RK NEWZ পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ কেন? আসলে কেন পশ্চিমবঙ্গ তৈরি হয়েছিল তা স্মরণ করা একান্তই জরুরি এবং এজন্যই ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন। পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি নিয়ে এক ধরনের লজ্জায় ভোগে বাঙালি সেকুলার ‘বুদ্ধিজীবী’গণ। তাদের নিয়ন্ত্রিত ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংবাদে এমন ধারণাই বাঙালির মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ একটি বড় অন্যায়। ২০ জুন, ১৯৪৭। পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সদস্যরা ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে ও পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে ভোট দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ গঠন সুনিশ্চিত করেন। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মীয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে অঞ্চল বিভাজনের মধ্য দিয়ে। ‘পশ্চিমবঙ্গ’ মানে বাঙালি হিন্দুর ‘হোমল্যান্ড’, হিন্দুর নিরাপদ অস্তিত্ব, ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও নারীর নিরাপত্তা। আর-একটি নতুন দিবস? অনেকের কাছে এটাই প্রথম প্রশ্ন, তাহলে কি পরিবর্তনের নতুন হুজুগ। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ঘোষণা করেছে সব সরকারি দপ্তরে, কলেজে, বিদ্যালয়ে ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করতে হবে। সত্যি বলতে কী, পশ্চিমবঙ্গবাসী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী থেকে আমজনতা, দীর্ঘদিন জানতেনই না যে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যের– যেমন, বিহার, ওড়িশা, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কেরলম, ছত্তিশগড়, রাজস্থানের আলাদা ‘রাজ্য দিবস’ রয়েছে। এসব রাজ্যে এসব ‘দিবস’ উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ উদ্যাপন শুরু হচ্ছে। প্রকাশ্যে শুরু হয় ২০১৪ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ নামক চিন্তাগোষ্ঠী আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান দিয়ে। এরপর বিজেপির উদ্বাস্তু সেল তাদের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ নিয়মিত পালন শুরু করে। ২০২১ সাল থেকে এর নেতৃত্ব দেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি গত চার বছর ধরে বিধায়কদের নিয়ে সদলে কলকাতা ময়দানে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তির পাদদেশে দিনটি পালন করছিলেন। ফলে বিষয়টি আলোচিত হতে শুরু করে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন তড়িঘড়ি তাঁর বশংবদদের নিয়ে পয়লা বৈশাখকে ‘রাজ্য দিবস’ ঘোষণা করে দেন। আর যে কোনও দিন হোক, ২০ জুনকে করা যাবে না, এটি ছিল বাম মহলেরও মত। ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ কেন? আসলে কেন পশ্চিমবঙ্গ তৈরি হয়েছিল তা স্মরণ করা একান্তই জরুরি এবং এজন্যই ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন। পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি নিয়ে এক ধরনের লজ্জায় ভোগে বাঙালি সেকুলার ‘বুদ্ধিজীবী’গণ। তাদের নিয়ন্ত্রিত ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংবাদে এমন ধারণাই বাঙালির মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ একটি বড় অন্যায়। একটা বড় মত হল: ওসব ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি দাঙ্গার ইতিহাস ভুলে থাকাই ভালো, এখন আমরা সবাই একই বৃন্তে দু’টি কুসুম। ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে উদ্বাস্তু আছে, দারিদ্র আছে, কিন্তু কেন ‘উদ্বাস্তু’ হতে হল, কাদের হিংস্র আক্রমণে তা ঘটল, কেন পশ্চিমবঙ্গেই তারা এল– এসব কথা বলতে নেই, থাকতে নেই।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়, এটি বাঙালি হিন্দুর অস্তিত্বরক্ষার একটি ভাবনা। ১৯৪৭ সালে এল ভারত-ভাগের পর্ব। যুক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৫% মুসলমান চেয়েছিল বাংলার পাকিস্তানে যোগদান। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হওয়া কলকাতার বীভৎস দাঙ্গা, তারপর অক্টোবরে নোয়াখালিতে হিন্দু গণহত্যার পরে, কেউ মুসলমান-শাসিত বাংলায় থাকার কথা ভাবতেই পারেনি। এই সময় বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাঙালি হিন্দুর ‘হোমল্যান্ড’ পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির জন্য এগিয়ে এলেন বাংলার মনীষীরা– ঐতিহাসিক ‘স্যর’ যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, ভাষাবিদ সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, মতুয়া গুরু প্রমথরঞ্জন ঠাকুর, পরবর্তী সময়ে বাংলার কংগ্রেস দল। ৪-৬ এপ্রিল, ১৯৪৭। তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত হল বাংলা বিভাজনের জন্য বিশাল হিন্দু জনসভা। ১৯৫১-র জনগণনায় পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান ছিল ১৯ শতাংশ এবং পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু ছিল। ২২ শতাংশ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান ৩০ শতাংশ, এবং বাংলাদেশে হিন্দু মাত্র ৭ শতাংশ। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম নির্মম জাতি-বিতাড়ন বিরল। এই অনুপ্রবেশের প্রধান কারিগর সিপিএম, পরে তৃণমূল কংগ্রেস। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গ ধর্মীয় জনসংখ্যায় ইতিমধ্যে বিপন্ন। একের পর এক মৌলবাদী আক্রমণে, হিংসায় পশ্চিমবঙ্গ রক্তাক্ত, কামদুনি থেকে সন্দেশখালি হিন্দু নারীরা ধর্ষিতা, আক্রান্ত। বাম শাসন ও তৃণমূল শাসনে পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ ‘পশ্চিম বাংলাদেশ’ হওয়ার দিকে এগচ্ছিল। ৪ মে-র পরে আপাতত তা রুদ্ধ। এই প্রতিরোধ সব স্তরে ছড়িয়ে পড়ার জন্য ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন। যে-জাতি ইতিহাস ভুলে যায়, সেই ইতিহাস তাদের আবার গ্রাস করে। ‘হোমল্যান্ড’ না থাকলে উদ্বাস্তুরা হারিয়ে যায়– যেমন, ধনী উদ্বাস্তু পারসি বা সিন্ধিরা হারিয়ে যাচ্ছে, কাশ্মীরি হিন্দু উদ্বাস্তুরা হারাচ্ছে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি। ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন শুধু ইতিহাস চর্চা নয়, পশ্চিমবঙ্গকে পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। এই ইতিহাস পাঠ্য করতে হবে বিদ্যালয়ে, কলেজে। এই লড়াইয়ে হারার কোনও স্থান নেই, কারণ এটি পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্বের লড়াই।
বঙ্গীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ডা. বিধানচন্দ্র রায়, ড. প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুমার দেবেন্দ্রলাল খান-সহ প্রত্যেকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে সমর্থন করেন। ২২ এপ্রিল ১৯৪৭, তৎকালীন বাংলার সর্বপ্রধান সংবাদপত্র ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ জনমত সমীক্ষা প্রকাশ করে, যাতে দেখা গিয়েছিল যে, ৯৮.৬ শতাংশ হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবিকে সমর্থন করেছিল। মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবিতে ‘হিন্দু মহাসভা’ এবং কংগ্রেসের যৌথ উদ্যোগে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়, যার সভাপতিত্বে ছিলেন প্রবাদপ্রতিম ইতিহাসবিদ ‘স্যর’ যদুনাথ সরকার। এরপরে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবিতে সারা প্রদেশ জুড়ে ৭৬টি জনসভা হয়। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভা বাংলা ভারত বা পাকিস্তান যোগদানের প্রশ্নে একমত হল না। তখন হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে হল পশ্চিমবঙ্গ আইন সভা ও মুসলমানপ্রধান অঞ্চল নিয়ে হল পূর্ববঙ্গ আইন সভা। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সমস্ত হিন্দু সদস্য, এমনকী বামপন্থী দলেরাও পশ্চিমবঙ্গের পক্ষেই ছিলেন। ও-দিনেই পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সদস্যরা ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে ও পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে ভোট দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ গঠন সুনিশ্চিত করেন। এরপর ৩ জুলাই ১৯৪৭, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। হিন্দু বাঙালি নিজের অস্তিত্বের স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ স্থাপন করেছে। ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করে পশ্চিমবঙ্গকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘হিন্দু হোমল্যান্ড’ হিসাবে। অনেকেই মনে করতে পারেন, সেসব হয়ে গিয়েছে অনেক আগে, এখন ২০ জুনকে স্মরণ করিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালনের কি প্রয়োজন আছে? আছে। ‘পশ্চিমবঙ্গ’ মানে বাঙালি হিন্দুর ‘হোমল্যান্ড’, হিন্দুর নিরাপদ অস্তিত্ব, ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও নারীর নিরাপত্তা। মনে রাখতে হবে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল ধর্মীয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে অঞ্চল বিভাজনের মধ্য দিয়ে। গত আট দশকে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির মূল ভিত্তিকেই ভঙ্গুর করে দিয়েছে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর প্লাবন। প্লাবন এতটাই যে, এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান/ বাংলাদেশ থেকে লক্ষ-লক্ষ হিন্দু উদ্বাস্তুর আগমনে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যায় হিন্দুর শতাংশ অনেক বেড়ে যাওয়া উচিত ছিল।





