৩২ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। এখনও ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। পূর্ব কলকাতার আনন্দপুরের জোড়া গুদামে। মঙ্গল বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছোন দমকলমন্ত্রী সুজিত। সুজিতকে ঘিরে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। ইতিমধ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে আট। এখনও নিখোঁজ অনেকে। ঘটনার প্রায় দেড় দিন পর, মঙ্গলবার বেলায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছেন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। গিয়েছেন ময়নার বিজেপি বিধায়ক অশোক দিন্ডা ও স্থানীয় বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা। বিজেপির বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে সুজিতকে। মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমার জানান, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে দমকলের তরফে ওই গুদামের কোনও ছাড়পত্র ছিল না। এ বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিজি। অনুমোদন ছাড়াই কী ভাবে দিনের পর দিন ওই গুদাম চলছিল, সেই প্রশ্ন করলে ডিজি জানিয়েছেন, বিভাগের তরফে কোনও ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছোন দমকলমন্ত্রী সুজিত। ভস্মীভূত জোড়া গুদাম ঘুরে দেখেন তিনি। কথা বলেন দমকলের কর্মী ও আধিকারিকদের সঙ্গে। স্বজনহারাদের সঙ্গেও দেখা করেন তৃণমূল নেতা। সুজিত বলেন, ‘‘এই জায়গাটা একটা জতুগৃহের মতো। ৩৫ হাজার বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত এই এলাকায় পাশাপাশি একটি মোমো তৈরির কারখানা এবং একটি ডেকরেটার্সের গুদাম ছিল। ভিতরে প্রচুর দাহ্য পদার্থ ছিল। বহু ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। খবর পেয়ে দমকলের ১২টি ইঞ্জিন পাঠানো হয়। দমকলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরাও যান।’’ সুজিত জানিয়েছেন, গুদামে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এ নিয়ে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গুদামে আদৌ ফায়ার অডিট হয়েছিল কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন সুজিত।
ঘটনাস্থলে যান বিজেপি বিধায়ক অশোক দিন্দা। বিজেপি সমর্থকেরা সুজিতকে ঘিরে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেন। পাল্টা জবাব দেন তৃণমূল সমর্থকেরাও। দু’পক্ষে হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।
রবি রাত প্রায় ৩টে নাগাদ আনন্দপুরের নাজিরাবাদের একটি মোমো কোম্পানির গুদামে আগুন লেগে যায়। পাশাপাশি অবস্থিত দু’টি গুদামে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় দমকল। ১২টি ইঞ্জিন কাজে লাগিয়ে বহু চেষ্টার পরেও সোমবার রাত পর্যন্তও সেই আগুন নেবানো যায়নি। মঙ্গলবার বেলার দিকেও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এ দিকে-ও দিকে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। কোথাও আবার ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে বেরোচ্ছে কালো ধোঁয়া। এখনও পর্যন্ত আট জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। দগ্ধ দেহাংশ দেখে তাঁদেরও শনাক্ত করার উপায় নেই। দেহাংশগুলি ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। অন্তত ১৪ জন নিখোঁজ। ভিতরে এখনও কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়ার শ্রীকৃষ্ণ মাইতি, বাপন মাঝি, সমরেশ পথিকর, তপন দোলুই, ময়নার বুদ্ধদেব জানা, সৌমিত্র মণ্ডলের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়াও নিখোঁজের তালিকায় আছেন তমলুক ব্লকের দেবাদিত্য দিন্দা, বিমল মাইতি, গোবিন্দ মন্ডল, রামপদ মণ্ডল, ক্ষুদিরাম দিন্দা, শশাঙ্ক জানা। নন্দকুমারের গড়গোদা এলাকার বাসিন্দা সন্দীপ মাইতিরও খোঁজ পাচ্ছে না পরিবার! ওইসব পরিবারে এখন কেবলই আতঙ্ক। যত সময় এগোচ্ছে, কান্নার রোল উঠছে বাড়িতে। যে কারখানায় এই ঘটনা ঘটেছে, দোষী সাব্যস্ত হলে সেই কারখানার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র। আনন্দপুরের ‘মৃত্যুপুরী’ মোমো কারখানার সামনে এখন কান্না, হাহাকার। স্বজনদের খোঁজে অস্থির চিত্তে অপেক্ষায় পরিবার-পরিজনরা।
আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম একথা জানিয়েছেন। দেহ বা দেহাংশের শনাক্তকরণ হলেই পরিবারের হাতে চেক তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুরমন্ত্রী। পাশাপাশি আগামিকাল ডিএনও পরীক্ষার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চাওয়া হবে। এখনও পর্যন্ত ৮ জনের মৃতের খবর সামনে এসেছে। নিখোঁজ ১৫ জনের অধিক। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১৪ জনের পরিবারের তরফে নিখোঁজ অভিযোগ তাঁদের কাছে এসেছে। আগামিকাল আদালত থেকে ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি চাওয়া হবে, তারপর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেহের নমুনা মিললে পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করা হবে। ফিরহাদ হাকিম বলেন, “মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য করা হবে। ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার পরই আর্থিক সাহায্য করা হবে। ভয়াবহ আগুন। দুঃখজনক ঘটনা। অনেকজন মানুষ মারা গিয়েছেন। দমকল ও পুলিশ তদন্ত করছে। যে দেহগুলি পাওয়া গিয়েছে, তা ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে। সেগুলি শনাক্ত করা যায়নি। নিখোঁজ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।” এই প্রক্রিয়া কিছুটা সময় সাপেক্ষ। কিন্তু কেন? ডিএনএ পরীক্ষা করতে গেলে নিয়ম মেনে আদালতের কাছে অনুমতি নিতে হয়। সেই অনুমতি মেলার পর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। আগামিকাল পুলিশ সেই অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হবে। অন্যদিকে এই অগ্নিকাণ্ডে দু’টি মামলা রুজু করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।





