অয়ন প্রামাণিক
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, রিদ্ম এন্ড হারমোনি
সুর ঝংকারের উন্মত্ত পরিবেশে রঙীন সুবর্ণ সন্ধ্যার মাধুরি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল অপরূপ মহিমান্বিত হয়ে। স্বর্ণালী সন্ধ্যায় নাচের তালে তালে মেতে উঠেছিল অডিটোরিয়াম। রিদ্ম এন্ড হারমোনি আয়োজিত নৃত্যানুষ্ঠানের সন্ধ্যা। কর্মব্যস্ততার প্রবল পরাক্রম থেকে মুক্ত হয়ে শণিবারের বারবেলার স্পন্দিত জীবন। উচ্ছ্বল সেই আনন্দধারা বহিছে ভুবনের গতিময়তাকে উদ্যাপন করতেই আনন্দঘন ‘রিদ্ম এন্ড হারমোনি’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো নাচের ছন্দে জমকালো অনুষ্ঠান। প্রথম আসর। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অয়ন প্রামানিক এবং শিক্ষিকা রিমা রায়ের উদ্বোধনী নৃত্যের মাধ্যমে। উদ্বোধনের পরেই একে একে মঞ্চে প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রছাত্রীদের পারফরমেন্স। পরিবেশনায় ফুটে ওঠে বিভিন্ন ধারার নৃত্য। শাস্ত্রীয়, আধুনিক, কনটেম্পোরারি ও ফিউশন। প্রতিটি পরিবেশনায় ছিল বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার ছাপ, যা দর্শকদের এক মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত হতে দেয়নি। অনেক নৃত্য পরিবেশনার পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করেন কোরিওগ্রাফার অর্ণব দে, যার কোরিওগ্রাফি অনুষ্ঠানের বিভিন্ন অংশকে দিয়েছে এক বিশেষ মাত্রা ও আকর্ষণ। নৃত্যের পাশাপাশি আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনাও ছিল এই অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। আবৃত্তিকারদের কণ্ঠে কবিতার আবেগ ও গভীরতা দর্শকদের মনে দাগ কাটে, আর নাট্যাংশগুলো জীবনের নানা দিককে তুলে ধরে এক বাস্তবসম্মত ও হৃদয়স্পর্শী উপস্থাপনায়। প্রতিটি শিল্পী তাদের নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে মঞ্চকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। কলকাতার আইসিসিআর অডিটোরিয়ামে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিনোদন ছাড়ানো নাচের জগতের সেরা খুদে শিল্পীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

প্রথম আয়োজনের প্রতি সবারই গভীর আগ্রহ ছিল। অনুষ্ঠানে তারকাদের উপস্থিতিও ছিল ব্যাপক। বিকেল থেকেই সুসজ্জিত বেশভূষায় অনুষ্ঠান কেন্দ্রে আসতে থাকেন। লালগালিচায় হেঁটে মিলনায়তনে প্রবেশের সময় সকলের মুখে ফুটে উঠেছিল অনুষ্ঠানকে ঘিরে খুদেদের প্রত্যাশার ভাষা। অনেক প্রিয়জন, অনেক গুণীজনের উপস্থিতিও উঠতি খুদে প্রতিভাদের পথ দেখিয়েছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন। নটরাজের মূর্তিতে মাল্যদান করার পর শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। নিভে যায় মঞ্চের আলো। ‘তোর মনের মাঝে কে’ গানের সঙ্গে জমকালো নাচ নিয়ে মঞ্চে আসেন নৃত্যশিল্পী। ওয়েস্টার্ন ড্যান্সের শিল্পীদের সঙ্গে তাঁদের মনমাতানো নাচের পর মঞ্চে উপস্থাপক ললনারা। দুজন ছিলেন পুরো অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের ভূমিকায়। নাচের পর পুরস্কার প্রদানের ফাঁকে ফাঁকে ছিল নৃত্য, কৌতুক নাটিকা, নানা রকমের সরস কথোপকথনের বুননে আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। দর্শকেরা করতালিতে খুদেদের অভিনন্দিত করেন। মঞ্চে বড় ডিজিটাল পর্দায় তাঁদের জীবনের নানা মুহূর্ত তুলে ধরা হয়। মাঝে সঞ্চালকদের খুনসুটি। তারকাজগতের অতিথিরা মঞ্চে এসে বিজয়ীর নাম ঘোষণা ও পুরস্কার প্রদান করেন। গান-নাচের পর আবার কৌতুক। ভিন্ন আঙ্গিকে কৌতুক অভিনেতাগন সাম্প্রতিক শিশুদের মোবাইল নেশা, বোকা বাক্স টেলিভিসনের পর্দায় সিরিয়ালে মত্ত থাকা মহিলাদের বিরত থাকার বার্তা দিয়ে সচেতন থাকার প্রয়াসকে নাটকের মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে একটি পরিবেশনা উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চলচিত্রশিল্পী অনিন্দ্য ব্যানার্জ্জী, রাষ্ট্রপতির আশির্বাদধন্য ক্রীড়াসাংবাদিক ‘আর কে নিউজ’-এর ম্যাগাজিন ‘স্পোর্টজ স্পট’-এর সম্পাদক রাজকুমার মণ্ডল, কর্পোরেট কর্তা সৈকত সেনগুপ্ত ও অনিল কুমার রায় সহ বিশিষ্টজনেরা। যাঁরা অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চ অলংকৃত করেন। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও গৌরবান্বিত করে তোলে। তাঁরা তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ প্রদান করেন এবং “রিদম অ্যান্ড হারমনি”-র এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

অতিথিদের বক্তব্যে উঠে আসে শিল্পচর্চার গুরুত্ব এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সৃজনশীলতার বিকাশের প্রয়োজনীয়তা। সমগ্র অনুষ্ঠানটি ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা ও সুসংগঠিত উপস্থাপনার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আলো, সাউন্ড ও মঞ্চসজ্জার সমন্বয়ে একটি পেশাদার মানের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যা দর্শকদের সম্পূর্ণভাবে অনুষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত রাখে। প্রতিটি পরিবেশনার শেষে দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে দেয় যে, এই সন্ধ্যা তাদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। “রিদম রেভ” শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ছিল প্রতিভা, আবেগ ও কঠোর পরিশ্রমের এক সম্মিলিত উদযাপন। এই সফল আয়োজন নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ফিরে আসার প্রত্যাশা জাগিয়ে রাখল এবং “রিদম অ্যান্ড হারমনি”-র পথচলাকে আরও সুদৃঢ় করল। নাচের ছন্দে তালে তালে পা রেখেই দোদ্যুল্যমান উচ্ছ্বসিত হৃদয় নিয়েই আনন্দের আসর ছেড়ে ঘরের পথ ধরেন দর্শক-শ্রোতারা।





