দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলার দলীয় কার্যালয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে তৃণমূলে যোগ দিলেন প্রতীক উর রহমান। বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের আগে একদা বাম যুবনেতার দলবদলে তোলপাড় রাজনৈতিক মহল। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্র থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেই লড়েছিলেন তিনি। ঘটনাচক্রে বছর দুয়েক পর সেই ‘বিরোধী’ অভিষেকই হলেন রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। শনিবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে আমতলার দলীয় কার্যালয়ের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তৃণমূলে যোগ দিলেন প্রতীক উর রহমান। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তাঁরা। বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের আগে একদা বাম যুবনেতার দলবদলে তোলপাড় রাজনৈতিক মহল। শোনা যাচ্ছিল তৃণমূলের এক সাংসদের সঙ্গে নাকি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন প্রতীক। তাঁর সঙ্গে নানা ‘আড্ডাক্ষেত্রে’ও দেখা যাচ্ছে। সমস্ত জল্পনায় সিলমোহর দিয়ে শনিবাসরীয় বিকেলে যেন বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। অভিষেকের হাত ধরেই তৃণমূলে যোগ প্রতীক উরের। এদিন বেলা ১২টা ৩৫ মিনিট নাগাদ আমতলার দলীয় কার্যালয়ে পৌঁছন অভিষেক। স্থানীয় দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে একপ্রস্থ বৈঠক করেন। বিকেলে প্রতীক উরের যোগদানের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অভিষেক। আরও দুই বাম যুবনেতা সৃজন ভট্টাচার্য এবং দীপ্সিতা ধরও নাকি জল মাপছেন। প্রতীক উরের দেখানো পথে হেঁটে তাঁরাও কি ভোটের মুখে দলবদলের সিদ্ধান্ত নেবেন, সে প্রশ্ন আপাতত রাজনীতির অলিন্দে ঘুরপাক খাচ্ছে। মুখে কিছু না বললেও আলিমুদ্দিনের বর্ষীয়ান নেতাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ক্রমশ চওড়া হচ্ছে।
প্রতীক উর কাঁটায় বিদ্ধ সিপিএম। ব্যাকফুটে আলিমুদ্দিন। সিপিএম ছাড়ার পর তৃণমূলে যোগ দিতে চলেছেন প্রতীক উর রহমান। এই নিয়ে কয়েকদিন ধরেই জল্পনা চলছে। প্রতীক উরকে নিয়ে এই টানাপোড়েন সিপিএম এবং সিপিএমের নতুন প্রজন্মের জয় দেখছেন দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। প্রতীক উর ইস্যুতে তিনি বলেন, “নতুন প্রজন্মের কোন নেতা বিজেপি-তৃণমূলের কাছে নেই। যা আছে ভাড়া করা। একমাত্র সিপিএম এটা গর্ব করে বলতে পারে, অরগানিক লিডারশিপ! আমরা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে নতুন প্রজন্ম তৈরি করি, সর্বস্ব ত্যাগ করে লড়াই করে।” সিপিএমের তরুণ নেতাদের টার্গেট করা, আসলে যে সিপিএমের নৈতিক জয়, সেটারও ব্যাখ্যা করলেন তিনি। বলেন, “তৃণমূলের নীতি নৈতিকতার প্রতিদিন যখন এত অধঃপতন, এত ধর্ষণ, খুন, গোলাগুলি, টাকা, বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকা, কাজেই নীতি নৈতিকতা রক্ষার জন্য এখন সিপিআইএম থেকে কারোর দরকার হয়ে পড়েছে। এটা সিপিআইএম আর সিপিআইএমের নতুন প্রজন্মের জয়।”
দলের ‘বিদ্রোহী’ যুবনেতা পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে নিশানা করে দলের বিরুদ্ধে একের পর এক বোমাবর্ষণ করেছেন। কীভাবে তাঁকে কোণঠাসা করা হয়েছিল, তাঁর কথা শোনার জন্য কেউ সময় দেয়নি তা সামনে এনেছে প্রতীক। আর বাম যুব আন্দোলনের উজ্জ্বল মুখ প্রতীক উরের কার্যত পাশেই দাঁড়িয়েছে বামফ্রন্টের শরিক দলের যুব নেতারাও। সিপিএমের আপত্তি থাকলে ফরওয়ার্ড ব্লকে আসার জন্য প্রতীক উরকে আহ্বান জানিয়েছেন যুবলিগের রাজ্য সম্পাদক স্বরূপ দেব। সিপিআইয়ের যুব নেতা সৈকত গিরির বক্তব্য, “গরিব-প্রান্তিক এলাকা থেকে উঠে আসা প্রতীক উর বাম ছাত্র-যুব আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিল। বাম আন্দোলনের অন্যতম সম্পদ সে। তাঁকে ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতা সার্বিকভাবে নেতৃত্বের নেওয়া উচিত।” আবার আরএসপির যুব সংগঠন আরওয়াইএফের প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক বর্তমানে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “প্রতীক উরের একট সংযত হওয়া উচিত। কিন্তু সিপিএমেরও উচিত বিষয়টি বেশিদুর যাতে এগিয়ে না যায়। আমাদের লক্ষ্যটা যাতে ধাক্কা না খায়।” ফরওয়ার্ড ব্লকের যুব সংগঠন যুবলিগের রাজ্য সম্পাদক স্বরূপ দেবের বক্তব্য, “প্রতীক উরের মতো নেতারা বামেদের সম্পদ। সিপিএম পার্টি যদি মনে করত তা হলে তার সঙ্গে কথা বলে মিটিয়ে নিলে লাভহত। প্রতীক উর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।” এরপরই ফরওয়ার্ড ব্লকের যুব নেতার আহ্বান, “প্রতীক উর চাইলে ফরওয়ার্ড ব্লকে আসতে আহ্বান করব। সম্মানের সঙ্গে যুবলিগে আমরা আহ্বান জানাব।” সিপিএমের বিদ্রোহী যুব নেতা প্রতীক উরের পাশে এভাবেই পুরোপুরিভাবে দাঁড়িয়েছেন বামফ্রন্টের দুই শরিক সিপিআই ও ফরওয়ার্ড ব্লকের যুব নেতা সৈকত গিরি এবং স্বরূপ দেব। আবার নরম মনোভাব দেখিয়েছেন সিপিআইয়ের প্রাক্তন যুব নেতা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ফলে প্রতীক উর প্রশ্নে শরিকরা সিপিএমকে পুরোপুরি সমর্থন না করায় আবার কিছুটা চাপে আলিমুদ্দিনও।





