রাজনৈতিক টানাপড়েন আর ভোটের কৌশলের মাঝে এদিন মমতার গলায় উঠে এল ঘর ছাড়তে না চাওয়ার এক পারিবারিক কাহিনি। ভোটের আবহে নিজের খাসতালুকের মানুষের সঙ্গে তাঁর এই আত্মিক টান দিয়েই কর্মীদের কাছে টানল তৃণমূল। তবে শুধু আবেগ নয়, রবিবাসরীয় এই সভা থেকে কড়া রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই আবেগের কথাই শোনালেন তৃণমূল নেত্রী। রাজনৈতিক টানাপড়েন আর ভোটের কৌশলের মাঝে এদিন তাঁর গলায় উঠে এল ঘর ছাড়তে না চাওয়ার এক পারিবারিক কাহিনি। মমতা বলেন, “ভবানীপুরের সবাই আমাকে চেনেন। বাড়ি বদলের বিষয়ে কথা হলেও আমি ভবানীপুর ছাড়িনি। আসলে আমার মা আমাকে এই বাড়ি ছাড়তে দেননি।” ভোটের আবহে নিজের খাসতালুকের মানুষের সঙ্গে মমতার এই আত্মিক টান দিয়েই কর্মীদের কাছে টানল তৃণমূল। তবে শুধু আবেগ নয়, রবিবাসরীয় এই সভা থেকে কড়া রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দেন, ঘরের মাঠে কোনওভাবেই ‘আত্মতুষ্টির’ জায়গা নেই। গতবারের চেয়েও বেশি ব্যবধানে জিতে রেকর্ড গড়তে হবে এবার। মমতা এদিন তাঁর ভাষণে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, মানুষের রান্নার গ্যাস দেওয়ার ক্ষমতা নেই, অথচ ভোটের সময় টাকা বিলি করে ভোট কিনতে চাইছে বিরোধীরা। বাইরে থেকে লোক এনে এলাকায় অশান্তি পাকানোর চেষ্টা হচ্ছে বলেও তিনি সতর্ক করেন। এমনকি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার জন্য গ্রেফতার হওয়া কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, দল সবরকম আইনি সাহায্য দেবে। নির্বাচন কমিশনকেও রেয়াত করেননি মুখ্যমন্ত্রী। গত তিন দিনে রাজ্যের ৫০ জন অফিসারকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “কোনও অঘটন ঘটলে তার দায় কে নেবে? শেষ পর্যন্ত মোদী সরকারকেই এর জবাব দিতে হবে।” ভোটের দিন কর্মীদের স্ট্রং রুমের ওপর কড়া নজর রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি জানান, লোডশেডিং করে কারচুপির ভয় থাকতে পারে। সবশেষে তাঁর লক্ষ্য যে এবার সুদূর দিল্লি, সেই বার্তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মমতা। তাঁর কথায়, “বাংলায় জয়ের পরই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হবে দিল্লির পথ। ভোট শেষ মানেই বাড়ি চলে গেলাম, সেটা করবেন না।” ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। এদিনের বৈঠকে মমতা অবশ্য বিজেপি নেতার নাম মুখে আনেননি। শুধু ভিটের টান মনে করিয়ে দিয়ে কাছে টেনে নিয়েছেন দলের সমর্থকদের।
এপিসেন্টারে ফের উঠে এলো ভবানীপুর। এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচন কেন্দ্রে প্রচার ও কৌশল নির্ধারণের জন্য কর্মিসভার বৈঠক ডাকা হয় চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম সহ দলের শীর্ষ নেতারা সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সূত্রের দাবি, ওই কর্মিসভায় অভিষেক পষ্টাপষ্টিই বলেন, ভবানীপুরে আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই। গত ভোটের জয়ের ব্যবধানের মার্জিন আরও বাড়াতে হবে। ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। এদিনের বৈঠকে অভিষেক অবশ্য বিজেপি নেতার মুখে আনেননি। শুধু বিজেপিকে হারানোর টার্গেট বেঁধে দিয়েছেন। অভিষেক কত ব্যবধানে জয়ের টার্গেট স্থির করে দিয়েছেন তা নিয়ে আলোচনার আগে দেখে নেওয়া যাক ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ভবানীপুরে ভোটাভুটির ছবিটা কেমন ছিল। একুশের বিধানসভা ভোটে ভবানীপুরে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বিজেপির প্রার্থী ছিলেন অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। তাঁকে ২৮,৭১৯ ভোটে হারিয়েছিলেন শোভনদেব। পরে উপ নির্বাচনে ওই আসনে ৫৮,৮৩৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
অভিষেক এদিন ওই ৫৮,৮৩৫ ভোটের হাব্যবধানকেই বেঞ্চমার্ক ধরেছেন। কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভবানীপুরে প্রত্যেক কর্মীকে অন্তত ৫টি করে ভোট বাড়ানোর লক্ষ্য নিতে হবে। ২৩১টি বুথে গত ভোটের লিডকে ছাপিয়ে যেতে হবে। শুধু জিতলে হবে না, ৬০ হাজারের বেশি ব্যবধানে জিততে হবে।
এদিনের কর্মিসভায় অভিষেক আর যা যা বলেছেন তা এইরকম—
কেন্দ্রীয় বঞ্চনার বিষয়টি মানুষকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে, তা ভুলে গেলে চলবে না।
দলের ‘রিপোর্ট কার্ড’ সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে।
দীর্ঘদিন জনসংযোগে না থাকা বিরোধীরা এখন ধর্মের রাজনীতি করছে—এই বিষয়টি মানুষকে বোঝাতে হবে।
রাজ্য সরকারের প্রকল্প ও কেন্দ্রের নীতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে মানুষের কাছে।
রাজ্য সরকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, আর কেন্দ্রের সরকার মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছে—এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।
লক্ষ্মীর ভান্ডার-এর মতো প্রকল্প অন্য কোনও বিজেপি-শাসিত রাজ্যে নেই—এটি তুলে ধরতে হবে।
আয়ুষ্মান ভারতের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে ‘স্বাস্থ্যসাথী’-র তুলনামূলক সুবিধা মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে।
অন্তত তিনবার করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে, আত্মতুষ্টি থাকলে চলবে না।
তৃণমূল সরকার থাকলে লক্ষ্মীর ভান্ডার চালু থাকবে—এই আশ্বাস মানুষকে দিতে হবে।
কেন্দ্রীয় বঞ্চনা সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করছে, ঘর করে দিয়েছে—এই বার্তাও পৌঁছে দিতে হবে।
‘দিদির ১০ প্রতিজ্ঞা’ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপর জোর।
প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার তুলনা টেনে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদীর বেশভূষা, থাকা খাওয়া, চাল চলন বদলে গেছে। দিদি এখনও টালির চালের বাড়িতেই থাকেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে কেন্দ্রকে আক্রমণ করতে হবে।
বুথ সভাপতিদের নির্দেশ—কাউন্সিলরের ফোনের অপেক্ষা না করে নিজে থেকে মানুষের কাছে যেতে হবে।
বিজেপি বাংলার ঐতিহ্য-সংস্কৃতি বোঝে না—এই অভিযোগ তুলে প্রচার চালাতে হবে।
বিজেপিকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত দল’ হিসেবে মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, নারায়ণ রানে, শুভেন্দু অধিকারী-সহ একাধিক নেতাকে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত বলে সমালোচনা করতে হবে।
“এই বাংলা মাথা নত করবে না”—এই বার্তা দিয়ে কলকাতার মধ্যে ভবানীপুরকে প্রথম করার ডাক দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।





