আজ কথাগুলো খুব মনে পড়ছে। হয়তো অনেক বন্ধুকেই রাহুল (অরুণোদয়) এই লাইনটা বলত, ”সহজের মাকে আমি হারাতে চাই না আর…”। বাংলা সিনেমায় আসা মধ্যবিত্ত পরিবারের দু’ জন ছেলেমেয়ে। রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা। রাজ চক্রবর্তীর পরিচালনায় প্রথম সিনেমাতেই দুরন্ত উত্থান। দুই তারকার জন্ম হল। আর তখন থেকেই মন গলানো প্রেমের শুরু। তীব্র প্রেম। বহু বাঁধাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রেম। শোনা যায় সেই সময়ে প্রিয়াঙ্কা, রাহুলের মন্দ লাগুক, এমন কিছু করতে রাজি হতেন না। দারুণ একটা ছবি করার সুযোগ ছেড়ে দিয়েছিলেন তার জন্য। তাঁদের সম্পর্ক ঘিরে টলিপাড়ায় রাজনীতি কিন্তু বিস্তর হয়েছে। রাহুল সে রাজনীতি পছন্দ করতেন না। তবে তাঁর সেন্স অফ হিউমারের সঙ্গে রাজনীতি মিশে যেত। বলতেন, ”উলালা আই লাভ ইউ মাই সোনিয়া…” নাকি ভারতের একমাত্র গান, যাতে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা-সোনিয়া আছে। রাহুল আর আমার সম্পর্ক একেবারে সাংবাদিক আর অভিনেতার পেশাদার আদানপ্রদানের। কিন্তু তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি করে ঢুকে পড়ল রাহুল-প্রিয়াঙ্কার প্রেম। আমি থাকি গল্ফ গ্রিনে। গল্ফ গ্রিনের উদয় সদনে বেশ ধুমধাম করে দু’ জনের বিয়ের আসর জমেছিল। বেশ কিছু বছর পর হঠাত্ রাহুলের ফোন। কত নম্বর যেন, মনে পড়ছে না ঠিক আজ, বিবাহবার্ষিকীতে প্রিয়াঙ্কাকে প্রেমপত্র লিখবে। তখন একটি কাগজের অফিসে কাজ করি। সেই কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল প্রেম পত্রটি। রাহুল শব্দ নিয়ে খেলতে ভালোবাসত। তাঁর প্রেমের প্রকাশ তাই ছিল চিঠিতে। গল্ফ গ্রিন সেন্ট্রাল পার্কে এসে হন্তদন্ত হয়ে লেখা দিয়ে গেল। লেখাটা নাকি পারফেক্ট হতে একটু বেশি সময় লেগেছিল সেদিন। যে দু’ জনের এমন তীব্র প্রেম, তাঁরা আবার বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে পারে, কে ভেবেছিল! কিন্তু তীব্র রাগ, ক্ষোভ কোনও কিছুর কমতি হয়নি একটা সময়ে। অথচ তখন ছেলে সহজ তাঁদের জীবনে এসে গিয়েছে। সে অধ্যায় বেশ জটিল। অনেক স্তর। রাহুল-প্রিয়াঙ্কা যখন আইনি লড়াই লড়ছে একে-অপরের বিরুদ্ধে, তখন চারপাশে আমাদের মন ভেঙে যেত। আমরা ভাবতাম, এরা ‘বড়’ হবে কবে? সেই যে ছোটবেলায় আবেগপ্রবণ হয়ে একে-অপরের হাত ধরল, তেমন করেই আর একবার কি দু’ জনে হাত ধরবে না? এরপর একদিন যেমন চাওয়া, তেমন পাওয়া। সহজকে মাঝে নিয়ে ছবি পোস্ট করলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। আইনি লড়াই-টড়াই থামল। আইনজীবীরাও মনে হয়, আমাদের মতো খুশি হয়েছিলেন। যখন রাহুল-প্রিয়াঙ্কার নতুন জোটের স্টোরি ব্রেক করি, সেদিন কিন্তু মুখ খোলেননি দু’ জনে। কিন্তু আমার মন বলছিল, সব কিছু ভালো হবে। ক্রমশ বিষয়টা জানল সকলে। টলিপাড়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল সেই খবরে। তারপর যখন রঙের উত্সব এলো, রাহুল-প্রিয়াঙ্কাকে বললাম, সহজকে নিয়ে দোল খেলার একটা শুটিং করব। সেদিন প্রিয়াঙ্কা-রাহুল দু’ জনে সাদায় সেজেছিল। প্রিয়াঙ্কার বাড়ির বাগানে শুটিংটা হয়েছিল। রাহুলকে কচুরি আর জিলিপি না খাইয়ে ছাড়েনি সে! আর সহজ ভারি মজা করছিল রাহুলের সঙ্গে… সেই যে মিল হল, রাহুল মাঝেমাঝেই মজা করে বলত, ”সহজের মাকে আমি হারাতে চাই না আর…”। এই তো ‘সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই’ ছবির মুক্তির সময়ে একটা পিকনিক হয়েছিল। বাসে রাহুল ফোনের ডিসপ্লে পিকচার দেখাল। দেখি, দোলের সেই শুটিংয়ের ছবিটা! ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির শেষে বিচ্ছেদেই যেন প্রেম পূর্ণতা পায়। আজও কি সেটাই ভেবে সান্ত্বনা দেব নিজেকে? শোকাতুর রাহুলের পরিবার। শোকস্তব্ধ স্ত্রী অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার ও রাহুলের ছেলে সহজ। রাহুলকে হারিয়ে সোশাল মিডিয়ায় এক দীর্ঘ পোস্ট দিলেন প্রিয়াঙ্কা। এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একটি শিশু, একজন মা, পুরো পরিবার এবং প্রিয়জনেরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। আমরা সংবাদমাধ্যমের বন্ধু ও সহকর্মীদের বিনীতভাবে অনুরোধ করছি আমাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে; কোনওভাবেই আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করবেন না এবং আমাদের শান্তিতে শোক পালনের সুযোগ দিন। এই সময়ে আপনাদের সহমর্মিতা ও সমর্থন আমাদের কাছে সবথেকে মূল্যবান।” রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই সময়ই সহ অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে পর্দার প্রেম বাস্তবেও পরিণতি পেয়েছিল। সহ-অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রাহুল। তাঁদের কোল আলো করে আসে একমাত্র সন্তান সহজ বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও ২০১৭ সালে তাঁদের বিচ্ছেদের খবরে মন ভেঙেছিল অনুরাগীদের, তবে ২০২৩ সালে সমস্ত তিক্ততা ভুলে তাঁরা আবার এক হয়েছিলেন। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবং নিজেদের ভালোবাসার টানেই তাঁরা নতুন করে সংসার শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই পুনর্মিলনের আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী যেন হল না।
অভিনয়ের পাশাপাশি বরাবরই লিখতে পছন্দ করতেন রাহুল। কবিতা থেকে প্রবন্ধ, তাঁর লেখনিতে শব্দ যেন জলের মতো ভেসে বেড়াত সাদা কাগজে। তাঁর কাছে কঠিন কথা গুলোও সহজ হয়ে যেত। এই সহজ মানুষটাকেই হারিয়ে যেন, পাথরের মতো কঠিন হয়ে গিয়েছে, তাঁর অনুরাগীরা। ঠিক সেই সময়ই সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হল, ২০১৮ সালে রাহুলের একটি লেখা। যা তিনি লিখেছিলেন আর্টিস্ট ফোরামের বাতায়ন পত্রিকায়। যে লেখার শুরুতেই ছিল মৃত্যুর কথা। মৃত্যুর পর, আত্মা দেহ থেকে বেরিয়ে মেপে নিচ্ছে তাঁর চারপাশ। কলমে সেই ছবিই যেন তুলে ধরেছিলেন রাহুল। লেখার নাম দিয়েছিলেন ‘বান্ধবীরা’। দুনিয়ার কাছে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্য়ায় ওরফে নায়ক হলেও, পাড়ার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সেই রাহুল। যে রাস্তায় পাড়ার লোকদের সঙ্গে দেখা হলে, আড্ডায় দাঁড়িয়ে পড়তেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে নানা উৎসবে মেতে উঠতেন। তা দুর্গাপুজো হোক কিংবা পাড়ার টুর্নামেন্ট। বিজয়গড়ের আট থেকে আশির সবার ডাকেই সারা দিতেন রাহুল। রবিবার সেই পাড়াতেই যখন পৌঁছল রাহুলের মৃত্যুর খবর, স্তম্ভিত সবাই। মেনেই নিতে পারছেন না, এমন শোকের খবর। দলে দলে ভিড় জমিয়েছেন রাহুলের বাড়ির সামনে। সত্য়িই কি তাঁদের প্রিয় রাহুল নেই! রাহুলের প্রতিবেশীরা সবাই প্রায় রাহুলকে ছোট থেকে দেখেছেন। সবার মন জয় করেই রাখতেন তিনি। তাঁর স্পষ্টবাদী, সাহসী চরিত্রের জন্য পাড়াতেও দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। ক্রিকেট হোক বা ফুটবল, যেকোনও পাড়ার টুর্নামেন্টে ছুটে আসতেন। অংশ নিতেন। তখন রাহুল সিনেমার পর্দার হিরো নন, বরং পাড়ার রাহুলদা। ইস্টবেঙ্গল ফুটবল দলের অন্ধভক্ত ছিলেন। ছিলেন আর্জেন্টিনারও দারুণ ফ্যান। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা জেতার পর তো রাস্তায় বেরিয়ে সেলিব্রেশনে মেতে উঠেছিলেন আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের মতোই। সেলিব্রিটি সুলভ আচরণ থেকে শতহস্ত দূরে থাকা সেই পাড়ার রাহুলকে হারিয়ে বিজয়গড় তাঁর পাড়া যেন আজ সারারাত জেগেই কাটাবে। আর ডুব দেবে সেই ছোটবেলা থেকে দেখা রাহুলের স্মৃতিচারণায়।
আজকাল এত দামী উপহারের ভিড়ে হাতে বানানো ছোট্ট জিনিস বা হাতে লেখা একটা চিঠি অমূল্য। আবেগ, ভালবাসা, মনের ইচ্ছে দিয়ে তৈরি সেই উপহারই সবচেয়ে দামী প্রমাণিত হয়। আজকাল চিঠি লেখার অভ্যাস আর কারও তেমন নেই বললেই চলে। আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে আজ চিঠি পত্র বড়ই সেকেলে। কিন্তু আজও হাতে গোনা যে কয়েকজন চিঠিকেই সবচেয়ে প্রিয় উপহার হিসেবে মনে করেন, তাঁদের মধ্যে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন অন্যতম। রবিবার মৃত্যুর পর ছেলে সহজকে লেখা সেই চিঠি নিয়েই আবেগে ভাসছে নেটদুনিয়া। ফাদার্স ডে-তে ছেলেকে চিঠিটি লিখেছিলেন রাহুল। তাতেই ধরা পড়েছে লড়াই, ভালবাসা আর জীবনের পাঠ। এই দিন উদযাপন তাঁর অভ্যাসে না থাকলেও, ছেলেকে কাছে পাওয়ার অজুহাত হিসেবেই কলম ধরেছিলেন। চিঠিতে উঠে এসেছে তাঁর ও স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা-র দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁদের বন্ধুত্ব, একসঙ্গে কাজ, আর ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার সংগ্রাম-সহ একাধিক বিষয়। তিনি লিখেছেন, তাঁদের কাছে কোনও ‘প্রিভিলেজ’ ছিল না, ছিল শুধু অপমান সহ্য করে নিজের জায়গা করে নেওয়ার লড়াই। সেই অর্জিত অভিজ্ঞতাই ছেলের জন্য রেখে যেতে চেয়েছিলেন। ছেলেকে উদ্দেশ্য করে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, যদি কখনও এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, প্রত্যেক মানুষকে সম্মান দেবে। যিনি চা দেন, তিনিও সম্মানের যোগ্য। অর্থ আর ক্ষমতার চোখে মানুষকে বিচার করা অশিক্ষার পরিচয়। চিঠির সবচেয়ে আবেগঘন অংশ জুড়ে রয়েছে ‘পরিবার’। সহজের জন্মের খবর পেয়ে কীভাবে আনন্দে ভেসে গিয়েছিলেন, স্ত্রীর মাতৃত্বের সংগ্রাম, সন্তানের জন্য তাঁর নিঃস্বার্থ ত্যাগ- সবটাই বিস্তারিত লিখেছেন অভিনেতা। বিশেষ করে প্রিয়াঙ্কার লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সমাজের কটাক্ষ সহ্য করেও কীভাবে তিনি সন্তানকে বড় করেছেন। শেষে ছেলের কাছে তিনি একটাই আবেদন করেন, মায়ের কষ্ট যেন সে কোনওদিন ভুলে না যায়। ‘মায়ের পিঠে গাঁথা ছুরিগুলো হয়তো সরাতে পারবে না, কিন্তু তোমার একটু ভালবাসাই ওর কাছে অনেক।’ অভিনেতার রেখে যাওয়া এই চিঠির মাধ্যমেই উত্তরাধিকার হিসেবে রয়ে গেল সম্মান আর সহমর্মিতার শিক্ষা।





