Saturday, April 25, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ঘূর্ণিঝড় ‘শম্পা’ আসছে! ১,০০০ কিমির একটি ‘অস্বাভাবিক’ ‘রেন ব্যান্ড’ নিয়েও গুজব?‌

বিশেষজ্ঞদের দাবি, তথ‌্যটি ভুলে ভরা। কিন্তু শম্পা যে আসছে, হাওয়া অফিস তা জানায়নি কেন? আইএমডি কেন চুপ? বিবৃতি দেয়নি কেন কোনও আঞ্চলিক কার্যালয়? কারণ একটাই। শম্পা, চম্পা বা পম্পা, কেউই আসছে না। পুরোটাই ভুয়ো খবর। এই নামের সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়ের বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। পুরোটাই সীমাবদ্ধ সমাজ-মাধ‌্যমের গণ্ডিতে। কাজেই এটির কলকাতার বুকে আছড়ে, শহরকে তছনছ করে দেওয়ার যাবতীয় খবর এবং পোস্ট পুরোপুরি ভিত্তিহীন। এমনটাই দাবি আবহাওয়াবিদ, ভৌগোলিক এবং বিশেষজ্ঞদের। সাধারণত বছরের যে নির্দিষ্ট সময় কোনও ঘূর্ণিঝড় এলে, নিয়ম করে কোনও দেশ তার নামকরণ করে। এর আগে এই ধারা আমরা ‘আমফান’ কিংবা ‘ফণী’ প্রভৃতির ক্ষেত্রে দেখেছি। এই নামের তালিকা পূর্ব-নির্ধারিত। সেই তালিকাতেও কোনও ‘শম্পা’ নেই বলে। অথচ ‘কলকাতায় কোলাহল! ধেয়ে আসছে সাইক্লোন শম্পা। ২০ থেকে ২২ মার্চ। লন্ডভন্ড হবে কল্লোলিনী। আপনি তৈরি তো?’ গত কিছুদিন ধরেই সোশ‌্যাল মিডিয়াজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে এই খবর। ফেসবুক খুলুন বা ইনস্টাগ্রাম, কিংবা ইউটিউব–সর্বত্রই চোখে পড়েছে এই জন-সতর্কতামূলক পোস্ট। মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টিধোয়া শহরের পর পর কয়েকটা ছবি। আর ব‌্যাকগ্রাউন্ডে পিলে চমকানো সাইরেনের আওয়াজ। সতর্ক না হলেও হঠাৎ করে পোস্টটি গোচরে এলে, ঝটকা লাগতে বাধ‌্য! সোশ‌্যাল মিডিয়া মারফত এই নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে, তাতে রীতিমতো ‘হতাশ এবং ক্লান্ত’ পুণের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিকাল মেটিওরোলজির (আইআইটিএম) অবসরপ্রাপ্ত অধ‌্যাপক, পার্থসারথি মুখোপাধ‌্যায়। বর্তমানে যুক্ত ওড়িশার বেরহামপুরের আইআইএসইআর-এর সঙ্গে। পার্থবাবুর কথায়, ‘‘সোশ‌‌্যাল মিডিয়া এখন এমন একটি মাধ‌্যম হয়ে গিয়েছে যেখানে যে যা খুশি লিখতে পারে। যা খুশি বলতে পারে। কোনও কিছুরই কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মাথামুন্ডু নেই। এখানে যে কেউ, কিছু একটা লিখে দিলেই, শয়ে শয়ে-হাজারে হাজারে মানুষ লাইক করছে, ফরোয়ার্ড করছে। গোটাটাই ভাঁওতাবাজি। ‘শম্পা’ বলে কিছুই নেই। এর কোনও অস্তিত্ব নেই।’’ফেসবুক-ইনস্টা দেখে ‘ওয়েদার আপডেট’ জানা নিছকই বোকামি। বাস্তব জানতে সোশ‌্যাল মিডিয়া থেকে সরে এসে বরং নির্ভর করুন আইএমডি-র ফোরকাস্ট তথা পূর্বাভাসের উপরই।

তাহলে গত এক, দু’দিন ধরে কলকাতাবাসী যে ঝড়-জল দেখছে, যে কারণে ঝুপ করে তাপমাত্রা কিছুটা হলেও নেমে গিয়েছে, শহরবাসীকে ভোর-রাতের দিকে গায়ে হালকা চাদর দিতে হচ্ছে–তার উৎস সাইক্লোনের প্রভাব নয়? পার্থবাবুর কথায়, ‘‘না, এটা কালবৈশাখী।’’ তাঁর ব‌্যাখ‌্যা, ‘‘আমরা এখন মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে আছি। সাইক্লোনের ইতিহাস যদি একটু খতিয়ে দেখেন, গত ১০০ বছরে পশ্চিমবাংলায় মার্চ মাসে আদৌ কি কোনও সাইক্লোন এসেছে? কোনওদিন আসেনি। সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় আমরা কাকে বলি? যেটা বঙ্গোপসাগর বা আরবসাগরে ঘনীভূত হয়, তিন-চার দিন সময় লাগে তৈরি হতে। কখনও আবার এক সপ্তাহ। নির্ভর করে ঘূর্ণিঝড় কোথায় তৈরি হচ্ছে, তার উপর। সেই ঝড় এসে উপকূলীয় এলাকায় আছড়ে পড়ে। এর আগাম খবর পাওয়া যায় স‌্যাটেলাইট ইমেজ নিরীক্ষণ করে। এগুলি সাধারণত ট্রপিকাল সাইক্লোন। মার্চ থেকে মে,এই তিন মাস–বহু যুগ ধরে এই সময়ই বাংলায় কালবৈশাখী হয়। নরওয়েস্টার যাকে বলে। এটা কিন্তু এইবার নতুন করে হচ্ছে না। ওড়িশা-ঝাড়খণ্ড-বিহার, উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ‌্যগুলি যেমন অসমের দিকেও হয়। প্রি-মনসুন পিরিয়ড। এই সময়ই কালবৈশাখী হয়। এটা ঘূর্ণিঝড় নয়।’’

কালবৈশাখী আর পশ্চিমি ঝঞ্ঝা এক নয়। কালবৈশাখী ছোট হয়। পশ্চিমি ঝঞ্ঝা অনেকটা জায়গা জুড়ে হয়।
পার্থবাবুর মতে, ‘‘কালবৈশাখীর সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়কে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ঘূর্ণিঝড় আসতে মোটামুটি ৪-৫ দিন সময় লাগে। কালবৈশাখীর ক্ষেত্রে তা কিন্তু হয় না। সকালে হয়তো পরিষ্কার আবহাওয়া দেখা গেল। কোথাও কিছু নেই। অথচ দুপুরের পর হঠাৎ আকাশ কালো করে ধেয়ে এল ঝড়। শিলাবৃষ্টি। বৃষ্টি। সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা আমেজ। মাত্র কয়েক কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এই সময় হাওয়ার বেগ বেশি থাকে। বাজও পড়ে। আর ঘূর্ণিঝড়ে যত না বাজ পড়ে, কালবৈশাখীতে তার থেকে অনেক বেশি পড়ে।’’ ১,০০০ কিমির ‘অস্বাভাবিক’ ‘রেন ব‌্যান্ড’ নিয়েওতবে শুধু এই ‘শম্পা’র আবির্ভাব নয়। নেটদুনিয়ায় খবর ছড়িয়েছে, ভারত-আফগানিস্তান-পাকিস্তানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ১,০০০ কিমির একটি ‘অস্বাভাবিক’ ‘রেন ব‌্যান্ড’ নিয়েও। বলা হচ্ছে, এর জেরেই বর্তমানে দেশজুড়ে আবহাওয়ার ‘অস্বাভাবিকতা’ লক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু পার্থবাবুর দাবি, এই তথ‌্যটিও ভুলে ভরা। ভূগোল অনুযায়ী, ওয়েস্টার্ন ডিস্টার্ব‌্যান্স তথা পশ্চিমি ঝঞ্ঝাও অত‌্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। প্রতি বছর হয়। ‘ট্রফ ইন দ‌্য ওয়েস্টারলিস’। অর্থাৎ নিম্নচাপ অক্ষরেখাটি পশ্চিমে তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে পূর্বদিকে প্রসারিত হবে। ভূমধ‌্যসাগরের উপর দিয়ে বয়ে এলে, তা প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে নিয়ে আসবে। সোজা কথায়, শক্তি সংগ্রহ করে আসবে। এবার এটি যে যে অংশের উপর দিয়ে ধাবিত হবে, সেখানে বৃষ্টি হবে। যত পূর্বে অগ্রসর হবে, সেই দেশগুলি এর দ্বারা প্রভাবিত হবে। কাশ্মীরের উপর দিয়ে গেলে তুষারপাত হবে। কালবৈশাখী আর পশ্চিমি ঝঞ্ঝা এক নয়। কালবৈশাখী ছোট অংশজুড়ে হয়। কিন্তু পশ্চিমি ঝঞ্ঝা অনেকটা জায়গা জুড়ে হয়। ১,০০০ কিমি বা তার বেশি এলাকাজুড়ে প্রসারিত হয়। এটাই স্বাভাবিক। কাজেই যে খবর ছড়িয়েছে যে ভারত-আফগানিস্তান-পাকিস্তানজুড়ে ১,০০০ কিমির ‘রেন-ব‌্যান্ড’ প্রসারিত হয়েছে, যার ফলে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে এই সব দেশের নানা অংশে, ঝড় হচ্ছে, অস্বাভাবিক আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে–এই দাবিও সারবত্তাহীন। পশ্চিমি ঝঞ্ঝা এইরকমই হয়।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles