নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে পঞ্চম টি-টোয়েন্টিতে বিধ্বংসী সেঞ্চুরি ভারতীয় উইকেটকিপারের। মাত্র ৪২ বলে সেঞ্চুরি হাঁকালেন তিনি। অবশ্য তারপরই আউট হয়ে যান। আর সেখানে ফের ব্যর্থ সঞ্জু স্যামসন। ফলে মনে করা হচ্ছে, বিশ্বকাপেও প্রথম একাদশে জায়গা পাকা করে নিলেন ঈশান। তিরুঅনন্তপুরমের গ্রিনফিল্ড স্টেডিয়ামে ভারতের ইনিংস শেষ হল ২৭১ রানে। যা টি-টোয়েন্টিতে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান। সূর্যকুমার যাদব ৬৩ রান করেন। শেষের দিকে ১৭ বলে ৪২ রানের হার্দিকোচিত ইনিংস খেলে যান পাণ্ডিয়া। দীর্ঘ দু’বছর জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন। শাস্তিও পেয়েছিলেন ঈশান। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্ম করে ফিরেছেন। তিনি যে আগুন ঝরাতে তৈরি, তার ইঙ্গিত নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচেই দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এদিন যে ইনিংসটা খেললেন, তাতে লণ্ডভণ্ড কিউয়িদের বোলিং। একই সঙ্গে ভয় ধরাবে বিশ্বকাপের যে কোনও দলকে। ৪৩ বলে ১০৩ রান করে ফিরলেন। ৬টি চারের পাশাপাশি ছিল ১০টি ছক্কা। স্ট্রাইক রেট ২৫০-র কাছাকাছি। সঞ্জু আরও একবার সুযোগ পেয়ে ব্যর্থ। ঘরের মাঠে তাঁর কাছে কামব্যাকের সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি আউট হলেন ৬ রানে। অভিষেক শর্মা ১৬ বলে ৩০ রানে ভারতকে ভালো জায়গায় দাঁড় করিয়ে আউট হন। তবে ঈশানের কাছে সব ফিকে। ঈশ সোধির এক ওভারে তুললেন ২৯ রান। শুধু ওই ওভারেই চারটে চারের সঙ্গে দু’টি ছয় মারেন। সূর্যকুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে যেভাবে রান তুলছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল ৩০০ রান সময়ের অপেক্ষা। সূর্যও ডাফির এক ওভারে ৩টি ছক্কা মারেন। তিনি ৬৩ রানে আউট হওয়ার পর শুরু হয় হার্দিকের দাপট। ১৭তম ওভারে সেঞ্চুরি করতেই শিশুর মতো লাফিয়ে উঠলেন। একসময় ওয়ানডেতে ডবল সেঞ্চুরি করে দলে জায়গা পাকা করতে পারেননি। সেখানে বিশ্বকাপের ঠিক আগে সেঞ্চুরি করে যেন বুঝিয়ে দিলেন, এবার আর সেই ভুল করতে চান না। শুধু নিজের কাজই করে গিয়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে ম্যাচ পর ম্যাচ পারফর্ম করেছেন। ভাল, আরও ভাল খেলার চেষ্টা করেছেন। আগরকরদের ভাবতে বাধ্য করেছেন। ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরকেও আপত্তি করার সুযোগ দেননি। ভারতীয় দলের ভেজানো দরজাটা খুলে দিয়েছেন সৈয়দ মুস্তাক আলির ফাইনালে শতরান করে। এক বিশ্বকাপের পর হারিয়ে যাওয়া ঈশান সরাসরি ঢুকে পড়েছেন আর এক বিশ্বকাপের দলে।
ঋষভ পন্থের চোট আর সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফির ১০ ম্যাচে ৫১৭ রান। ভারতীয় দলের মূল স্রোত থেকে দূরে চলে যাওয়া ২৭ বছরের তরুণকে নতুন ক্রিকেটজীবন দিয়েছিল। ফিরে পাওয়া ক্রিকেটজীবনকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে চাইছেন ঈশান। নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে রায়পুরে ৭৬ রানের ইনিংসে ইঙ্গিত ছিল। সিরিজ়ের চতুর্থ ম্যাচ খেলতে পারেননি কুঁচকিতে হাল্কা চোট পাওয়ায়। শেষ ম্যাচে জ্বলে উঠলেন ব্যাট হাতে। ঈশান খেলেছেন ৪৩ বল। করেছেন ১০৩ রান। ৬টি চার মেরেছেন। সঙ্গে ১০টি ছক্কা। স্ট্রাইক রেট ২৩৯.৫৩। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম শতরানেই বিশ্বকাপের প্রথম একাদশে জায়গা নিশ্চিত করে ফেলেছেন। ২০২৩ সালে এক দিনের বিশ্বকাপের পর হঠাৎ হারিয়ে যান ঈশান। হতাশায় ক্রিকেট থেকে মন সরে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে হঠাৎ ফিরে এসেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে। অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন তৎকালীন কোচ রাহুল দ্রাবিড় এবং সেই সফরের অধিনায়ক লোকেশ রাহুল। তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটারের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
নিরুদ্দেশ ঈশানকে ২২ গজে ফিরিয়ে ছিলেন হার্দিক। বডোদরায় হার্দিক এবং ক্রুণাল পাণ্ড্যর সঙ্গে অনুশীলন, ফিটনেস ট্রেনিং শুরু করেন। তবু বোর্ড এবং রাজ্য সংস্থার কর্তারা মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন। ‘অবাধ্য’ ঈশানকে দলে ঠাঁই দিতে রাজি ছিলেন না কেউ। ২০২৪ সালের আইপিএলে আবার ঈশান ফেরেন প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে। দারুণ কিছু করতে পারেননি সে বার। ভারতীয় দলে ফেরার রাস্তা তখনও ভেজিয়ে রেখেছিলেন বোর্ড কর্তারা। পথ কঠিন বুঝে যান ঈশান। নতুন করে ক্রিকেটের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ফিরে আসার এই পথের প্রদর্শক ছিলেন হার্দিক। কিছুটা শুভমনও। প্রিয় বন্ধুকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল পারফর্ম করতে শুরু করেন। তবু জাতীয় দলের নির্বাচনী বৈঠকে তাঁর নাম উচ্চারণই করতেন না অজিত আগরকরেরা। ঈশান হাল ছাড়েননি। ভরসা রেখেছিলেন নিজের ক্রিকেটীয় দক্ষতায়। নানা কারণে সমস্যায় জর্জরিত ঈশান শান্তি খুঁজতে ভগবদ্গীতাকে বেছে নেন। ২০২৪-এর ডিসেম্বরে মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ভগবদ্গীতার শ্লোক চোখে পড়ে, যেখানে লেখা ছিল, ‘কর্ম করো, ফলের আশা কোরো না’। বাবা প্রণব পাণ্ডেকে এই শ্লোকের অর্থ জিজ্ঞাসা করেন। বাবা অর্থ বোঝানোর পাশাপাশি আরও কিছু শ্লোক বলেন। তার পর থেকে এই বই ঈশানের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যাট, উইকেট রক্ষার দস্তানার সঙ্গে এই বইও তাঁর কিটব্যাগে থাকবেই। ঝাড়খণ্ডকে সৈয়দ মুস্তাক আলিতে চ্যাম্পিয়ন করা পর ঈশান বলেছিলেন, ‘‘ভাল পারফর্ম করার পরও ভারতীয় দলে নির্বাচিত হইনি। তখন খারাপ লেগেছিল। নিজেকে বুঝিয়ে ছিলাম, এমন পারফর্ম করেও যদি সুযোগ না পাই, তা হলে আমাকে আরও ভাল কিছু করে দেখাতে হবে। দলকে জেতানোর মতো পারফরম্যান্স করতে হবে। আমাদের দল হিসাবে আরও ভাল কিছু করতে হবে। ‘‘আমরা অনেক সময় অনেক কিছু আশা করি। দলে নিজের নাম না দেখলে একটু তো খারাপ লাগেই। কিন্তু মানসিক ভাবে আমি এখন অনেক শক্ত। কোনও প্রত্যাশা নিয়ে খেলি না। শুধু নিজের কাজটা ভাল ভাবে করার চেষ্টা করি।’’ বিশ্বকাপের আগে ছন্দে সূর্যকুমার যাদব। তিরুঅনন্তপুরমে রেকর্ড গড়লেন ভারত অধিনায়ক। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে কম বল খেলে ৩০০০ রান করলেন। তিরুঅনন্তপুরমে ৩০ বলে ৬৩ রানের ইনিংস খেলেছেন সূর্য। এই ইনিংসের মাঝেই বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন তিনি। মাত্র ১৮২২ বল খেলে ৩০০০ রান করেছেন সূর্য। এত দিন এই রেকর্ড ছিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ক্রিকেটার মহম্মদ ওয়াসিমের দখলে। ১৯৪৭ বলে ৩০০০ রান করেছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার জস বাটলার রয়েছেন তিন নম্বরে। ৩০০০ রান করতে ২০৬৮ বল নিয়েছেন। চার নম্বরে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ। তিনি নিয়েছেন ২০৭৭ বল। অস্ট্রেলিয়ার আর এক প্রাক্তন ক্রিকেটার ডেভিড ওয়ার্নার ২১১৩ বলে ৩০০০ রান করেছেন। ষষ্ঠ স্থানে ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক রোহিত শর্মা। তিনি ২১৪৯ বলে ৩০০০ রান করেছেন। তাঁর পরেই রয়েছেন বিরাট কোহলি। ৩০০০ রান করতে তিনি নিয়েছেন ২১৬৯ বল। ২০২৫ সালে ২১ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। করেছিলেন মাত্র ২১৮ রান। ১৪-র কম গড়ে রান করেছিলেন তিনি। স্ট্রাইক রেটও বেশি ছিল না। ১২৫ স্ট্রাইক রেটে রান করেছিলেন ভারত অধিনায়ক। তার পরেও রেকর্ড গড়লেন তিনি। বুঝিয়ে দিলেন, ফর্ম খারাপ-ভাল হতে পারে। এক সময় আইসিসি ক্রমতালিকায় শীর্ষে থারা সূর্য আরও এক বার নিজের জাত চেনালেন।





