Saturday, May 2, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

‘মানি ইজ দ্য পেট্রল অফ লাইফ’!‌ ‘মানুষ হওয়া কাকে বলে?’ খাঁটি মানুষের খোঁজেই গিয়েছেন রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ বা প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কাছে

পিপাসার্তের মতো আবিষ্কার করতে চেয়েছেন জীবন, মানুষ ও সমাজকে, সর্বোপরি নিজের জাতিকে, উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে। বাঙালিকে যেমন তিনি ভালবেসেছেন, বাঙালিও সেই ভালবাসা তেমন করেই ফিরিয়ে দিয়েছে। বাঙালির হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে গিয়েছে তাঁর গভীর, সত্যনিষ্ঠ, পরিশ্রমী, অনুসন্ধানী ও দায়বদ্ধ রচনাগুলি, সময়কে তুচ্ছ করেই। উত্তর-ঔপনিবেশিক বাঙালি জীবনে মনুষ্যত্বের চরম অবমাননা দেখেছিলেন শংকর। বিভিন্ন উপন্যাসে ঘুরেফিরে এসেছে একটাই প্রশ্ন, ‘মানুষ হওয়া কাকে বলে?’ এই খঁাটি মানুষের খেঁাজেই বারবার তিনি গিয়েছেন রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ বা প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কাছে। ‘তীরন্দাজ’ উপন্যাসে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, মানুষের নিজস্ব ঐশ্বর্য কবে আমাদের চোখে ধরা দেবে? এই ঐশ্বর্যকেই তিনি খুঁজে গিয়েছেন আজীবন। তিনি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে এসেছেন, ‘নিজের অন্ন নিজে জুটিয়ে নেবার ব্যবস্থা করাই মানুষ হবার প্রাথমিক পদক্ষেপ। নিজের পায়ে না-দাঁড়ালে মনুষ্যত্ব থাকে না।’ জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই তাঁর উপন্যাসগুলির কাছে বারবার আশ্রয় চেয়েছেন পাঠক। চিন্তাশীল হৃদয়ের জন্য সহজ আবেদনের কথাসাহিত্যই রচনা করতে চেয়েছেন শংকর। সেজন্য রচনাগুলি সুখপাঠ্য। গল্প বলার মুনশিয়ানায় অনবদ্য। গল্পের পরতে পরতে তিনি রহস্য এবং নাটকীয়তা সৃষ্টি করতে জানেন। নানা চমক ও অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করে থাকে সেখানে। তাঁর রয়েছে গভীর পর্যবেক্ষণশক্তি। বালজাক যেমন ফরাসি সমাজকে, তিনিও তেমনই বাঙালি সমাজকে অনুপুঙ্খভাবে ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়েছেন। এই সমাজ, বাঙালির মনস্তত্ত্ব এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে, নানা দিক থেকে আলো ফেলে দেখিয়েছেন। বাঙালি-জীবন মূলত চাকরিনির্ভর। কর্মস্থলই নিজের অন্ন নিজে জুটিয়ে নেওয়ার জায়গা। অথচ মানুষ সেখানে অত্যন্ত শ্রেণিসচেতন হয়ে ওঠে। কে অফিসার, কে কেরানি, কে বেয়াড়া– পদমর্যাদা অনুযায়ী সবকিছু আলাদা হয়ে যায়। আলাদা বসার জায়গা, আলাদা টয়লেট, আলাদা খাওয়ার ঘর। শংকর তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে বারবার এই কর্মস্থলের ছবি এঁকেছেন। বাঙালির কর্মজীবনে যে কত গ্লানি, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা লুকিয়ে আছে, তার ছবি অঁাকতে চেয়েছেন! তাঁর রচনা যেন বাঙালি পাঠকের কাছে আয়নার মতো হয়ে উঠেছে। ‘বিকল্প’ রূপে শংকর বিজনেসের কথা বলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ‘মানি ইজ দ্য পেট্রল অফ লাইফ’। গাড়ি যতই ভাল হোক, পেট্রোল না থাকলে তার কোনও মূল্য নেই। ‘পাওয়ার ফ্লোজ ফ্রম দ্য মানিব্যাগ’। এই অর্থোপার্জনের জন্য বাঙালিকে চাকরির পাশাপাশি স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার কথাও ভাবতে হবে। কারণ, ‘বিজনেস মেকস আ ম্যান বিগ’। সাহিত্যের পটভূমিতে তিনিই প্রথম বিজনেস এবং কর্পোরেটের আন্তঃসম্পর্কের কথা লিখতে শুরু করলেন। বাঙালি পাঠকের চোখে যেন এক অজানা জগৎ দৃশ্যমান হল।

শংকরের লেখায় বারবার এসেছে সমকাল এবং বাঙালি জীবনের নানা সংকটের কথা। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়, শংকরের আর-একটি বহুলপঠিত ট্রিলজি উপন্যাস ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতাল’। এই উপন্যাস ত্রয়ীর সূচনা সাতের দশকের গোড়ায়। লেখাপড়া শিখে, কত স্বপ্ন কত আশা নিয়ে লাখ-লাখ স্বাস্থ্যবান ছেলে চুপচাপ ঘরে বসে আছে, আর মাঝে মাঝে কেবল দরখাস্ত লিখছে। তিনজন যুবকের চোখ দিয়ে তাদের সুখ-দুঃখ, ন্যায়-অন্যায় ও মান-অপমানের অকথিত কাহিনিকে তুলে ধরেছেন শংকর। এর মধ্যে দু’টি উপন্যাস, ‘জন অরণ্য’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’ নিয়ে সিনেমা করেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। শংকর অসম্ভব গুরুত্ব দিতেন যুক্তি এবং বিজ্ঞানকে। তিনি মনে করতেন, এ-দেশের সাধারণ মানুষকে যেমন বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহী হতে হবে, তেমনই যারা বিজ্ঞানচর্চা করছে, তাদেরও নিজের দেশকে জানতে হবে। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় শংকরের উপন্যাস ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’। এই বইটি লেখার সময় দেড়শো পরজীবী পরাশ্রয়ী পতঙ্গের নাম সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন একজন বিজ্ঞানসাধকের কথা। ‘আশা-আকাঙ্ক্ষা’ উপন্যাসে রয়েছে তরুণ বৈজ্ঞানিক কমলেশের কথা, যে কঠোর পরিশ্রম করে সার উৎপাদন পদ্ধতিকে সাফল্যে পৌঁছে দিতে পেরেছে। ‘সুবর্ণ সুযোগ’ উপন্যাসে শিবসাধন চৌধুরী দেশে ফিরে এমন এক মোটর পাম্প উদ্ভাবনের চেষ্টা করে যেটা আবিষ্কার হলে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামবাংলার অগণিত চাষির কষ্ট ঘুচে যাবে।

‘আমি বারবার আবিষ্কারকের মন নিয়ে এগিয়ে গেছি অপ্রচলিত গল্পের সন্ধানে। নতুন নতুন পটভূমিতে আশ্চর্য সব চরিত্রদের উপস্থাপিত করতে চেয়েছি।’ লিখেছিলেন সদ্যপ্রয়াত, বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাশিল্পী শংকর। তাঁর ছিল বিপুল পাঠকপ্রিয়তা। নিজেও মনে করতেন, ‘পাঠকই আমার জীবনদেবতা।’ দীর্ঘ লেখক-জীবনের গোড়া থেকেই শংকর বাঙালি পাঠকের মন জয় করে নিয়েছেন। ১৯৫৪ সাল থেকে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে তাঁর প্রথম বই– ‘কত অজানারে’। বইটির নামকরণ করেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। বইটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। কলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে স্টেনোটাইপিস্টের চাকরি পেয়েছিলেন ১৯ বছরের শংকর। সেই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই লেখা হয়েছিল এই বই। পিতৃদত্ত নাম, মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। জন্ম অবিভক্ত ভারতের যশোর জেলার বনগ্রামে, ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর। ১৯৪৭ সালে বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায়ের অকালমৃত্যুর পর মা অভয়ারানি সংসারের হাল ধরেন। আট ভাই-বোনের সংসারে তখন প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থা। একটা চাকরির জন্য তখন পাগলের মতো পথে পথে ঘুরেছেন। কখনও পথের ফেরিওয়ালা, কখনও টাইপরাইটার ক্লিনার, কখনও প্রাইভেট টিউশনি, কখনও শিক্ষকতা– নানা ধরনের কাজ করেছেন। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আবিষ্কার করেছেন মানুষ ও সমাজকে। শেষ পর্যন্ত প্রথম বই তঁাকে এনে দিয়েছে বিপুল সাফল্য। ‘কত অজানারে’ বইতে যে ট্রিলজির সূচনা, তা শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণতা পায়, পরবর্তী দু’টি খণ্ডে: ‘চৌরঙ্গী’ এবং ‘ঘরের মধ্যে ঘর’। ১৯৬২ সালের ১০ জুন প্রকাশিত হয় ‘চৌরঙ্গী’, শংকরের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উপন্যাস। ঠিক ওদিনই তাঁর বিয়ে। মফস্‌সলের ছেলে শংকর চৌরঙ্গির হোটেল শাহজাহানে কাজ করতে এসে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, তা নিয়েই এই আখ্যান। ‘ঘরের মধ্যে ঘর’ উপন্যাসে কপর্দকহীন, আশ্রয়হীন যুবক শংকর থ্যাকারে ম্যানসনের ম্যানেজার হিসাবে চাকরিতে যোগ দেয়। এই ট্রিলজি উপন্যাসে বিশাল ক্যানভাসে অজস্র চরিত্রের সমাবেশে শংকর কলকাতা শহর এবং নাগরিক জীবনের এক বর্ণাঢ্য ছবি তুলে ধরেছেন। শংকরের লেখায় বারবার এসেছে সমকাল এবং বাঙালি জীবনের নানা সংকটের কথা। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়, শংকরের আর-একটি বহুলপঠিত ট্রিলজি উপন্যাস ‘স্বর্গ মর্ত্য পাতাল’। এই উপন্যাস ত্রয়ীর সূচনা সাতের দশকের গোড়ায়। লেখাপড়া শিখে, কত স্বপ্ন কত আশা নিয়ে লাখ-লাখ স্বাস্থ্যবান ছেলে চুপচাপ ঘরে বসে আছে, আর মাঝে মাঝে কেবল দরখাস্ত লিখছে। তিনজন যুবকের চোখ দিয়ে তাদের সুখ-দুঃখ, ন্যায়-অন্যায় ও মান-অপমানের অকথিত কাহিনিকে তুলে ধরেছেন শংকর। এর মধ্যে দু’টি উপন্যাস, ‘জন অরণ্য’ এবং ‘সীমাবদ্ধ’ নিয়ে সিনেমা করেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়।
‘বিকল্প’ রূপে শংকর বিজনেসের কথা বলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ‘মানি ইজ দ্য পেট্রল অফ লাইফ’। গাড়ি যতই ভাল হোক, পেট্রোল না থাকলে তার কোনও মূল্য নেই। ‘পাওয়ার ফ্লোজ ফ্রম দ্য মানিব্যাগ’। এই অর্থোপার্জনের জন্য বাঙালিকে চাকরির পাশাপাশি স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার কথাও ভাবতে হবে। কারণ, ‘বিজনেস মেকস আ ম্যান বিগ’। সাহিত্যের পটভূমিতে তিনিই প্রথম বিজনেস এবং কর্পোরেটের আন্তঃসম্পর্কের কথা লিখতে শুরু করলেন। বাঙালি পাঠকের চোখে যেন এক অজানা জগৎ দৃশ্যমান হল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles