Friday, April 24, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

লাল রঙের চামড়ার ব্রিফকেস!‌ ট্র্যাডিশন ভেঙে ইতিহাস সৃষ্টি?‌ ভারতীয় অর্থমন্ত্রীদের বাজেটের ‘বাক্স’?‌ ৭৫ বছরের ইতিহাস বদলাতে চলেছেন নির্মলা সীতারমণ

৭৫ বছরের ইতিহাস বদলাতে চলেছেন নির্মলা সীতারমণ। দেশের প্রথম মহিলা অর্থমন্ত্রী হিসাবে নবমবার বাজেট পেশ করতে চলেছেন নির্মলা সীতারমণ। সেটাই নজিরবিহীন। আর সেই নজিরবিহীন বাজেটে আরও এক নয়া নজির গড়তে চলেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে ৭৫ বছর ধরে চলে আসা ট্র্যাডিশন ভঙ্গ করতে চলেছেন। অর্থমন্ত্রীরা ব্যাগ হাতে বাজেটের বক্তৃতা করতে আসেন কেন? বাআরও বহু অভ্যাসের মতোই এই সংস্কৃতিও এ দেশ শিখেছে ব্রিটিশদের দেখেই। ব্রিটিশ চ্যান্সেলর উইলিয়াম ই গ্ল্যাডস্টোন ব্রিটেনের বাজেট ঘোষণার দিন একটি লাল রঙের চামড়ার ব্রিফকেস নিয়ে এসেছিলেন বক্তৃতা করতে। প্রতি বছর কেন্দ্রীয় বাজেট ঘোষণার সকালে সংসদের বাইরে একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়ান দেশের অর্থমন্ত্রী। গত ৬ বছর ধরে সেই ছবিতে থাকছেন দেশের বর্তমান অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। তার আগে যথাক্রমে অরুণ জেটলি, পীযূষ গোয়েল, পি চিদাম্বরম, মনমোহন সিংহ, প্রণব মুখোপাধ্যায় বা স্বাধীন ভারতের প্রথম অর্থমন্ত্রী সন্মুখম ছেট্টিও একই ভাবে বাজেট ঘোষণার আগে একটি বিশেষ ব্যাগ হাতে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সংসদে। বাজেট ঘোষণার জন্য স্বয়ং অর্থমন্ত্রীকেই জরুরি কাগজপত্রের ব্যাগ হাতে করে সংসদে ঢুকতে হবে। সে কাজ করে দেওয়ার মতো অনেক দায়িত্বশীল মানুষ চারপাশে থাকেনই। তা সত্ত্বেও বাজেটের দিন ব্যাগ হাতে নিয়ে যাওয়ার কাজটি করেন অর্থমন্ত্রী নিজেই। কারণ, আরও বহু অভ্যাসের মতোই এই সংস্কৃতিও এ দেশ শিখেছে ব্রিটিশদের দেখেই। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ চ্যান্সেলর উইলিয়াম ই গ্ল্যাডস্টোন ব্রিটেনের বাজেট ঘোষণার দিন একটি রাজপরিবারের প্রতীক দেওয়া লাল রঙের চামড়ার ব্রিফকেস নিয়ে আসেন বক্তৃতা করতে। সেই ব্রিফকেস পরে খ্যাতি পায় গ্ল্যাডস্টোন বক্স নামে এবং ব্রিটেনের প্রত্যেক বাজেট ঘোষণার দিনেই ওই ধরনের ব্রিফকেস নিয়ে আসা এক রকম ঐতিহ্যে পরিণত হয়। বাজেট কথাটাই এসেছে ফ্রেঞ্চ শব্দ বুগেট থেকে। যার অর্থ ছোট চামড়ার ব্যাগ। আঠারোশ‌ো শতকে ব্রিটেনের অর্থ বিষয়ক আধিকারিকেরা যখন বার্ষিক হিসাব-নিকাশের বক্তৃতা দিতে আসতেন, তখন তাঁদের বলা হত ‘ওপেন দ্য বুগেট’। যে বুগেট বা চামড়ার ব্যাগে রাখা থাকত আগামী বছরের বরাদ্দের হিসাব। সেখান থেকেই ব্যয় বরাদ্দের নামও হয় বাজেট। এ দেশে প্রথম ওই প্রথা নিয়ে আসেন স্বাধীন ভারতের প্রথম অর্থমন্ত্রী সন্মুখম। তিনি গ্ল্যাডস্টোন বক্সের মতোই লাল চামড়ার ব্রিফকেস নিয়ে হাজির হন সংসদে। তার পর থেকে সেই ঐতিহ্য সমানে চলেছে। যদিও নানা সময়ে বাজেটের ব্যাগের ভোল বদলেছে। সম্মুখম লাল রঙের চামড়ার ব্রিফকেস নিয়ে গ্ল্যাডস্টোন কে অনুসরণ করলেও, জওহরলাল নেহরু ১৯৫৮ সালে বাজেট ঘোষণা করতে আসেন একটি কালো চামড়ার বাক্স নিয়ে। পরবর্তী কালে মনমোহন সিংহও কালো ব্যাগ হাতে বাজেট ঘোষণা করতে আসেন ১৯৯১ সালে। সেই বাজেট নজরে পড়ার মতো বদল এনেছিল ভারতীয় অর্থনীতিতে। কালো বাজেটের ব্যাগ ব্যবহার করেছিলেন বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী জেটলিও। বাকিরা গাঢ় লাল, লালচে বাদামি, মেরুন ইত্যাদি রঙের ব্রিফকেস, অ্যাটাচি কেস ব্যবহার করেছেন মূলত। যশবন্ত সিন্‌হা এই ধারায় সামান্য বদল এনেছিলেন ১৯৯৮ সালে। ব্রিফকেসের বদলে এনেছিলেন অ্যাটাচির মতো হ্যান্ডেল দেওয়া স্মার্ট চামড়ার ব্যাগ। ২০১৯ সালে এই ঐতিহ্যে বড় বদল আনলেন নির্মলা। তিনি চামড়ার ব্যাগের বদলে আনলেন আদি ভারতীয় সংস্কৃতির লাল শালুতে মোড়া হলুদ দড়ি দিয়ে বাঁধা খেরোর খাতা। খেরোর খাতা থেকে সোজা পাতাহীন স্মার্ট ট্যাবলেট। একটি লাল রঙের স্মার্ট কভারে ভরে ২০২১ সালে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ট্যাব হাতে নিয়ে তিনি হাজির হন। তার পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওই লাল কভারে থাকা ট্যাবেই বাজেট ব্যাগের জায়গা নিয়েছে।

নজরে পাঁচ রাজ্যের ভোট। সেই রাজনৈতিক আবহেই আজ, রবিবার সংসদে পেশ হতে চলেছে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেট। এবারের বাজেটে ভোট রাজনীতির অঙ্ক কষেই কি পা ফেলবেন নির্মলা। অর্থনীতির দলিলের থেকে বেশি বাজেটকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবেই কি ব্যবহার করা হবে এবারেও। বাংলা, অসম, তামিলনাডু, কেরল, পুদুচেরিতে চলতি বছরেই বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে। ভোটমুখী চার রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির দিকে এবারের বাজেটে নজর থাকবে। তবে প্রশ্ন উঠছে, গতবারের বিহারের মতো এবারেও কি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে আরেক বিজেপি শাসিত রাজ্য অসমকেই। নাকি বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলাকেও খুশি করার চেষ্টা করবে মোদি সরকার? নাকি অন্যান্য বছরের মতোই কেন্দ্রীয় বাজেটে বাংলার ঝুলি ফের শূন্যই থাকবে? আবার দক্ষিণের রাজ্যগুলির দিকেও নজর রয়েছে বিজেপির। ভোট অঙ্কেই দক্ষিণের প্রতি নিমর্লার কিছু দাক্ষিণ্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বাজেট ছিল স্পষ্টতই ভোটমুখী। বিহারের জন্য একের পর এক প্রকল্প, পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, শিল্প স্থাপনের ঘোষণা-সব মিলিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল কেন্দ্র। এ বছর পরিস্থিতি আলাদা। পাঁচ রাজ্যের মধ্যে বাংলাই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সুত্রের খবর, বাজেটে বাংলার জন্য বড় কোনও প্যাকেজ বা বিশেষ ঘোষণা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে, তারমধ্যেই কিছু চমক থাকতে পারে। উত্তরবঙ্গে এইমস তৈরির ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। আরও কিছু দেওয়া হতে পারে। কারণ, আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে বাজেটে যদি বাংলাকে একেবারেই বঞ্চিত করা হয়, তাহলে বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে অভিযোগ রয়েছে, তাতেই সিলমোহর পড়বে। সেই ঝুঁকি সামলাতে আজ অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের দাওয়াই কী হবে, তার উত্তর মিলবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই।

এবারের বাজেটের লক্ষ্য স্পষ্ট-মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের সামাল দেওয়া। লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব আর আয়করের বোঝায় নাজেহাল সাধারণ মানুষ করছাড়ের দিকে তাকিয়ে। আয়কর কাঠামোয় কিছু ছাড় দেওয়া হতে পারে বলে জল্পনা রয়েছে, কিন্তু তা কতটা বাস্তবে স্বস্তি দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কর কমলেও নিত্যপণ্যের দাম না কমলে মধ্যবিত্তের হাঁফ ছাড়ার সুযোগ নেই। কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানোর ঢাকঢোল পেটানো হতে পারে। মনরেগা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, স্বাস্থ্য প্রকল্প-সবই ভোটের অঙ্কে জরুরি। স্টার্টআপ, ডিজিটাল অর্থনীতি আর সবুজ শক্তির নামে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা করা হবে বাজেটকে সামনে রেখে। সব মিলিয়ে এবারের বাজেট শুধু আর্থিক নথির চেয়ে বেশি রাজনৈতিক চাল। কে পাবে, কে বঞ্চিত হবে-তা ঠিক করবে ভোটের অঙ্ক। সেই অঙ্কে বাংলার অবস্থান আদৌ বদলাবে কি না, নাকি ফের উপেক্ষার তালিকায় নাম উঠবে, তা জানা যাবে ঘোষণার পরেই। আজ বাজেট পেশ করবেন নির্মলা। ছক ভাঙতে পারেন নির্মলা, জল্পনা তুঙ্গে। ৭৫ বছরের বাজেট-রেওয়াজ ভেঙে বক্তৃতার পার্ট বি-তেই ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরতে পারেন।

বাজেট বক্তৃতা দু’ভাগে বিভক্ত হয়। একটি পার্ট এ আরেকটি পার্ট বি। এই পার্ট এ-তে সাধারণত দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা, কোষাগারের হাল, রাজস্ব আদায়ের বিস্তারিত, এবং বড়সড় নীতিগত কোনও ঘোষণা, বা বড় কোনও অর্থনৈতিক ঘোষণা থাকলে সেগুলি করা হয়। আর পার্ট বি মোটামুটিভাবে করকাঠামো এবং ছোটখাট নীতি বদল হলে সেসব নিয়ে তৈরি হয়। এতদিন ধরে চলে আসা রীতিতে বাজেটে এই পার্ট এ-তেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত। আর পার্ট বি হত সংক্ষিপ্ত।এবার নির্মলা সীতারমণ সেই রীতিতেই ইতি টানতে চলেছেন। সূত্রের খবর, এবারের বাজেটে পার্ট এ হবে সংক্ষিপ্ত। আর পার্ট বি হবে বিশদে। কারণ, অর্থমন্ত্রী আগামী ২৫ বছরের জন্য দেশকে দিশা দেখাতে চান। অর্থনীতির রোডম্যাপ তৈরি করতে চান। তাছাড়া এটা চলতি শতাব্দীর ছাব্বিশতম বাজেট। অর্থাৎ এই শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশ শেষ হয়ে দ্বিতীয় চতুর্থাংশে পড়ছে ভারত। তাই স্বল্পমেয়াদি করকাঠামোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি করকাঠামো, দুটোরই বর্ণনা থাকবে বিস্তারিত। সেকারণেই বাজেটের দ্বিতীয় অংশে বাড়তি জোর দিচ্ছেন তিনি। সেকারণেই এবারের ট্র্যাডিশন বদল। নির্মলা লাগাতার ট্র্যাডিশন ভেঙেই চলেছেন। তাঁর আমলেই চিরাচারিত ব্রিফকেসের বদলে বহি খাতা চালু হয়। তিনিই আবার ডিজিটাল বাজেট চালু করেন। এবারের বাজেটে ট্র্যাডিশন ভেঙে রবিবার বাজেট পেশ হবে। সেটাও নির্মলার নজির।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles