজ তাঁদের দীর্ঘদিনের অবদমিত ক্ষোভ এবং না পাওয়ার ব্যথাই এই আক্রমণের রূপ নিয়েছে। সেখানে প্রশাসন কী করবে?” শাসকদলের ওপর আমজনতার ক্ষোভের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শমীক দাবি করেন, পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হতে পারত। তাঁর কথায়, “রাজ্যপাল এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম যে, মানুষের যা ক্ষোভ, তাতে তৃণমূলের বেশ কিছু বিধায়ক এবং মন্ত্রী ‘লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনির শিকার হতে পারেন। আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম বলেই আজ পরিস্থিতি সেই জায়গায় পৌঁছাতে দিইনি।” পাশাপাশি, পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে শমীক জানান, আইন অনুযায়ী পুলিশের যা ব্যবস্থা নেওয়ার তা নেওয়া উচিত। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় পুলিশ ৬ জনকে গ্রেফতারও করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বিগত নির্বাচনগুলির রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি তিনি। তৃণমূলের দিকে আঙুল তুলে বিজেপি রাজ্য সভাপতি বলেন, “২০১৬ সালের আগে থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের ৩২১ জন বিজেপি কর্মী খুন হয়েছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলের পর, মাত্র ২৭ দিনে ৫৬ জন বিজেপি কর্মীকে খুন করা হয়েছিল। আমাদের কয়েকশো মহিলা কর্মী গণধর্ষিতা হন, জেসিবি দিয়ে বাড়ি ভাঙা হয়। সেই তুলনায় তৃণমূল তো এখন স্বচ্ছন্দে আছে।” দলের রাজ্য সভাপতি এদিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কোনও বিজেপি কর্মী যদি এই ধরনের বিশৃঙ্খলায় জড়ান, তবে দল তা বরদাস্ত করবে না। সেই সঙ্গে দলে যোগ দিতে চাওয়া তৃণমূলী নেতাদেরও কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। শমীক বলেন, “দলের তরফে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া আছে, তৃণমূলি দলবদলুদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখবেন না। মাথায় টুপি পরে তিনজন বাইকে ঘুরবে আর পুলিশ ধরবে না— তেমনটা যেমন হবে না, তেমনই মাথায় গেরুয়া কাপড় বেঁধে হনুমানজির পতাকা নিয়ে হেলমেট ছাড়া বাইক চালানোও চলবে না।” একই সঙ্গে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দরাজ প্রশংসা শোনা যায় শমীকের গলায়। তিনি বলেন, “শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসক। তিনি এর মধ্যেই বেশ কিছু দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকারের এখনও অনেক কাজ করা বাকি আছে।” সোনারপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে যখন রাজ্য-রাজনীতি উত্তপ্ত, তখন বিজেপির এই ‘তৃণমূলের অন্দরের লড়াই’ তত্ত্ব বিরোধী দলকে আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।





