আমতার বিধায়ক সুকান্ত পালের নামে অসংখ্য অভিযোগ। আমতা বিধানসভা জয়ের নেপথ্যে তৃণমূলের গোপন কথা এবার প্রকাশ্যে এসেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরাই সুকান্ত পালের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে। নিজে টিকিট দখল করবেন বলে, জোর করে তুষার শীলকে হারানোর চক্রান্তের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে বারংবার। আমতার সিংহভাগ নেতাকর্মীরাই ক্ষুব্ধ সুকান্ত পালের বিরুদ্ধে। আমতার থলিয়া পঞ্চায়েতে “আপনার পাড়া আপনার সমাধানে” বিধায়ক সুকান্ত পালের সামনেই উঠেছিল দুর্নীতির অভিযোগ। অভিযোগ তুলেছিলেন সৌরভ মন্ডল। দলের প্রার্থী তালিকায় থাকছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়েক দশকের সৈনিক তথা আমতা বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১৬ সালের তৃণমূল প্রার্থী যোগ বিশারদ, বঙ্গভূষণ তুষার শীল।

চিত্র এক : তৃণমূল নেতার ফেসবুকে মন্তব্যে বিতর্ক। একইসঙ্গে ভোটের আগে দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আরও এক বার বেআব্রু। হাওড়ার আমতার বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা অশোক ভট্টাচার্য ফেসবুক পেজে দলে গণতন্ত্র, সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মন্তব্য করেছেন, চোর-ডাকাত না হলে সম্মান নেই। দলে কতদিন থাকতে পারবেন, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। দলীয় বিধায়ক টাকা নিয়েছেন, ফেসবুকে এমন অভিযোগ ছিল। অশোকের ফেসবুক-মন্তব্যকে ঘিরে আমতা বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের অন্দরে শোরগোল পড়েছিল। ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি টানা দশ বছর এই কেন্দ্রে দলের সভাপতি ও ২০১৯ সাল পর্যন্ত দলের গ্রামীণ জেলার সহ-সভাপতিও ছিলেন। যে পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা, সেই বাইনানে দলের কোর কমিটির সদস্যও ছিলেন। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের সময় তিনি ছিলেন এই কেন্দ্রে দলের চেয়ারম্যান। দলের জন্মলগ্ন থেকে যুক্ত থাকা এবং দলের বিভিন্ন পদের দায়িত্ব সামলানোর কথা উল্লেখ করে অশোক ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘জানি না আর থাকতে পারব কি না! এখন যা চলছে, তার প্রতিকারের লোক নেই। এক জন ভাবে দলটা তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি। অভিযোগ জানিয়ে ক্লান্ত। গণতন্ত্র দলে শেষ। তাই বিদ্রোহ ছাড়া গতি নেই। দলে এখন কর্পোরেট (রাজ) চলছে। চোর-ডাকাত না হলে সম্মান নেই’। অভিযোগ, ‘‘এখানে বিধায়কই দল চালাচ্ছেন। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ব্যাপক আকার নিয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছে। এ ভাবে চললে আমতায় দলের খুব ক্ষতি হবে। আরও অনেকেই দলের ভবিষ্যৎ ভেবে উদ্বিগ্ন। বিষয়টি নিয়ে দলের রাজ্য নেতৃত্বের কাছে যাব। প্রতিকার না পেলে আমরা সবাই একযোগে পদত্যাগ করব।’’ দলের বর্ষীয়ান নেতার অভিযোগ আমতার তৃণমূল বিধায়ক সুকান্ত পাল আবার বিধানসভা ভোটের আগে টিকিট পাওয়ার জন্য চেষ্টা করলেও এবার তা সম্ভব নয়।
চিত্র দুই : এর আগেও বন্যার সময়ে অভিযোগ, প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগের মধ্যে আলু, পেঁয়াজ, চিড়ে, মুড়ি, চানাচুর, বিস্কুট এবং চিনি। ক্যারিব্যাগের গায়ে স্টিকার সাঁটা। তাতে লেখা— ‘বন্যা দুর্গত মানুষের পাশে আপনাদের বিধায়ক সুকান্ত পাল’। তাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়, সাংসদ অভিষেক বন্দোপাধ্যায় এবং আমতার বিধায়ক সুকান্ত পালের ছবি। এ নিয়ে তৈরি বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর নামে শাসক দলের বিধায়ক নিজের এবং দলের প্রচার করেন। এতে দুর্গতদের ‘অসম্মান’। আমতার প্রাক্তন বিধায়ক, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অসিত মিত্র বলেছিলেন, ‘‘বিধায়ক আসলে রাজনীতি করছেন। অসহায় মানুষের সাথে এটা ঠিক করছেন না।’’ বিজেপি নেতা বিভাস জানার অভিযোগ, ‘‘তৃণমূল নিজেদের দলের লোক দেখে ত্রাণ দিচ্ছে। যাঁরা আমাদের দল করেন, তাঁরা ত্রাণ পাননি। নিজের ছবি লাগিয়ে এই দুঃসময়েও রাজনীতি করতে বিধায়কের বাঁধেনি। এটা লজ্জার। সুকান্ত পাল কোনও ‘ভুল’ দেখতে পাননি, ঔদ্ধত্বের সুরে বলেছিলেন, ‘‘দুর্গত মানুষের পাশে দিনরাত এক করে পড়ে আছি। ত্রাণ বিলিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। স্টিকার সাঁটলে দোষ কোথায়?’’ আমতা-২ ব্লকের বিকেবাটী পঞ্চায়েতের হানিধাড়া মোড়ে কয়েকশো লোকের লাইন থেকে এক জন তালিকা ধরে নাম ডেকে সেই অনুযায়ী একে একে ত্রাণ দেওয়া হয়েছিল। বিধায়ক তাঁদের জন্য ত্রাণ পাঠিয়েছেন। নাম ডেকে সেগুলি দেওয়া হচ্ছে।’’ ত্রাণের প্যাকেটে বিধায়কের নাম দেখে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের একাংশের অভিযোগ ও দাবি, বিধায়ক রাজনীতি করছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কয়েক দশকের সম্পর্ক তুষার শীলের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকাকালীন তুষার শীল সাইয়ের জেনারেল বডি-র সদস্য হন। আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কয়লামন্ত্রী তখন কোল ইন্ডিয়া স্পোর্টসের প্রেসিডেন্ট হন তুষার শীল। অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির ৪১টি ফ্যাক্টরিকে নিয়ে স্পোর্টস পরিচালনা করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই রাজনীতিতে যোগদান। দলের মুখপত্র জাগোবাংলায় নিয়মিত লেখালিখিও করতেন প্রথম থেকে। রাজ্য সরকার থেকে বঙ্গভূষণ সম্মানও পেয়েছেন। হাওড়া জেলার আমতা আসনটি কংগ্রেসের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ষোগ বিশারদ তুষার শীলকে প্রার্থী করেন। যদিও প্রায় সাড়ে চার হাজার ভোটে তিনি হেরে যান। অন্তর্ঘাত করে হারানোর অভিযোগ উঠেছিল। হারলেও তুষার শীলকেই আমতার মানুষের পাশে থাকার দায়িত্ব দিয়ে পাঠান দলনেত্রী। সাধ্যমতো সেই চেষ্টা করেছিলেন তুষার শীল। তাঁকে রাজ্যের আয়ুষ হাসপাতাল তৈরির দায়িত্বও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে আগেরবার যাঁদের অন্তর্ঘাতে তাঁকে হারতে হয়েছিল বলে অভিযোগ, তাঁদেরই একজন প্রার্থী হওয়ায় বেজায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তুষার শীল। হাওড়া গ্রামীণের তৃণমূল জেলা যুব সভাপতি সুকান্ত পালকে আমতা আসনে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। নিজের ক্ষোভ এতদিন ধরে গোপনই রাখেন তুষার শীল। দলনেত্রীর নির্দেশে কর্তব্য পালনে খামতি রাখেননি। আবার বিধানসভা ভোট আসছে। তুষার বলেন, প্রচুর ফোন পাচ্ছি। এখনও আমি আমতা গেলে কয়েক হাজার মানুষ আমার সঙ্গে থাকেন। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে। আমি হেরে গেলেও হারিয়ে যাইনি। প্রায় বছরের পর বছর ধরে সেখানে মানুষের পাশে থেকেছি আপদে-বিপদে। আমি যোগের মানুষ। দুষ্ট চরিত্র, দুষ্ট বুদ্ধি, মিথ্যা বলা, অপরকে লাথি মারা, প্রার্থীকে হারিয়ে প্রার্থী হওয়ার লোভ আমার কোনওদিন ছিল না। ঈশ্বর যেন আমাকে সেই পথে হাঁটতে বাধ্য না করেন। তুষার শীল বলেন, রাজনীতিকে আত্মস্থ করে নিয়েছি। রাজনীতিতে যখন এসেছি তখন হারিয়ে যাব না। জহুরির চোখ সঠিককে চিনতে ভুল করবে, এটা কাম্য নয়। কোনও কিছু সাময়িক চকচক করলেই তা আসল মনে করা ঠিক নয়। ভবিষ্যৎই সব বলবে। তবে আমার আদর্শ কৃষ্ণ। কৃষ্ণকেই আমি সবচেয়ে বড় রাজনীতিবিদ মনে করি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বেইমানিও করব না। রাজনীতিতে কেউ অন্য গ্রহ থেকে আসেনি। সত্যের অপলাপ করা উচিত নয়। বর্তমান ক্ষণস্থায়ী। যে কোনও সময় অতীত হয়ে যেতে পারে, তার জায়গা নিতে পারে ভবিষ্যৎ। আমার বিশ্বাস, ঈশ্বর আমাকে যোগ্য জায়গাতেই রাখবেন। যে আঘাত বা অসম্মানের মুখোমুখি হয়েছিলেন সেটা মানতে খুবই কষ্ট হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়েক দশকের সৈনিকের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী তুষার শীল বলেন, আমি ফতনার মতো। এক জায়গায় ডোবালে অন্য জায়গায় উঠব। আবার বলছি, আমি যোগের মানুষ। বেশিদিন আমাকে ডুবিয়ে রাখা যাবে না। মানুষের বৃহত্তর স্বার্থের জন্য কাজ করার সুযোগ যেখানে থাকবে সেখানে তুষার শীলও থাকবে। ভালো রাজনীতিবিদ হিসেবেও একটা ছাপ রাখা তো দরকার।




