অপেক্ষা আর মাত্র কিছুক্ষণের। বঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ শেষে শনিবার প্রকাশিত হবে চূড়ান্ত তালিকা। গোটা পদ্ধতিতেই এমন কিছু জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমজনতাকে যে সকলেই দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করছেন, তালিকায় নিজের নামটা থাকে কিনা। এই পরিস্থিতিতে তালিকা প্রকাশের ঠিক আগের দিন নির্বাচন কমিশন এনিয়ে মুখ খুলল। এখনও পর্যন্ত পাওয়া হিসেব অনুযায়ী, আপাতত চূড়ান্ত তালিকায় অতিরিক্ত ৯ লক্ষের নাম বাদ পড়তে চলেছে। অর্থাৎ খসড়া তালিকায় যে ৫৮ লক্ষের নাম বাদ পড়েছিল, চূড়ান্ত তালিকায় তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও ৯ লক্ষ। সবমিলিয়ে আপাতত ৬৮ লক্ষ নাম বাতিল। এছাড়া, ৬০ লক্ষ ভোটারের তথ্যে অসংগতি মেলায় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই সব নামের পাশে লেখা থাকবে Adjudicated. পরবর্তীতে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা বেরলে এই নাম যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা। প্রকাশিত হবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা? কোথায় কীভাবে তা দেখা যাবে? এনিয়ে হাজার প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ নাগরিকদের। শুক্রবার সন্ধ্যায় কমিশনের তরফে জানানো হল, শনিবার দুপুরের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হতে পারে। তাতে নাম রয়েছে কি না, দেখা যাবে নির্বাচন কমিশনের অ্যাপ এবং ওয়েবসাইট থেকে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলিকে পেন ড্রাইভে তালিকা দেওয়া হবে। এখনই বিএলও-দের কাছে তালিকা পাওয়া যাবে না। তবে বিডিও এবং এসডিও অফিসে তালিকা টাঙানো হবে। চূড়ান্ত তালিকা থাকবে জেলাশাসকের কার্যালয়েও। ইতিমধ্যে তালিকা ছাপানোর কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে বলে খবর। নাম দেখতে পাবেন দুটি ওয়েবসাইটে – https://ceowestbengal.wb.gov.in , eci.gov.in এবং ECINET অ্যাপে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটটি খুলে প্রথমে দেখতে পাবেন সার্চ ইন ইলেক্টোরাল রোল। তাতে নিজের ভাষা সিলেক্ট করতে হবে। এর নিচেই রয়েছে দুটি শূন্যস্থান পূরণের মতো জায়গা। একটিতে দিতে হবে আপনার EPIC নম্বর, আরেকটিতে রাজ্যের নাম। এসব পূরণের পর নিচে ক্যাপচা কোড দেওয়া। সেটি দেখে পাশের ফাঁকা জায়গায় সঠিকভাবে টাইপ করতে হবে। এরপর সার্চ অপশনে গেলেই দেখা যাবে আপনার নাম এবং অবস্থা। অর্থাৎ আপনার নামের পাশে Adjudicated থাকলে বুঝতে পারবেন যে আপনার নাম চূড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই পাওয়ার বিষয়টি এখনও বিচারাধীন। এপিক নম্বর যদি মনে না থাকে, সেক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে গিয়ে আরেকটি অপশন পাবেন আপনি। সেখানে আপনার নাম, পরিচয়-সহ বিস্তারিত ফর্ম পূরণ করে তবেই নিজের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে কিনা, তা দেখতে পাবেন।
নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত বুথ লেভেল এজেন্টরা (বিএলও) বাড়ি বাড়ি পৌঁছে এনুমারেশন ফর্ম দেওয়া শুরু করেছিলেন গত বছর ৪ নভেম্বর। তার পরে নানা প্রক্রিয়া, ঘাত-প্রতিঘাত, মামলা-মোকদ্দমা, রাজনৈতিক আকচাআকচি, নিয়মের ওলটপালট পেরিয়ে শনিবার প্রকাশিত হতে চলেছে এসআইআরের চূড়ান্ত তবে অসম্পূর্ণ তালিকা। তালিকা অসম্পূর্ণ থাকলেও শনিবারই অনেকটা স্পষ্ট হবে, কাদের নাম ভোটার তালিকায় থাকছে আর কাদের নাম বাদ যাচ্ছে। তার আগে ১১৬ দিন (৩ মাস ২৩ দিন) ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলন করেছে শাসক তৃণমূল। গত ১১৬ দিন ধরে তৃণমূল যে ধারায় এসআইআর আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে, তাতে সংবিধানরক্ষার বৃহত্তর বার্তা এবং বাংলা-বাঙালির ‘লাইন’ স্পষ্ট। তৃণমূলের নবীন-প্রবীণ সব নেতাই একান্ত আলোচনায় মানছেন, ভোটার তালিকায় দলীয় ভোটের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা স্পষ্ট হবে তালিকা প্রকাশের পরে। কিন্তু এই পর্বে লাভও কম হয়নি। পাশাপাশিই অনেকে মানছেন, তালিকা প্রকাশের আগে বেশ কিছু ক্ষতিও হয়ে গিয়েছে।লাভের সঙ্গে ক্ষতিও আছে। তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে তৃণমূলে। অনেকের বক্তব্য, লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে এমন গোটা ৫০ আসন রয়েছে, যেখানে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল সামান্যই। এসআইআরের পরে সেই সমস্ত কেন্দ্রে ভোটের হিসাব ঘেঁটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও তৃণমূলের ‘আশাবাদী’ অংশের বক্তব্য, কার কত নাম বাদ গেল, তা তালিকা প্রকাশ না-হলে বোঝা মুশকিল। তা-ই আগে থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করার কিছু নেই। তাঁদের পাল্টা এ-ও যুক্তি যে, এমন অনেক বিধানসভা রয়েছে, যেখানে বিজেপি গত লোকসভা ভোটে কম ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। এমন তো নয় যে, ভোটার তালিকা থেকে শুধু তৃণমূলের ভোটারদেরই নাম বাদ যাবে। গোড়া থেকেই নির্বাচন কমিশনকে তাদের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসাবে উপস্থাপিত করেছে তৃণমূল। সে ক্ষেত্রে সংগঠনের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। অনুপ্রবেশের কারণে পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে গিয়েছে, তা ঠিক করতে না-পারলে পশ্চিমবাংলার কোনও ভবিষ্যৎই নেই। এই জনবিন্যাস বদলের প্রশ্নে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে মুসলিম অনুপ্রবেশের তত্ত্বকে। তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, এই প্রচার ভোটারদের মননে ‘মেরুকরণ’ তৈরি করে দিয়েছে। বিশেষত, উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকা এবং যে এলাকায় হিন্দু-মুসলিমের মিশ্র বসতি, সেখানে এই মেরুকরণের আবহ তীব্রতর হয়েছে। অন্যদিকে, নানা সূচকে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ করারও প্রয়াস জারি রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই মেরুকরণের আবহ নিয়ে কিঞ্চিৎ উদ্বেগে শাসকদলের অনেকে। শহর এলাকায় তাদের মূল শক্তি বস্তিবাসী, গরিব মানুষ। অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের মধ্যে বিজেপির প্রভাব বেশি। তৃণমূলের প্রতি আস্থাশীল সেই গরিব অংশের মানুষ এসআইআরে নথি জমা দেওয়ার কাজ কতটা করে উঠতে পেরেছেন, তা নিয়ে বেশ কিছু জায়গায় সংশয় তৈরি হয়েছে। সেই নিরিখেই শাসকদলের অনেকের আশঙ্কা, শহরাঞ্চলে ভোটের সময় কী সমীকরণ হবে তা এখনই বলা মুশকিল। শহরাঞ্চলে এসআইআরের প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে হিসাবনিকাশও শুরু হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের ‘টেস্ট পরীক্ষা’।





