RK NEWZ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গেই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় অনুমোদন দিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। এই রাজ্যের কোন কোন মহিলা পাবেন সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রকল্পের সুবিধা? কী ভাবে করতে হবে আবেদন? আর মাত্র এক সপ্তাহ। তার পরই নারী সমাজের আর্থিক উন্নতিতে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ প্রকল্প চালু করবে বিজেপিশাসিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এতে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে পাবেন রাজ্যের মহিলাদের একাংশ। সরাসরি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে সেই টাকা। এ-হেন ‘অন্নপূর্ণ যোজনা’য় কারা করতে পারবেন আবেদন? লাগবে কী কী নথি? চলতি বছরের ১৮ মে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন পশ্চিমবাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানেই অনুমোদন পায় ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। ওই দিনই এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন রাজ্যের নারী ও শিশু কল্যাণ দফতরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ১৯ মে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি নিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে অর্থ দফতর। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ১ জুন থেকে চালু হবে ‘অন্নপূর্ণ যোজনা’ পোর্টাল। সেখানে লগ ইন করে পশ্চিমবঙ্গের মহিলারা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির জন্য আবেদন করতে পারবেন। গ্রামাঞ্চলের ক্ষেত্রে তাঁদের আবেদনপত্র যাচাই করবেন ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক বা বিডিও। শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মহকুমাশাসক বা এসডিওকে। আবেদন পরীক্ষার কাজ শেষ হলে তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন জেলাশাসক বা ডিএম। কলকাতাবাসীদের ক্ষেত্রে নিয়ম আবার কিছুটা আলাদা। সেখানে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র প্রতিটি আবেদন খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবেন পুর আধিকারিক। তাঁদের যাচাইয়ের উপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুর কমিশনারকে। সব শেষে অনুমোদিত আবেদনগুলি পোর্টালে আপলোড করা হবে। তার পরে মহিলা গ্রাহকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে টাকা। অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রাজ্যের যে কোনও মহিলা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় আর্থিক সুবিধা পাবেন, এমনটা নয়। আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে। কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার এবং কোনও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার স্থায়ী চাকরিজীবী বা পেনশনভোগীরা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন না। পাশাপাশি, রাজ্য সরকার অনুমোদিত শিক্ষক, অশিক্ষক, পুর ও পঞ্চায়েত কর্মীদের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতার বাইরে রেখেছে শুভেন্দু প্রশাসন। এ রাজ্যের আয়করদাতা কোনও মহিলা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় আবেদন করতে পারবেন না। এত দিন যাঁরা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ পেয়ে এসেছেন, তাঁদের নাম নতুন প্রকল্পে সংযুক্ত করবে প্রশাসন। উল্লেখ্য, এ বছরের বিধানসভা ভোটের মুখে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। সেখানে বাদ যায় বহু ভোটারের নাম। তাঁদের একাংশও নতুন প্রকল্পটিতে আবেদন করতে পারবেন না বলে অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় মৃত, পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া, ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়া ভোটারদের নাম বাদ দেয় জাতীয় নির্বাচন কমিশন। ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এদের কেউ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির সুবিধা পাবেন না। তবে নাম বাদ যাওয়া নির্বাচকমণ্ডলীর একাংশ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় এসআইআরের ট্রাইবুনালে আবেদন করছেন। সেই আর্জির ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত নতুন আর্থিক প্রকল্পটির সুবিধা পাবেন তাঁরা। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে জিতে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ নামের একটি প্রকল্প চালু করেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এতে গোড়ার দিকে মাসে মাসে ৫০০ টাকা করে পেতেন এ রাজ্যের মহিলারা। পরে ধাপে ধাপে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে ঘাসফুল শিবির পরিচালিত রাজ্য সরকার। শেষ বাজেটে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর টাকার পরিমাণ ১,৫০০ করেন মমতা। তফসিলি জাতি এবং অন্যান্য জনজাতির মহিলারা পেতেন মাসে ১,৭০০ টাকা। তৃণমূল আমলে প্রবল জনপ্রিয়তা পায় ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’। ফলে এ বছরের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার অস্ত্রেই তাঁকে হারানোর কৌশল নেয় পদ্মশিবির। ভোটের সঙ্কল্পপত্রে বিজেপি ঘোষণা করে, মহিলাদের স্বাবলম্বী করতে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেবে তারা। আর তাই শুভেন্দু অধিকারীরা ক্ষমতা দখলের পর স্বাভাবিক ভাবেই ওঠে একটা প্রশ্ন। এত দিন যাঁরা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ পেয়েছেন, এ বার কি তাঁরা বঞ্চিত হবেন সেই সুবিধা থেকে? তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র অনুমোদন দিতেই এ ব্যাপারে বিবৃতি দেন রাজ্যের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা। তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছেন তাঁদের নাম নতুন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’’ তবে তার জন্য মহিলা গ্রাহকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার নম্বরকে সংযুক্ত করতে বলেছে অর্থ দফতর। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন না হলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা না-ও ঢুকতে পারে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। আর তাই অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তি জারি হতেই আধার নম্বর সংযুক্ত করতে রাজ্যের বিভিন্ন ব্যাঙ্কের শাখায় দেখা গিয়েছে লম্বা লাইন। গ্রাহকদের অনেকেরই বক্তব্য, ‘‘অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আধার ও ভোটার কার্ডের মতো নথি জমা করেছি। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের আর্থিক সুবিধা পেতে হলে ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ বা ডিবিটি লিঙ্ক করতে হবে। এই বিষয়টি সকলের জানা নেই। আর তাই ব্যাঙ্কগুলির শাখায় লম্বা লাইন পড়ছে।’’এর জন্য প্রথমে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার নম্বরকে সংযুক্ত করতে হবে। গ্রাহক অবশ্য সেটা ঘরে বসে নেটব্যাঙ্কিং বা ব্যাঙ্কের মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও করতে পারেন। আবার ইচ্ছা করলে ব্যাঙ্কের শাখায় গিয়ে এই কাজ অফলাইনে করা যেতে পারে। অফলাইনে ব্যাঙ্কের দেওয়া ফর্ম গ্রাহককে পূরণ করতে হবে। জমা করতে হবে আধার কার্ডের স্ব-প্রত্যয়িত অনুলিপি। নেটব্যাঙ্কিং বা মোবাইল অ্যাপে অবশ্য এই ঝামেলা নেই। সেখানে লগ ইন করলেই ‘আধার লিঙ্কিং’-এর বিকল্পটি দেখতে পাবেন গ্রাহক। এর পর ওই বিকল্পে ঢুকে ১২ সংখ্যার আধার নম্বরটি লিখতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে নথিভুক্ত মোবাইল ফোনে আসবে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপি। সেটা দিলে সম্পূর্ণ হবে আধার সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়া। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মহিলা গ্রাহকদের একাংশের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার সংযুক্তি রয়েছে। আর তাই ব্যাঙ্কের শাখায় যাওয়ার আগে এক বার ‘মাইআধার’ পোর্টালটিকে ভাল করে পরীক্ষা করতে বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। সেখানে আধার নম্বর এবং ওটিপি ব্যবহার করে লগ ইন করতে হবে তাঁদের। এর পর সিডিং স্ট্যাটাস বিভাগটি পরীক্ষা করলেই সংযুক্তিকরণ রয়েছে কি না, তা জানতে পারবেন তিনি। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর গ্রাহকদের আরও একটি সমস্যার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। একটি উদাহরণের সাহায্যে সেটা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, কোনও মহিলা এত দিন ‘পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক’ বা পিএনবিতে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর টাকা পাচ্ছিলেন। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টটিতে কোনও আধার সংযুক্তি নেই। উক্ত গ্রাহকের আরও একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা এসবিআইতে। সেই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে আধার নম্বর। এই পরিস্থিতিতে প্রথম অ্যাকাউন্টটিতে অবশ্যই আধার সংযুক্ত করতে হবে। এ বছরের বিধানসভা ভোটের প্রচারে বার বার ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পাশাপাশি, মহিলা ভোটব্যাঙ্ক টানতে মহিলারা নিখরচায় সরকারি বাসে চড়তে পারবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তাঁরা। কুর্সিতে বসে সেই প্রতিশ্রুতিও পূরণ করছেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ফলে ১ জুন থেকে বিনামূল্যে সরকারি বাসে চড়তে পারবেন এ রাজ্যের মহিলারা।

কীভাবে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের তিন হাজার টাকা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে মহিলাদের মনে প্রশ্নের অন্ত নেই। সরকারের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল, নতুন করে আবেদন, পুরনোদের স্টেটাস দেখার জন্য চালু করা হবে পোর্টাল। কথা রাখল সরকার। চালু হয়ে গেল অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের জন্য পোর্টাল। তবে রাজ্যবাসী সেখানে নাম নথিভুক্ত করতে গিয়ে বেশ কিছু সমস্যায় পড়ছেন বলেই খবর। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করে দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকেই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে সিলমোহর দিয়েছে বিজেপি সরকার। জানানো হয়েছে, আগামী ১ জুন থেকে নথিভুক্তদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে ৩ হাজার টাকা। পোর্টাল চালু করা হবে বলেও জানিয়েছিলেন নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল। ইতিমধ্যেই চালু হয়ে গেল সেই পোর্টাল। নতুন করে আবেদন ও নিজের আবেদনের স্টেটাস দেখতে যেতে হবে https://socialsecurity.wb.gov.in/login – এই ওয়েবসাইটে। ঢুকলেই দেখা যাবে বাঁদিকে লেখা, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা পোর্টাল’। ডানদিকে রয়েছে মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দেওয়ার জায়গা। তবে এখনও সেখানে নতুন করে রেজিস্ট্রারের কোনও অপশন মিলছে না। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পান, তাঁরাও মোবাইল নম্বর দিয়ে লগ ইন করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন। নির্দিষ্ট জায়গায় মোবাইল নম্বর দেওয়া হলেও দেখাচ্ছে ইনভ্যালিড। মনে করা হচ্ছে, এই মুহূর্তে পোর্টালটিতে কোনও যান্ত্রিক সমস্যা চলছে। দ্রুতই তা মিটে যাবে। তারপর মোবাইল নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে নথিভুক্তরা তাঁদের তথ্য যাচাই করে নিতে পারবেন। যারা নতুন করে আবেদন করতে চান, তাঁরাও সেই সুযোগ পাবেন।





