২০২৬ সালে প্রবেশ করেছি। নতুন বছরে ভারত জুড়ে বিতর্ক হওয়া উচিত শৃঙ্খলা পরায়ণতাকে নিয়ে। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যে কোনো তথ্য যাচাইকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাব, আমরা কঠোর সমালোচনাকেও স্বাগত জানাব, কিন্তু একইসঙ্গে আমরা চাইব যখনই কেউ কোনো বক্তব্য পেশ করবেন, তখন তাঁর মতামতের সঙ্গে যেন দায়িত্ববোধের বিষয়টিও যুক্ত হয়। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশে নিন্দা করার মানসিকতা থেকে সংস্কারকে কার্যকর করা যায় না। কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি এবং বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো সহজ কাজ নয়। বিভিন্ন পরিকল্পনা, সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং সংশোধনের মাধ্যমে উন্নয়নের উদ্যোগ কার্যকর হয়। নতুন একটি বছরে আমরা সংশয়ের মানসিকতাকে হতাশার থেকে আলাদা করতে পারি।
ফ্রিডরিশ নিৎজশে তাঁর ‘বিয়ন্ড গুড অ্যান্ড ইভিল’-এ লিখেছিলেন, “একজন দার্শনিক মূল্যবোধকে গড়ে তুলবেন। তিনি শুধু নিছক কোনো কিছুর সমালোচনা করবেন না। তিনি জীবনের অভিজ্ঞতায় দাঁড়িয়ে মন্তব্য করবেন, তার বিরোধিতা নয়।” যে কোনো জননীতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। সমালোচনাকে সবসময়েই স্বাগত জানানো হবে, কিন্তু সমালোচনা করার সময়েও প্রামাণ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন। যখন সংশয় প্রকাশ করা অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন যে প্রতিষ্ঠানগুলি সংস্কারকে কার্যকর করে, সেই প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এমন এক ধরনের ভাষ্য শোনা যাচ্ছে, যেখানে সকলে সংশয়কেও পরিশীলিত এক আচরণ বলে বর্ণনা করছেন। এর ফলে, সংস্কারমূলক কাজগুলি নিয়েও ব্যাঙ্গ করা হচ্ছে। কোনো অবস্থার পরিবর্তন যদি যথাযথভাবে না হয়, তখন সেটিকে চিরস্থায়ী ব্যর্থতার এক প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এক্ষেত্রে যে ধারণা তৈরি করা হচ্ছে সেটি হল, ভারত তার নিজের নীতি-নির্ধারকদের কারণেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই ধরনের আচরণে কিছু সমস্যা তৈরি হয়। এর ফলে, বিভিন্ন পরিসংখ্যানে এবং বাজারে আস্থার ঘাটতি জন্মায়, বিনিয়োগকারীদের পিছিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। ভারতকে যে কোনো আলোচনায় বসতে বহির্শক্তিগুলি বাধ্য করতে চায়। এক্ষেত্রে ঐ বহির্শক্তিগুলিকে এ ধরনের মানসিকতা সহায়তা করে।
এক্ষেত্রে সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হল, কোনো কোনো ভাষ্যকার এ ধরনের আচরণের সমর্থনে মত প্রকাশ করে থাকেন। তাঁরা যথেষ্ট শিক্ষিত ও পেশাদার। এঁদের মধ্যে কাউকে কাউকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনিও। এঁরা যেহেতু এখন সরকারের অংশ নন, তাই ভারতের সম্পর্কে বদনাম ছড়িয়ে নিজেদের একটি পরিচিতি গড়ে তুলতে চাইছেন। হয়তো এভাবে তাঁরা নিজেদেরকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা করছেন। এই ধরনের ভাষ্যকাররা বলে থাকেন, ভারতের যে তথ্যভাণ্ডার রয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যেমন ধরুন, পণ্য ও পরিষেবা কর দেশজুড়ে ইনভয়েসের একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যে সংস্কৃতি এক দশক আগেও ছিল না। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে জিএসটি থেকে মোট রাজস্ব আদায় ২২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা প্রতি মাসের গড় হিসেবে ১ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ডিজিটাল পদ্ধতিতে আর্থিক লেনদেন হিসেব পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইউপিআই-এর মাধ্যমে ২ হাজার কোটি লেনদেন হয়েছে যার মোট আর্থিক মূল্য ২৬ লক্ষ কোটি টাকা। এটি এক বৃহৎ যাচাইমূলক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কার্যকর হয়েছে। এক্ষেত্রে তথ্যের বারবার যাচাই করার পাশাপাশি, প্রয়োজনে সংশোধনও করা হয়।
কল্যাণমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে এ ধরনের সমালোচনার অসাড়ত্ব প্রমাণিত হচ্ছে। নীতি আয়োগের ন্যাশনাল মাল্টি-ডায়মেনশনাল পভার্টি সূচক থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবর্ষের মধ্যে ২৪ কোটি ভারতীয় দারিদ্র্যের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ, এক সময়ে ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিলেন, আজ সেই পরিমাণ ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালে প্রত্যক্ষ সুবিধা হস্তান্তরের মাধ্যমে ৪৫ লক্ষ কোটি টাকা সুবিধাপ্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই সময়কালে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা হিসাব বহির্ভুত ব্যয় না হওয়ায় সরকারের সাশ্রয় হয়েছে। বর্তমানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একটি বৃহৎ পরিকাঠামোর আওতাভুক্ত হওয়ায় আজ ৫৬ কোটি জন ধন অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
আর্থিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য গৃহীত সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলির সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির মোট অনুৎপাদক সম্পদের পরিমাণ ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২.১ শতাংশ। ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ১১.২ শতাংশ। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, সুস্থায়ী এক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে, যেখানে ব্যালেন্সশিটের যথাযথ ব্যবহার, শক্তিশালী নজরদার এবং অবিবেচকের মতো ঋণ দেওয়া বন্ধ করার ফলে ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। সমালোচকরা যখন বলে থাকেন, দেশে সংস্কার কার্যকর হয়নি, তখন এই তথ্যগুলিই তাঁদের জন্য প্রথম জবাব।
অনেকে সমালোচনা করে বলেন, ভারতের পক্ষে বৃহদাকারের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাঁরা বোধহয় উৎপাদন সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনগুলি বিবেচনা করেন না। বর্তমানে উৎসাহ-ভিত্তিক উৎপাদন প্রকল্পগুলির মাধ্যমে ১৪টি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ ২ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিক্রির পরিমাণ ১৮ লক্ষ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ফলস্বরূপ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ১২ লক্ষের বেশি। বৈদ্যুতিন সামগ্রীর উৎপাদন এক্ষেত্রে প্রথমসারিতে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে মোট বৈদ্যুতিন সামগ্রী উৎপাদনের পরিমাণ ১১ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে মোবাইল ফোন উৎপাদন হয়েছে ৫.৫ লক্ষ কোটি টাকার, আর রপ্তানি হয়েছে ২ লক্ষ কোটি টাকার। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এই সামগ্রীগুলি টিকে থাকতে পেরেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতিতেও একটি ধারাবাহিকতা নজরে আসছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে মোট পণ্য ও পরিষেবা রপ্তানির পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ – ৮২,৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। চারিদিকে যখন শুল্ক চাপানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশ রক্ষণাত্মক নানা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেই আবহে অংশীদাররা তাদের দক্ষতা তুলে ধরছে। যে বাজারে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের হার বৃদ্ধি পায়, সেখানে ভারতের অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। ভারত থেকে নানা ধরনের সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরে সংস্কার এবং বহির্বিশ্বে নানা সামগ্রীর চাহিদার থেকে বোঝা যায় গৃহীত উদ্যোগগুলি যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে।
একক কোনো প্রকল্প বা এককভাবে কোনো মন্ত্রিসভার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করা যায় না। এক্ষেত্রে পরিকাঠামো, পণ্য আদানপ্রদান এবং প্রশাসনিক সংস্কারের সম্মিলিত উদ্যোগের ফলেই সেটি সম্ভব হয়। এই উদ্যোগের প্রভাব বর্তমানে অনুভূত হচ্ছে। আজ শিল্প করিডরের প্রসার ঘটছে, পণ্য পরিবহণের মানোন্নয়ন হচ্ছে, বন্দরগুলির সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটছে এবং এমন একটি সুসংহত পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে যার ফলে সময় বাঁচছে। এর অর্থ এই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রের নানাবিধ সমস্যা নির্মূল হয়েছে, বরং বলা ভালো, এর থেকে বোঝা যায়, দেশ এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলছে যেখানে বিভিন্ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সময় হ্রাস পাচ্ছে এবং খুব দ্রুততার সঙ্গে কাঙ্খিত পরিষেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে, উৎপাদনশীলতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষিক্ষেত্রে এবং গ্রামাঞ্চলে আজ জোয়ার এসেছে। নানা ধরনের ভুল তথ্য বলা সহজ, কিন্তু সেই ভুল তথ্যগুলির কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করা যায় না। সরকারের বিভিন্ন নীতি নির্ধারিত ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করছে। এর ফলে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলস্বরূপ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি এক সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জল জীবন মিশন গ্রামাঞ্চলে ১২ কোটি ৫০ লক্ষের বেশি বাড়িতে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছে দিয়েছে। এর ফলে, জনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়ন ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পরিবারগুলির নানা ধরনের সুবিধা হয়েছে।
বর্তমানে স্বাস্থ্য, আবাসন এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। পিএম জেএওয়াই-এর আওতায় ২২ কোটি আয়ুষ্মান ভারত কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ব্যয় হ্রাস পাবে। পিএম আবাস যোজনায় ৩ কোটি বাড়ি তৈরি হয়েছে। ফলে, সুবিধাপ্রাপক পরিবারগুলির সম্পদ তৈরি হয়েছে। পিএম উজ্জ্বলা যোজনায় ১০ কোটির বেশি রান্নার গ্যাসের সংযোগ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে, যে বাড়িগুলিতে এক সময় রান্না করার সময় ধোঁয়ায় ভরে যেত, আজ সেই বাড়িগুলি পরিচ্ছন্ন এক পরিবেশ পাচ্ছে। এগুলিই বাস্তবতা যা অনুপ্রেরণাদায়ক।
বিভ্রান্ত করার জন্য রাজ্যগুলির মধ্যে বিভিন্ন সংশয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো খানিকটা অস্পষ্ট ঠিকই, কিন্তু সেটি গ্রহণযোগ্যও। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলির আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। এইসব রাজ্যে সুস্থায়ীভাবে পরিকাঠামো গড়ে তোলার ফলে নতুন নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে, সেখানে সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে। কেন্দ্র একটি প্রতিযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে যেখানে রাজ্যগুলিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে সংস্কারমূলক বিভিন্ন উদ্যোগের যে তথ্য পাওয়া যায় তা যথেষ্ট স্বচ্ছ, যার মাধ্যমে নাগরিকরা সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারেন।
ভারতের গল্প এখনও শেষ হয়নি। এই গল্পে মতামতকেও আহ্বান করা হচ্ছে। তবে, প্রশ্ন হচ্ছে সেই মতামতের গুণগত মান নিয়ে। আমরা নতুন যে বছর শুরু করেছি, সেই বছরে সেই মতামতগুলিকেই বাছাই করব। যখন বিখ্যাত পেশাদার ব্যক্তিরা বিশ্লেষণের নামে বক্রোক্তি করেন, তখন তাঁরা আসলে যে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব, সেই প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করে দেন। এক্ষেত্রে নিৎজশের বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন যথাযথ চিন্তাবিদ সেই ধরনের মূল্যবোধ তৈরি করবেন যা সমাজজীবনের উন্নতির সহায়ক হবে। ভারত বর্তমানে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য কঠিন পথকে বেছে নিয়েছে আর তার ফলাফল সংখ্যার মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রতিটি পরিবারে অনুভূত হচ্ছে। ২০২৬ সালে ভারত সেই ধরনের সমালোচনার দাবি জানাবে যা বিভিন্ন নীতি প্রণয়নে মানোন্নয়ন ঘটাবে। এক্ষেত্রে নিছক কোনো বক্তব্য পেশের প্রয়োজন নেই, যে বক্তব্য অনাস্থা সৃষ্টি করে।
লেখকের মতামত ব্যক্তিগত।





