রাষ্ট্রপতি ভবন ঘুরে সংসদে বাজেট পেশ অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের। তাঁর শাড়িতে নজর আটকালো দেশবাসীর। ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট বক্তৃতার জন্যও নির্মলা বেছে নিলেন দেশের এক ঐতিহ্যবাহী বুননের রেশমের শাড়ি। অর্থমন্ত্রীর শাড়িটি খানিক মভ ঘেঁষা মেরুন রঙের। বোনা হয়েছে রেশম আর জড়ি দিয়ে। শাড়িটি দক্ষিণ ভারতের এক প্রদেশেরই। আর সেটাই স্বাভাবিক, কারণ নির্মলা নিজেও দক্ষিণ ভারতেরই কন্যা। মভ ঘেঁষা ওই মেরুন শাড়ির জমিতে সোনালি সুতোর সূক্ষ্ম চেক। পাড়ে গাঢ় চকলেট রং। তার উপর জোড়া ফিতে পাড়। যা বোনা হয়েছে রুপোলি আর সোনালি জড়ি দিয়ে। আর তাতে জড়ির কয়েনের মোটিফ। এই ধরনের শাড়ি দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যেই দেখা যায়। তামিলনাড়ুর বিখ্যাত শাড়ি কাঞ্জিভরম। তাতেও কয়েনের মোটিফ থাকে। বাজেটের দিনে নির্মলার নিজের রাজ্যের শাড়ি পরে আসাও স্বাভাবিক। তা ছাড়া এ বছর ভোটও রয়েছে তামিলনাড়ুতে। পোশাকে রাজনীতির পক্ষে যাঁরা তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষ রাজ্যের, বিশেষ সম্প্রদায়ের পোশাক পরেন, সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে। তাই নির্মলা তামিলনাড়ুর শাড়ি পরলে তা যুক্তিসঙ্গতই হত। তবে এই শাড়িটি কাঞ্জিভরম নয়। নির্মলা পরেছিলেন রেশমের গাদোয়াল। এই শাড়ি অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশেই বোনা হত। তবে রাজ্য ভাগ হওয়ার পরে আপাতত এই শাড়ির জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন ট্যাগ রয়েছে তেলঙ্গনার হাতে। সেখানেই এমন জোড়া পাড়ের নাকশায় ছোট ছোট কয়েনের মোটিফ বোনা হয়। শাড়ির সঙ্গে মিলিয়েই সাধারণত ব্লাউজ় বেছে নেন নির্মলা। তাঁর শাড়ি পরার ধরনে যাঁরা অল্পবিস্তর নজর রাখেন, তাঁরা তা দেখেও থাকবেন। রবিবার বাজেটের দিন নির্মলা একটু বাঁধা গতের বাইরে গেলেন। কারণ সম্ভবত দিল্লির ঠান্ডা। অর্থমন্ত্রী শাড়ির পাড় দেওয়া ব্লাউজ়ের বদলে পরেছিলেন সর্ষে হলুদ রঙের উলের ব্লাউজ়। যার সঙ্গে তাঁর শাড়ির পাড়ের জড়ির রঙেরও খানিকটা মিল আছে। ঠান্ডা আটকানোর জন্য এর পাশাপাশি কাঁধের এক পাশে একটি পশমের শালও আলগা ভাবে ফেলে রেখেছিলেন অর্থমন্ত্রী। তবে সেই শালের রং বেছে নেওয়াছিল শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়েই। পাড়ের গাঢ় চকোলেট রঙের সঙ্গে মিলিয়ে একই রঙের শাল নিয়েছিলেন নির্মলা।
কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার বিড়ি-সিগারেট তথা অন্যান্য তামাকজাত পণ্যকে ‘পাপ পণ্য’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে। জিএসটি-র নতুন কাঠামোয় এগুলিই হতে চলেছে সবথেকে দামি পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে, তামাক, গুটখা, পান মশলা, মদ এবং কোল্ডড্রিঙ্কের মতো সামগ্রী। গত ডিসেম্বরেই সংসদে দুটি পৃথক বিল পাশ হয়েছিল। সেই বিলের মাধ্যমেই পানমশলা উৎপাদনে নতুন সেস এবং তামাকজাত পণ্যের উপর অতিরিক্ত এক্সাইজ ডিউটি আরোপের পথ প্রশস্ত হয়। সিগারেট (৪০ শতাংশ জিএসটি) সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি:
ছোট নন ফিল্টারড (৬৫ মিমি পর্যন্ত) ২.০৫ টাকা
ছোট ফিল্টারড (৬৫ মিমি পর্যন্ত) ২.১০ টাকা
মাঝারি (৬৫-৭০ মিমি) ৩.৬-৪ টাকা
বড় (৭০ মিমির উপর) ৫.৪ টাকা পর্যন্ত
কিং সাইজ ও অন্যান্য বিশেষ ডিজাইন ৮.৫ টাকা পর্যন্ত
মূল্যবৃদ্ধির আওতায়:
গুটকা (৯১ শতাংশ), পানমশলা (৮৮ শতাংশ) ও অন্য তামাকজাত পণ্য
বিড়িতে জিএসটি কমে ১৮ শতাংশ।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ওই ধরনের পণ্যের উপর ৪০ শতাংশ জিএসটি। সঙ্গে অতিরিক্ত সেসও বসানো হচ্ছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘হেলথ অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি সেস’। এর সঙ্গে জারি হবে অতিরিক্ত এক্সাইজ ডিউটি। আগে ২৮ শতাংশ করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ সেস ধার্য করা হত। এর ফলে মোট ট্যাক্সের পরিমাণ হত ৫৩ শতাংশ। এবার পর পর তিন ধরনের শুল্ক আরোপের পাশাপাশি জিএসটি বাড়ায় করের পরিমাণটা অনেকটা বাড়ছে। যার ফলে সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের দাম অনেকটাই বাড়ল।
১০ বছরে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র থেকে বেরিয়ে এসেছেন। বাজেট পেশের সময় জানালেন নির্মলা। ১ এপ্রিল থেকে চালু হতে চলেছে নতুন আয়কর আইন। বাজেট পেশের সময় জানিয়ে দিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। নির্মলা জানালেন, নতুন আয়কর আইনে ৩১ জুলাই পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন দাখিল করা যাবে। অডিট হয়নি এমন ব্যবসায়িক মামলা বা ট্রাস্টের ক্ষেত্রে ৩১ অগস্ট পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করার সুযোগ। আরও সরলীকরণ করা হবে কর কাঠামো। ছোটমাপের আয়কর ফাঁকিতে শুধুই জরিমানা করা হবে। জেলে যাওয়া থেকে বাঁচতে দিতে হবে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা।সারা দেশে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় টাউনশিপ তৈরি হবে বলে জানালেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে থাকবে গবেষণাকেন্দ্রও। ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে আগামী দশকে ক্রীড়া ক্ষেত্রের রূপান্তরের জন্য ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রকল্প চালু করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মহিলা উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার জন্যও প্রকল্প চালু করা হবে। ‘লাখপতি দিদি’ কর্মসূচির সাফল্যের পর সরকার এ বার মহিলাদের ঋণ নির্ভর জীবিকা থেকে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি দিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও জানালেন নির্মলা। নির্মলা জানালেন, শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এই কমিটি পরিষেবা ক্ষেত্রের বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সর্বোত্তম করার জন্য ক্ষেত্রগুলিকে অগ্রাধিকার দেবে এবং পরিষেবা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তির প্রভাব পর্যালোচনা করবে। অর্থমন্ত্রী জানালেন, ভারতের বাইরে বসবাসকারী ব্যক্তিদের পোর্টফোলিয়ো বিনিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে ইকুইটিতে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেওয়া হবে। ব্যক্তিগত সীমা ৫% থেকে বাড়িয়ে ১০% করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে এই ধরনের সমস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্মিলিত সীমা ১০% থেকে বাড়িয়ে ২৪% করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে ব্যক্তিগত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় সংস্থাগুলিতে আরও অর্থবহ অংশীদার হতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চাকরির উপর কতটা প্রভাব ফেলছে, তার মূল্যায়ন করতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি তৈরি করা হচ্ছে। বাজেটে জানালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। নির্মলা জানালেন, তিনটি এমস এবং তিনটি ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ আয়ুর্বেদ’ তৈরি হবে দেশে। সারা দেশে ১৬ হাজার নতুন সেকেন্ডারি স্কুল তৈরি হবে। প্রতি জেলায় তৈরি হবে একটি করে মহিলাদের হস্টেল। আগামী পাঁচ বছরে ২০টি নতুন জাতীয় জলপথ চালু করার পরিকল্পনা সরকারের। জলপথের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হবে। অভ্যন্তরীণ জলপথের জন্য জাহাজ মেরামতের বাস্তুতন্ত্র বারাণসী এবং পটনায় তৈরি হবে। ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষের জন্য মূলধনি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি মূলধনি ব্যয় বহুগুণ বেড়ে ১১ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। ভারতের ‘সেমিকন্ডাক্টর মিশন ২.০’ সেমিকন্ডাক্টরের জন্য শিল্প-নেতৃত্বাধীন গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলিতে মনোনিবেশ করবে। জানালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। সেমিকন্ডাক্টর মিশনের গতিকে পুঁজি করে ব্যয় করা হবে ৪০,০০০ কোটি টাকা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেধা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানো হবে। বাংলার জন্য বড় ঘোষণা। ডানকুনিতে তৈরি হবে পণ্য পরিবহণের বিশেষ করিডর। একই করিডর তৈরি হবে সুরতেও। সাতটি হাইস্পিড রেল করিডর তৈরি করা হবে, যার মধ্যে একটি হবে শিলিগুড়িতে। খেলাধুলো সংক্রান্ত সরঞ্জাম তৈরিতে ভারত বিশ্বের সেরা হয়ে উঠতে পারে। বাজেট পেশের সময় মন্তব্য নির্মলার। ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলিতে সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য ‘আত্মনির্ভর ভারত’ তহবিলে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ‘বিকশিত ভারতের’ জন্য ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত উচ্চ-স্তরের কমিটি তৈরি করা হবে। ওড়িশা, কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুতে বিরল ধাতুর হাব তৈরি হবে। খনিতে জোর দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বলে জানালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। বস্ত্রশিল্পে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা জানালেন নির্মলা। খাদি বস্ত্রের ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য মহাত্মা গান্ধী গ্রাম স্বরাজ প্রকল্প চালু করার সিদ্ধান্ত। তৈরি হবে মেগা টেক্সটাইল হাব। সামুদ্রিক পণ্যের দাম কমবে। চামড়া শিল্পকে ছাড় দেওয়া হবে। দাম কমবে পারমাণবিক বিদ্যুতেরও। জানালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা।
প্রথাগত চাকরি নয়, বিকল্প পথে উপার্জনের চেষ্টা করছে জেন জি। সেই বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পথ হল কন্টেন্ট ক্রিয়েশন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে রিল করে-ছবি তুলে দেদার রোজগার করছে ভারতের তরুণ প্রজন্ম। এবারের বাজেটে সেই জেন জির জন্য বিরাট ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। জানালেন, দেশের দেড় হাজার স্কুলে এবং ৫০০ কলেজে গড়া হবে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব। “দেশের ১৫০০টি সেকেন্ডারি স্কুল এবং ৫০০টি কলেজে গড়ে তোলা হবে এবিজিসি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব। অ্যানিমেশন, ভিস্যুয়াল এফেক্টস, গেমিং, কমিক্স এসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এই ল্যাবে।” নির্মলার ঘোষণা, এই ল্যাবের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কেবল কন্টেন্ট ক্রিয়েশন নয়, ভারতীয় জেন জির মধ্যে ডিজিটাল মিডিয়া সংক্রান্ত দক্ষতা বাড়িয়ে তুলবে এই ল্যাব। তবে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সরকারি কোনও সাহায্যের ঘোষণা করা হয়নি। জেন জির বিকল্প আয়ের পথ হিসাবে আরও একটি ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা, দেশের ২০টি পর্যটন কেন্দ্রে ১০ হাজার ট্যুর গাইডকে সরকারি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ১২ সপ্তাহব্যাপী এই প্রশিক্ষণে থাকবে ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট। এছাড়াও পর্যটনের ক্ষেত্রে জেন জি’র সুবিধার্থে বিশেষ ঘোষণা করেছেন নির্মলা। জানিয়েছেন, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, জম্মু-কাশ্মীর, আরাকু ভ্যালির মতো একাধিক পাহাড়ি এলাকায় ট্রেকিং সহায়ক পরিকাঠামো তৈরি হবে। কর কমায় সস্তা হতে চলেছে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজও। কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের অনেকেই ট্র্যাভেল ভ্লগ বানান। পর্যটনের ক্ষেত্রে এই ছাড় এবং সুবিধা পাওয়ার ফলে তাঁদের কন্টেন্টের রিচ বাড়বে বলেই অনুমান করা যায়।





