তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশের সামনে ঝুলে আছে বেকারত্বের খাঁড়া। ভারতের বাজারে ২৬ শতাংশ চাকরিতে প্রভাব ফেলতে পারে এআই। সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে প্রাথমিক স্তরের কর্মচারীরা, যাঁরা সদ্য পরীক্ষায় পাশ করে চাকরির বাজারে পা রেখেছেন। মূলত তাঁদের কাজগুলিই এআই-এর মাধ্যমে সহজে করে ফেলা যাচ্ছে। বিশ্ব জুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বাড়়বাড়ন্ত ইতিমধ্যেই চাকরির বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বহুজাতিক সংস্থাগুলি কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটছে। নিঃশব্দে বেড়ে চলেছে বেকারত্ব। পরিস্থিতি আঁচ করে তড়িঘড়ি এ নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার (আইএমএফ)। তাতে দেখা গিয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে এআই-এর গ্রাসে চলে যেতে পারে সারা বিশ্বের ৪০ শতাংশ চাকরিই! ভারতের মতো ‘উন্নয়নশীল’ দেশে নয়, এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে আমেরিকা, কানাডার মতো ‘উন্নত’ দেশগুলিতে। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে এআই নিয়ে সতর্ক করেছেন। সমীক্ষার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছেন, ভারতের বাজারে ২৬ শতাংশ চাকরিতে প্রভাব ফেলতে পারে এআই। সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে প্রাথমিক স্তরের কর্মচারীরা, যাঁরা সদ্য পরীক্ষায় পাশ করে চাকরির বাজারে পা রেখেছেন। মূলত তাঁদের কাজগুলিই এআই-এর মাধ্যমে সহজে করে ফেলা যাচ্ছে। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনার মতে, ভারত-সহ সারা বিশ্বের চাকরির বাজারে সুনামির মতো প্রবল ধাক্কা মারতে চলেছে এআই। ইতিমধ্যেই ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করেছে। সমীক্ষা বলছে, উন্নত দেশগুলিতে চাকরি যেতে পারে ৬০ শতাংশ মানুষের। তাই সঠিক নীতি গ্রহণ না করলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই স্রোতে সকলের আগে ভেসে যাবে অভিজ্ঞতাহীন তরুণ প্রজন্ম। ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র। এখানে চাকরির বাজারও বিশাল। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী চাকরির বাজারে পা রাখছেন। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৩-’২৪ সালেই ১ কোটি ৯০ লক্ষ তরুণ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। ক্রিস্টালিনা মনে করেন, এআই-এর গতি রোধ করার কোনও উপায় নেই। বরং তাকে আপন করে নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এআই-কে প্রয়োগ করা গেলে শাপে বর হতে পারে! ভারতের জি়ডিপি বছরে ০.৭ শতাংশ করে বৃদ্ধি করতে পারে এআই এবং এআই ভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি। এআই-সুনামির ধাক্কা সামলানোর একমাত্র উপায় এআই-কেই কাজে লাগানো। যাঁরা প্রযুক্তি সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারবেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এগিয়ে থাকবেন তাঁরাই। ২০১৬ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত রেডিয়োলজিস্ট কার্টিস ল্যাংলট্জ বলেছিলেন, এআই রেডিয়োলজিস্টদের জায়গা নিতে পারবে না। তবে যে রে়ডিয়োলজিস্টরা এআই ব্যবহার করেন, তাঁরা যাঁরা এআই ব্যবহার করেন না তাঁদের জায়গা কেড়ে নেবেন। একই কথা অন্য যে কোনও পেশার ক্ষেত্রেও খাটে। এআইকে ভয় না পেয়ে, নিজের কাজটাই কী ভাবে এআই ব্যবহার করে আরও উন্নত করে তুলতে পারা যায়, সেটা দেখতে হবে।
এআই-এর মোকাবিলার জন্য স্কুল-কলেজ স্তরে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন। এত দিন যে শিক্ষাব্যবস্থা চলে এসেছে, তা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আর গ্রহণযোগ্য নয়। যে কাজগুলি এআই করতে পারে না, সেগুলি ছাত্রছাত্রীদের আরও বেশি করে শেখাতে হবে। এমসিএ বা বিই ডিগ্রি নিয়ে প্রতি বছর বহু ছাত্রছাত্রী প্রোগ্রামিংয়ের কাজ করতে আসেন। এখন সেই কাজগুলি এআই অনেক কম সময়ে অনেক নির্ভুল ভাবে করে দিচ্ছে। বড় বড় সংস্থায় এই ধরনের কাজ এআই দিয়েই হচ্ছে। আলাদা করে আর নিয়োগ করা হচ্ছে না। এর জন্য কলেজ স্তরে শিক্ষাব্যবস্থায় বদল চাই। প্রোগ্রামিংয়ের উপর বেশি নির্ভর করলে চলবে না। বরং প্রোগ্রাম তৈরির জন্য যে অঙ্ক লাগে, সহজে যেটা এআই বানাতে পারে না, সেটা শিখতে হবে। আগামী দিনেও চাকরি হবে, কিন্তু তার ধরন বদলে যাবে। ভারতে যে ২৬ শতাংশ খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে করছে আইএমএফ, সুনামির ধাক্কা লাগলে তাঁদের ভবিষ্যৎ কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, চাকরির পরিবর্তিত বাজারের সঙ্গে তাঁদের মানিয়ে নিতেই হবে। অমিত মনে করেন, এই বিশেষ অংশের জন্য আলাদা করে ‘অ্যাডভান্সড প্রোগ্রামিং’-এর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। স্কুলেও সময়ের দাবি মেনে চাকরিমুখী কোর্স আনতে হবে। শুধু পুরনো চাকরি বাঁচানো নয়, নতুন চাকরি তৈরি করাও সময়ের দাবি। কারণ, যারা চাকরি দেয়, সেই সমস্ত বহুজাতিক সংস্থা নিজেদের লাভ ছাড়া আর কিছু দেখবে না। তাই তরুণ প্রজন্মকে নতুন ‘স্কিল’ শিখতে হবে। এআই ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারলে দেশেরই লাভ। তরুণ প্রজন্মের প্রয়োজন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর দক্ষতা এবং নমনীয় চিন্তাশক্তি। ভবিষ্যতের চাকরি হবে অনেকটা চলমান নদীর মতো। একদিকে কমবে, অন্যদিকে বাড়বে। যারা মানিয়ে নিতে পারবে, তারা টিকে থাকবে। এআই-সুনামিতে বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। নতুন প্রযুক্তি এলে এক দিকে যেমন চাকরি যায়, অন্য দিকে তেমন চাকরি আসেও। এ ক্ষেত্রেও তাই হবে। তার জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। কোন কোন চাকরি যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, এআই আসার ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে নতুন পদ, নতুন ভূমিকা তৈরি হতে পারে, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। যাঁরা এক দিকে চাকরি হারাবেন, তাঁরা যাতে অন্য দিকে চাকরি পান, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এটা সরকারি ভাবে করা দরকার। বেসরকারি উদ্যোগে লাভ হবে না। কী নীতি গ্রহণ করছি, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং নীতি থাকলে এআই নতুন শ্রমবাজার তৈরি করবে এবং লাখ লাখ মানুষকে অর্থনৈতিক পরিসরে তুলে আনবে। ভারতের নিজেদের মতো করে এআই মডেল তৈরি করা এবং ভারতীয় কনটেক্সটে তাকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
এআই নিয়ে উদ্বেগকে অনেকেই এখনও গুরুতর ভাবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কখনও ১০০ শতাংশ ভরসার জায়গায় পৌঁছোতে পারবে না। কেউ কেউ ততটা আত্মবিশ্বাসী না হলেও মনে করছেন, এআই-তে অনেক খামতি আছে। তবে খামতির দোহাইয়ে দুনিয়া থমকে থাকবে না। এআই এখনও ত্রুটিমুক্ত হয়নি। কিন্তু যে কোনও প্রযুক্তি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত, আরও উন্নত হয়। এআই-এর উৎকর্ষ ১০০ শতাংশ না হলেও সমস্যা নেই। সংস্থাগুলি নিজেদের লাভের কথা ভেবে তার উপরেই ভরসা রাখবে। প্রযুক্তি কবে ১০০ নির্ভুল হবে, তার পর তা আমরা ব্যবহার করব এ ভাবে দুনিয়া চলে না। তবে যে কোনও প্রযুক্তির নেপথ্যে মানুষের হাত থাকা প্রয়োজন। যন্ত্রের কারণে সমাজ থেকে মানুষের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে, মানতে নারাজ অমিতা। প্রযুক্তির উন্নতি সত্ত্বেও কিছু কিছু কাজে মানুষের কোনও বিকল্প নেই। আগামী দিনে যত চাকরি যাবে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন চাকরি তৈরিও হবে। প্রথম যখন ব্যাঙ্কিং সেক্টরে সব স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেল, আমাদের অনেক অসুবিধা হয়েছিল। এখন সেই পরিস্থিতি সামলেছে। এ ক্ষেত্রেও যাঁদের চাকরি হারানোর সম্ভাবনা আছে, তাঁদের পুনরায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। আগামী কিছু দিনের মধ্যেই আমরা আইএমএফ-এর সমীক্ষার প্রতিফলন চাকরির বাজারের প্রাথমিক স্তরে। মানুষের ভূমিকার কোনও বিকল্প নেই।এআই কোথায় কোথায় ভুল করছে, সেই তদারকির জন্যেই মানুষের দরকার। নৈতিকতা, মানবিকতা, ভাষাগত সূক্ষ্মতা এবং সামাজিক বোঝাপড়ার জায়গাগুলি মানুষেরই, প্রযুক্তি তার জায়গা নিতে পারবে না। এআই-কে সঠিক ভাবে কাজে লাগানোর জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রয়োজন। আইএসআই-এর স্বাগতম মনে করেন, সেই তথ্য আমাদের চারপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে। কিন্তু এখনও ডিজিটাল মাধ্যমে সেগুলি উঠে আসেনি। শুধু এই ‘তথ্য ডিজিটাইজেশন’-এর জন্যেই বিপুল লোকবল প্রয়োজন। আইএমএফ-এর সমীক্ষা শুধু চাকরি হারানোর গল্প নয়। একটা শ্রমবাজার থেকে আর একটা শ্রমবাজারে রূপান্তরের গল্প হিসাবে একে দেখা উচিত। অনেকের চাকরি যাবে। কিন্তু এর একটা উল্টো দিকও আছে। বিশ্ব যত ডিজিটাল হচ্ছে, তত তথ্যের প্রয়োজন বাড়ছে। তথ্যের গুণমানও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এআই আসলে এমন এক ইঞ্জিন, যার জ্বালানি হল তথ্য। জ্বালানি ছাড়া ইঞ্জিন চলবে না। এআই-এর জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য প্রয়োজন। বিশৃঙ্খল তথ্যকে একত্রিত করতে বিরাট লোকবল দরকার হতে চলেছে। তাতে অনেক চাকরি হবে। এআই নিয়ে আতঙ্ক যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে তার প্রচার অনেক বেশি। তবে এআই-এর বাণিজ্যিকীকরণ বিশ্ব জুড়ে কর্মপ্রবাহকে পুনর্গঠন করছে। ভারতেও আশু তৎপরতা প্রয়োজন। না হলে এ দেশে এআই ‘নিউ নর্মাল’ হতে পারবে না। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য বলে, এআই ব্যবহার করা ব্যবসার শেয়ার ২০২২ সালে ৫৫ শতাংশ ছিল, এখন নাটকীয় ভাবে তা বেড়ে হয়েছে ৮৮ শতাংশ। এর থেকে একদিকে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, আবার চাকরি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। প্রাথমিক স্তরের কর্মীরাই ভারতে কর্মব্যবস্থার মেরুদণ্ড। উদ্বেগ মূলত তাঁদের। এখন দেশের সরকার এই মেরুদণ্ডকে বাঁচাতে এআই-কে কতটা কাজে লাগাতে প্রস্তুত, সেটাই প্রশ্ন। এআই প্রযুক্তির উপযোগিতার পক্ষে ভারত এখনও পুরোপুরি তৈরি নয়, মনে করেন পূষণ। ডিজিটাল পরিকাঠামোর আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। পরিসংখ্যান দেখিয়ে তিনি জানিয়েছেন, প্রযুক্তির দিক থেকে ভারতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে তামিলনাড়ু। তার পরেই রয়েছে কর্নাটক এবং মহারাষ্ট্র। আবার ডিজিটাইজ়েশনে এগিয়ে যথাক্রমে দিল্লি, কেরল, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানা। চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, পুণের আইটি হাবগুলিকে কাজে লাগিয়ে এআই উপযোগী পরিকাঠামো অবিলম্বে গড়ে তুলতে পারলেই সমস্যার অনেকটা সমাধান হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নতিই কাম্য। মানুষের কাজ কমিয়ে দেয় যন্ত্র। কিন্তু এআই মানব সভ্যতাকে আশীর্বাদ ও অভিশাপের এমন এক সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদেরও ভাবিয়ে তুলছে। প্রযুক্তিকে বর্জন কোনও সমাধান হতে পারে না। তার জন্য তৈরি-হওয়া সঙ্কট কাটাতেও সেই প্রযুক্তিকেই কাজে লাগাতে হবে। তবেই আসন্ন অন্ধকারে আলোর দিশা খুঁজে পাবে তরুণ প্রজন্ম।





