RK NEWZ রাজ্যে দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রচারপর্বে গত ২৬ এপ্রিল ফলতায় গিয়েছিলেন অভিষেক। কিন্তু তাঁরই লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারের অন্তর্গত ওই বিধানসভায় পুনর্নির্বাচনের প্রচারে অনুপস্থিত। ফলতা বিধানসভার পুনর্নির্বাচনের প্রচারে অভিষেকের অনুপস্থিতিতে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা হতাশ। প্রার্থী জাহাঙ্গির কার্যত ঘরবন্দি এই পরিস্থিতিতে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এলাকা না-মাড়ানোয় হতাশ দলের এক স্থানীয় নেতা বলেন, “উনি ছিলেন দলের সেনাপতি। বিধানসভা ভোটে রাজ্য জুড়ে দলের বিপর্যয় ঘটেছে। এই সময় অভিষেক যদি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব না দিয়ে অন্তরালে চলে যান, তবে আমরা তো আরও হতোদ্যম হয়ে পড়ব।” পরিসংখ্যান বলছে, দু’বছর আগে লোকসভা ভোটের সময় ফলতা বিধানসভা এলাকায় ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৩৭২ ভোটে এগিয়ে ছিলেন তিনি। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে ৭ লক্ষ ১০ হাজার ৯৩০ ভোটে জিতে রেকর্ড গড়া তৃণমূল প্রার্থী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফলতা থেকেই সর্বাধিক লিড পেয়েছিলেন। কিন্তু এ বার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সেই ‘নিরাপদ’ আসনেই পুনর্নির্বাচনের প্রচারে তাঁর অনুপস্থিতি ঘিরে উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন! প্রশ্নের মুখে পড়েছে তাঁর বহুচর্চিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ও। ঘটনাচক্রে মঙ্গলবারই ফলতায় পুনর্নির্বাচনের প্রচার শেষ হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ। রবিবার গণনা। তৃণমূল সূত্রের খবর, মঙ্গলবার মমতার কালীঘাটের বাড়িতে তৃণমূলের বিধায়কদের বৈঠক রয়েছে। সেখানে হাজির থাকবেন অভিষেক। ফলতায় ভোটপ্রচারে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই তাঁর। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই তৃণমূল নেতাদের একাংশ আড়ালে-আবডালে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। নিজের লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ফলতার পুনর্নির্বাচনের প্রচারে ‘তৃণমূলের সেনাপতি’র অনুপস্থিতির কারণ হিসাবে মূলত একটি কারণ উঠে আসছে— ‘জ়েড প্লাস’ নিরাপত্তা প্রত্যাহার এবং বিশেষ পাইলট সুবিধাও হারানোর ফলে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের হাতে ঘেরাও বা শারীরিক হেনস্থার আশঙ্কা! রাজ্যে দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রচারপর্বে গত ২৬ এপ্রিল ফলতায় গিয়েছিলেন অভিষেক। ২৯ এপ্রিল, বুধবার রাজ্যের ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। সে দিনই ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার অন্তর্গত ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ২৮৫টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। কিন্তু ভোটের দিন ওই বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা অভিযোগ ওঠে। ওই কেন্দ্রের বিভিন্ন বুথে পুনর্নির্বাচনের দাবিও তোলা হয়। পরে কমিশন জানায়, গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রেই আবার নতুন করে নির্বাচন হবে।
পুনর্নির্বাচনের ঘোষণার পরেই বিজেপি অভিষেকের ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ নিয়ে খোঁচা দিয়েছিল। বিজেপি নেতা অমিত মালবীয় এক্স পোস্টে লেখেন, ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল চুরমার’। সেই পোস্টের জবাব দেন অভিষেক। এক্স পোস্টে পাল্টা লিখেছিলেন, ‘আপনাদের বাংলা বিরোধী গুজরাতি গ্যাং এবং তাদের দালাল জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষে আমার ডায়মন্ড হারবার মডেলে কালি ছেটানো সম্ভব নয়।’ অভিষেক আরও লেখেন, ‘আপনাদের যা কিছু আছে, সব নিয়ে চলে আসুন। আপনাদের সবচেয়ে শক্তিধরকে পাঠান, দিল্লি থেকে কোন এক গডফাদারকে পাঠান। যদি ক্ষমতা থাকে ফলতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন।’ পরিস্থিতি বলছে গত ৪ মের পরে গোটা রাজ্যের মতোই ফলতার পরিস্থিতিও বদলে গিয়েছে। একদা ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ জাহাঙ্গিরকে এখন গ্রেফতারি এড়াতে হাই কোর্টের রক্ষাকবচের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ দ্বিতীয় দফার ভোটপর্বের আগে ভোটে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা ‘বনাম’ তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরের ঠান্ডা লড়াই প্রত্যক্ষ করেছে রাজ্য। এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট অজয়পাল উত্তরপ্রদেশের আইপিএস। পুলিশকর্তা হিসাবে ভাবমূর্তির জন্য বড়পর্দার চরিত্র ‘সিংহম’-এর সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হয় আদিত্যনাথের রাজ্যে। সেই অজয়পালের উদ্দেশে জাহাঙ্গির বলেছিলেন, ‘‘উনি সিংহম হলেও আমিও পুষ্পা… ঝুঁকেগা নহি।’’ আর এখন? রবিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘‘ভোট শেষ হোক। ওর ব্যবস্থা করব। সেই দায়িত্ব আমার।’’২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ফলতায় ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটে জিতেছিলেন তৃণমূল প্রার্থী। কিন্তু পুনর্নির্বাচন-পর্বের প্রচারে সেই ‘দুর্গে’ কার্যত অনুপস্থিত থেকে গেল অভিষেকের দল!গত শনিবার ফলতার বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডার হয়ে প্রচারে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুভেন্দু নাম না-করে ‘ভাইপোবাবু’ বলে নিশানা করেছেন অভিষেককে। আর ‘অভিষেক-ঘনিষ্ঠ’ হিসাবে পরিচিত ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানকে নিশানা করে বলেছেন, ‘‘ওই ডাকাতটা কোথায়, পুষ্পা না কী যেন নাম। যত অভিযোগ করেছে সাধারণ নির্বাচনের সময়, সবগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে। গুন্ডামি করতে দেব না। নিশ্চিন্ত থাকুন। সাদা থান বাড়িতে ফেলতে দেখব না। কোথায় পুষ্পা, কোথায় আপনি? দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। ২০২১ সালে ভোট-পরবর্তী হিংসায় ১৯ জনকে নটোরিয়াস ক্রিমিনাল ঘোষণা করেছিল মানবাধিকার কমিশন। তার মধ্যে ভাইপোর জাহাঙ্গির ছিল। ওর ব্যবস্থা করব। আমার উপর ছেড়ে দিন সেই দায়িত্ব।’’ অভিষেকের উদ্দেশে কটাক্ষ ছুড়ে শমীক বলেছেন, ‘‘পুলিশ নেই, তাই নেতা নেই। কনভয় নেই, তাই হুঙ্কার নেই! আমরা তো বলছি, আপনি আসুন ফলতায়। প্রচার করুন। আমাদের কর্মীরা, জেলা সভাপতি ফুল নিয়ে শাঁখ বাজিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবেন।’’ ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘আপনি আসুন, হে বীর তোমার আসন পূর্ণ করো। তোমাকে আমরা মিস্ করছি। ভীষণ… তুমি এসো।’’ এমনকি, ফলতার পুনর্নির্বাচনের প্রচারে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।





