বঙ্গের রাজনৈতিক ক্যানভাসে এখন রক্তবর্ণ মেঘ। ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ পড়া, প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে অঘোষিত ‘লাইসেন্স টু কিল’ তুলে দেওয়ার অভিযোগ। তা স্রেফ কোনও নির্বাচনী রণকৌশল নয়, রাজনৈতিক কূটকচালিতে ‘গণতন্ত্রের ব্লু-প্রিন্টেড মার্ডার’। ২০২৬-এর নির্বাচন স্রেফ ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়। অস্তিত্বের, আত্মসম্মানের এবং বাংলার নিজস্ব পরিচিতি রক্ষার এক মরণপণ সংগ্রাম। দিল্লির অশ্বমেধের ঘোড়া যখন বাংলার সবুজ ঘাস পদদলিত এগোতে চাইছে, তখন তাকে রুখতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে এক আঞ্চলিক শক্তি। কিন্তু এই লড়াই কি সমানে-সমানে? নাকি পর্দার আড়ালে লেখা হচ্ছে এক ভয়ঙ্কর নীল নকশা?
ভোটার ছাঁটাই নাকি সুপরিকল্পিত গণহত্যা? ৬৪ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া, তারপর সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে আরও ৩৯ লক্ষের উধাও। এ কোনও গাণিতিক ভুল? নাকি এটি একটি ‘পলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো থেকে বেছে বেছে নাম মুছে ফেলা। লড়াইটা আর ইভিএমে সীমাবদ্ধ নেই। শুরু হয়ে গেছে দফতরের ফাইল থেকেই। এটি আদতে অসমের এনআরসি মডেলের এক ‘সাইলেন্ট ভার্সন’। ভোটার তালিকায় নাম না থাকা মানে শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার হারানো নয়, বরং নাগরিকত্বের ওপর এক প্রচ্ছন্ন খাঁড়া ঝুলিয়ে দেওয়া। মমতার নিশ্ছিদ্র ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরানো বেশ কষ্টসাধ্য। ভোটার সংখ্যা কমিয়ে দিয়েই ম্যাচের ফলাফল বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা। অন্তিম প্রচেষ্টায় ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’!
আমলাতন্ত্রের শিরদাঁড়া ভাঙার খেলা। নির্বাচনের দামামা বাজলেই বাংলার দক্ষ অফিসারদের বদলি। বিষয়টা এখন জলভাতে পরিণত। দিল্লির নির্দেশে রাজ্য পুলিশের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া। দাপুটে আমলাদের সরিয়ে দেওয়া। উদ্দেশ্য, প্রশাসনকে নেতৃত্বহীন করে দেওয়া। যে পুলিশ অফিসাররা বাংলার নাড়ি-নক্ষত্র চেনেন, তাদের সরিয়ে এমন কাউকে বসানো হচ্ছে যারা স্থানীয় আবেগ বোঝেন না। বোঝেন শুধু দিল্লির প্রভুদের হুকুম। প্রশাসন যখন নিরপেক্ষতা হারায়, তখন তা আর রাষ্ট্রযন্ত্র থাকে না। তা হয়ে ওঠে একটি বিশেষ দলের ‘এক্সটেনশন উইং’। ইডি-সিবিআই-এর অতিসক্রিয়তা আর অফিসার বদলের এই ‘ক্রোনোলজি’ কি শুধু কাকতালীয়? নাকি বাংলার প্রশাসনিক সার্বভৌমত্বে কুঠারাঘাত?
কেন্দ্রীয় বাহিনী রক্ষক নাকি ‘পলিটিক্যাল প্রক্সি’? কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশ সরাসরি এফআইআর করতে পারবে না, এই নির্দেশিকা কার্যকর হওয়া মানে বাংলার আইন-শৃঙ্খলার চাবিকাঠি দিল্লির হাতে তুলে দেওয়া। শীতলকুচির সেই রক্তাক্ত স্মৃতি আজও বাংলার আকাশে-বাতাসে হাহাকার তোলে। বিজেপি জানে বুথ স্তরে তাদের সংগঠন কঙ্কালসার। তাদের হাতে পর্যাপ্ত ‘এজেন্ট’ নেই, নেই লড়াকু কর্মী। তাই তারা জওয়ানদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। বুথের ভেতর বুটের শব্দ আর সাধারণ ভোটারের লাইনে ভীতির সঞ্চার করে কি আদৌ জনমত পাওয়া সম্ভব? বাহিনীর ওপর এই আইনি রক্ষাকবচ আসলে এক অঘোষিত ‘লাইসেন্স টু কিল’, যা গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকতে পারে।
আবেগ কি হার মানবে যন্ত্রের কাছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্রেফ একজন রাজনীতিক নন। বাংলার এক অবিনাশী আবেগ। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী বা স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্পগুলো বাংলার প্রান্তিক মানুষের অন্দরমহলে মমতাকে এক অবিসংবাদী দিদির আসনে বসিয়েছে। ২০২১ সালে বিজেপি ‘আব কি বার ২০০ পার’-এর হুঙ্কার দিলেও মমতার ভাঙা পায়ের কাছে দিল্লির সমস্ত অহঙ্কার চূর্ণ হয়েছিল। কারণ বাঙালি আবেগ আর ‘বাংলার মেয়ে’ সেন্টিমেন্টের কাছে হিন্দুত্বের মেরুকরণ বা এজেন্সির ভয় ধোপে টেকে নি। বিজেপির সিস্টেম দিয়ে চাপ সৃষ্টি। বাংলার মাটি থেকে মমতার শিকড় উপড়ানোর অসম্ভব সহজ প্রয়াস। দিল্লি যখন বন্দুকের নল উঁচিয়ে ভোট চায়, বাংলার গলি তখন ‘ঘরের মেয়ে’-কেই আঁকড়ে ধরে।
বিজেপির কেন এই মরিয়া ভাব? বিজেপির এই সর্বাত্মক আক্রমণ। পরাজয়ের আগাম স্বীকারোক্তি? যখন কোনও দল জানে যে তারা মানুষের মন জয় করতে পারবে না, তখনই তারা নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী আর আইনি প্যাঁচের আশ্রয় নেয়। সংগঠন নেই, তাই সিস্টেমকে অস্ত্র করা, এটাই বিজেপির বর্তমান রণকৌশল। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মানুষের ক্ষোভ যখন আগ্নেয়গিরির মতো ফাটে, তখন কোনও ব্যারিকেড বা আইনি রক্ষাকবচই তাকে ধরে রাখতে পারে না।
২০২৬-এর মহাযুদ্ধ হবে ‘দিল্লির দাদাগিরি’ বনাম ‘বাংলার জেদ’-এর লড়াই। ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ দিয়ে, পুলিশ সরিয়ে দিয়ে বা বাহিনীকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়ে সাময়িকভাবে হয়ত দাপট দেখানো যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয় জেতা যায় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশমা এই প্রতিকূলতার মধ্যেই আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বাঘিনীকে যত কোণঠাসা করার চেষ্টা হবে, তার পালটা গর্জন ততটাই প্রকম্পিত করবে দিল্লির তখত্। বাংলার ইতিহাস সাক্ষী, এখানে অন্যায় চাপিয়ে দিলে মানুষ তার যোগ্য জবাব ইভিএমেই দেয়। বিজেপি যদি মনে করে ‘কমিশন’ আর ‘বাহিনী’ দিয়ে তারা বাংলার কপাল লিখবে, তবে তারা চরম ভুল করছে। দিনশেষে, ইভিএমের বোতামে আঙুল থাকবে সেই মানুষেরই, যাদের ঘর থেকে আজ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা রেশন কার্ড কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। জয় হবে কি দিল্লির দাম্ভিক মেকানিজমের, নাকি বাংলার অদম্য আবেগের? উত্তরটা মিলবে ২০২৬-এর উত্তপ্ত গ্রীষ্মেই!





