কে এই ভদ্রলোক, কে স্বরূপ বিশ্বাস। উত্তর এল, ‘অরপ বিশ্বাসের ভাই’। অরূপ বিশ্বাস টিএমসি-র একজন প্রভাবশালী নেতা। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ছায়াসঙ্গী! ক্ষুব্ধ টলিপাড়া ‘রিনা দি’? পরিচালক তথা অভিনেত্রী অপর্ণা সেনের নিশানায় এবার তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচিত মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই তথা ইন্ডাস্ট্রির ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিসিয়ান্সের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস। টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে ফেডারেশন ও গিল্ডকে ঘিরে দ্বন্দ্ব-সমস্যা নতুন নয়। কিছুদিন আগেই দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়ায় টলিউড পাড়ার এক হেয়ার ড্রেসারের আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে সরব হয়ে ওঠেন কলাকুশলী-পরিচালকরা। ফেডারেশনকে তোপ দাগেন সকলেই। অনেকেই বলেন যে দীর্ঘদিন ধরে টলিপাড়ায় ফেডারেশনের দাদাগিরি চলছে। ফেডারেশনের অহেতুক ঔদ্ধত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ও। এই প্রসঙ্গেই বেশিরভাগের তোপে মুখে পড়েছেন ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস। এবারে সমাজমাধ্যমে খোলা চিঠিতে স্বরূপকে প্রশ্নবাণ ছুঁড়লেন অপর্ণা সেন। পরিচালকদের সংগঠনের তথ্যের ভিত্তিতে কী প্রশ্ন রেখেছেন তিনি ?
পরিচালক তথা অভিনেত্রী অপর্ণা সেনের নিশানায় এবার তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচিত মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই তথা ইন্ডাস্ট্রির ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিসিয়ান্সের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস নিজে কোনওভাবেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত নন, তাহলে তিনি এই ফেডারেশনের সভাপতি কীভাবে হলেন? প্রশ্ন রাখেন অপর্ণা। এখানেই শেষ নয়, আরও তিন তিনটি প্রশ্ন রেখেছেন তিনি। অপর্ণা লেখেন, ‘শুনলাম তাঁর নাকি সহকারী পরিচালকের কার্ড আছে। কিন্তু আমি যতদূর জানি, অন্তত দুটি ছবিতে অবসার্ভারের কাজ না করলে সহকারী পরিচালকের কার্ড পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় প্রশ্ন, তিনি যে দুটি ছবিতে অবসার্ভার ছিলেন, সেই দুটি ছবির নাম কী? তৃতীয় প্রশ্ন, সহকারী পরিচালকের কার্ড হাতে পাওয়ার পর থেকে তিনি আজ পর্যন্ত ক’টি ছবিতে কাজ করেছেন, এবং ছবিগুলির নাম কী?’ তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য যে ইন্ডাস্ট্রির নিয়ম অনুযায়ী সহকারী পরিচালক হিসেবে কার্ড পাওয়ার ১৩ মাসের মধ্যে কোনও ছবিতে কাজ না দেখাতে পারলে তাঁর সেই কার্ড নাকি বাতিল হয়ে যায়। আর তাই এই সময়ের মেয়াদের মধ্যে তিনি যদি কোনও কাজ না করে থাকেন, তাহলে স্বরূপ বিশ্বাসের সেই কার্ড আদৌ বাতিল করা হয়েছে কিনা জানতে চান অপর্ণা সেন। ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সংগঠনের পক্ষ থেকে গতকাল এই চিঠিটি তাদের সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তীও এই চিঠিটি হুবহু তুলে নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করে নিয়েছেন। খোলা চিঠিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরস গিল্ডের কাছে এই প্রশ্ন রেখেছেন অপর্ণা সেন। আর এই চিঠি ঘিরে ফের একবার তোলপাড় হয়ে উঠেছে টলিপাড়া।
ফেডারেশনের নিয়ম প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে বললেন, ‘আমি টলিউডের সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে যুক্ত নই। আসলে অনেকদিন হয়ে গেল খুব একটা ছবি করি না। আমি যখন ছবি করি, মূলত ক্রিয়েটিভ দিকটাই দেখা আমার কাজ। আমায় হঠাৎ এসে কেউ বলে– ‘দিদি দু’জনকে আরও নিতে হবে, এটা ফেডারেশনের নিয়ম।’ বাজেট বেড়ে যাবে না বলুন তো! উত্তর মেলে– ‘নানা বাজেটে কুলিয়ে যাবে, আপনাকে ওত ভাবতে হবে না।’ এমন কি প্রযোজক নিজেই এই কথা বলেন। আমি ছেড়ে দিয়েছি।
স্বরূপ বিশ্বাসকে নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে ভেঙে বোঝালেন, ‘হঠাৎ স্বরূপ বিশ্বাসকে নিয়ে আমি কেন আগ্রহ দেখাব। কোনও কারণই তো ঘটেনি। আমি যদি ঘনঘন ছবি করতাম, তাহলে হয়তো জানতে পারতাম। আমার ইন্ডাস্ট্রির সকলের সঙ্গে খুব স্নেহের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে যদি প্রতিদিন দেখা হত, তাহলে হয়তো ওরা এগুলো আমায় বলতো। তাহলে হয়তো জানতে পারতাম। আমি অনেকটা সময় বাইরেই থাকি। মাঝে মধ্যে অনেকেই আমায় জানায় এটা হয়েছে, এটা ঘটছে, সব টুকরো টুকরো তথ্য। আমি তখন জানতে চাই, কে এই ভদ্রলোক, কে স্বরূপ বিশ্বাস। উত্তর এল, ‘অরপ বিশ্বাসের ভাই’। অরূপ বিশ্বাস টিএমসি-র একজন নেতা। আমার অজ্ঞতা যে আমি জানতাম না কে স্বরূপ বিশ্বাস। তারপর ফেসবুকে যখন দেখছি অনেক কিছু লেখা হচ্ছে, সেখানে কিন্তু কেউ স্বরূপ বিশ্বাসের নাম করেননি। তারপর একজন পরিচালক আমায় বেশ কিছু চিঠি পাঠালেন। এই চিঠিগুলো পাওয়ার পর আমি জানতে পারলাম যিনি নিষেধ করছেন, তিনি কে। আমার মনে প্রশ্ন জাগল, স্বরূপ বিশ্বাস, তিনি কোন কারণে চেয়ারম্যান? তিনি কি কোনও টেকনিশিয়ান? আমার সত্যি জানা ছিল না। তারপর শুনলাম তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট কার্ড আছে। আবার মনে প্রশ্ন জাগল, তিনি কোনও কাজ করেছেন কি? আমি এটা জানতে পারি, কারণ আমি দুজনকে কাজে নিতে চেয়েছিলাম, তখন শুনেছিলাম তাঁদের নেওয়া যাবে না। তাঁদের কার্ড নেই। আর দুটো ছবিতে সহযোগিতা না করতে এই কার্ড পাওয়া যায় না। তারপর আমি জানতে পারলাম তেরো মাসের মধ্যে কাজ না করলে কার্ড খারিজ হয়ে যায়। আবার আমার মনে প্রশ্ন, উনি তেরো মাসে কোনও কাজ কি করেছেন? আমি কাউকে কোনও দোষারোপ করতে চাই না। আমার মনে কিছু প্রশ্ন এসেছিল, আমি শুধু তার উত্তর জানতে চাইছি। কেন আগে আমি প্রশ্ন করিনি? আরে বাবা প্রশ্ন করার মতো কিছু হয়নি তাই। আমি আজও এর উত্তরগুলো জানি না।
টলিপাড়ায় যৌন হেনস্থা প্রসঙ্গও এদিন এড়িয়ে গেলেন না অভিনেত্রী। বললেন, ‘এটা আমি অনেকদিন ধরেই শুনছি যে নানা রকমের যৌন হেনস্থার খবর আসছে। আমি নিজের সময়ও দেখেছি। খুব নাম করা একজন অভিনেত্রীকে নাকের সামনে টাকাটা ধরে দেখানো হচ্ছে, কিন্তু দেওয়া হচ্ছে না। আমি তাঁকে বলেছিলাম, কাল থেকে তুমি আর এসো না। আমি শুট করব না যতক্ষণ না ওর টাকা দেওয়া হচ্ছে। এইভাবে প্রতিবাদ করেছি আমরা। শুনেছি মুনমুন সেনও করেছিলেন। তবে ফেডারেশনের সঙ্গে কিছু করিনি কখনও। যে কোনও কারণেই হোক আমাকে কেউ এই বিষয় বিরক্ত করেনি।’
তবে কেন এতদিন চুপ? কেন এই বিষয় তিনি আগে প্রশ্ন তোলেননি, উত্তরে অপর্ণা সেন স্পষ্ট করলেন, ‘আমার কেরিয়ার গড়ে উঠেছে টলিউডকে কেন্দ্র করে, আমি এখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি, অনেকটা জেনেছি, কী করা উচিত, কী করা উচিত নয় সেটা শিখেছি। তবে আমার জীবনটা শুধুই টলিউড ঘিরে নয়। আমার অনেক অন্য কাজ আছে। আমি নিত্য বাংলা ছবির জগতে মিশে থাকি না। তবে কাজের সূত্রে কিছু ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে, তাঁদের সঙ্গে অন্য অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এটা নিয়ে নয়। তাঁদের হয়তো মনে হয়েছে, কেন রিনাদিকে আবার এটা নিয়ে বলতে হবে, তাই বলেনি হয়তো। এবার মাথা ঘামানোর দরকার হল। তাই মাথা ঘামাচ্ছি।’
টলিপাড়ায় একের পর এক অভিযোগ উঠেছে ফেডারেশনের বিরুদ্ধে। গত কয়েক মাসে দ্বন্দ্বের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। সম্প্রতি সেই আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে হেয়ার ড্রেসার গিল্ডের সদস্য, এক কেশসজ্জা শিল্পীর আত্মহত্যার চেষ্টা। ওই শিল্পীর অভিযোগ, কোনও ভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করে তাঁকে তিন মাস কর্মবিরতিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু, তার পরেও গিল্ড এবং ফেডারেশন একজোট হয়ে তাঁকে কাজ করতে দিচ্ছে না। ফলে তাঁকে ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছিল। তাঁর দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। একই অভিযোগ করেছেন অন্য অনেক কেশসজ্জা শিল্পী। কিন্তু তার পর ফেডারেশনের তরফ থেকে জানানো হয়, কাউকে কোনও কর্মবিরতিতে পাঠানো হয়নি। এই প্রসঙ্গে শনিবার গিল্ড থেকে পাঠানো কর্মবিরতির চিঠি প্রকাশ্যে আনেন অভিযোগকারিণীরা। পাশাপাশি তাঁরা দাবি তোলেন, এ বছর গিল্ডের নতুন কমিটি যেন গঠিত হয় গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে। হেয়ার ড্রেসার গিল্ডের সেই বক্তব্য ডিরেক্টর্স গিল্ড প্রকাশ্যে আনে। সমাজমাধ্যমে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়-সহ একাধিক পরিচালক সেই বিবৃতি ভাগ করে নেন। সেখানেই কৌশিকের পোস্টে এই প্রথম একাধিক প্রশ্ন রেখেছেন অপর্ণা সেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, “স্বরূপ বিশ্বাস কি সিনেমা তথা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির কোনও টেকনিশিয়ান? যদি না হন, তা হলে শুধুমাত্র শাসকদলের সদস্য হওয়ার সুবাদে কেমন করে তিনি এই ইন্ডাস্ট্রির ফেডারেশনের সভাপতি পদে বহাল থাকতে পারেন?” কারণ তিনি জানেন, ফেডারেশন সভাপতি নাকি সহকারী পরিচালকের কার্ড আছে। কিন্তু অপর্ণা সেন যত দূর জানেন, অন্তত দু’টি ছবিতে অবজ়ার্ভারের কাজ না করলে সহকারী পরিচালকের কার্ড পাওয়া যায় না। এই প্রেক্ষিতে তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্ন, তিনি যে দু’টি ছবিতে অবজ়ার্ভার ছিলেন, সেই দু’টি ছবির নাম কী? সহকারী পরিচালকের কার্ড হাতে পাওয়ার পর থেকে তিনি আজ পর্যন্ত ক’টি ছবিতে কাজ করেছেন, ছবিগুলির নাম কী? কারণ, সহকারী পরিচালকের কার্ড হাতে পাওয়ার ১৩ মাসের মধ্যে কোনও ছবিতে সহকারী পদে কাজ না করলে, সহকারী কার্ডটি খারিজ হয়ে যায়। অপর্ণা সেনের জিজ্ঞাসা, কথাটি সত্যি হলে এবং স্বরূপ ১৩ মাসের মধ্যে কোনও ছবিতে কাজ না করলে থাকেন, ফেডারেশন সভাপতির কার্ড কি খারিজ করা হয়েছে? প্রশ্ন রাখার পর তিনি সরাসরি ফেডারেশন সভাপতির কাছে জানতে চেয়েছেন, “এই ইন্ডাস্ট্রির সর্বাধিক বয়োজ্যেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর্স গিল্ডের কাছে নিশ্চয়ই এই ক’টি প্রশ্নের উত্তর আশা করতে পারি?” অপর্ণা সেনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নিয়ে স্বরূপ বলেন, “নিশ্চয়ই উত্তর দেব। অপর্ণা সেন সমাজমাধ্যমে প্রকাশ্যে জানতে চেয়েছেন। আমিও সমাজমাধ্যমেই ওঁর সব প্রশ্নের উত্তর দেব।” দেরিতে তোলা হলেও অপর্ণা সেনের করা যথেষ্ট প্রসঙ্গত এবং যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করছে টলিউড মহল!





