মঙ্গলবারের সন্ধ্যায় আচমকাই দুঃসংবাদ। আর প্লেব্যাক গাইবেন না অরিজিৎ সিং। দেশের একনম্বর নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর আকস্মিক অবসর ঘিরে ঘনাচ্ছে বিষাদ। প্রশ্ন উঠছে, কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত? কোনও অভিমান থেকেই এমন ভাবনা মাথায় এল গায়কের? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও পরিকল্পনা! কিঁউকি তুম হি হো… অরিজিতের বিদায়ে গরিব হল প্লে-ব্যাক, গানের বাদশার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জল্পনা। কিছু দিন আগেই বাংলা ছবি ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ ছবিতে অরিজিতের কণ্ঠে ‘ক্ষণে গোরাচাঁদ’ গানটিতে সকলে বুঁদ হয়েছিলেন। তার ঠিক আগেই ‘ধুরন্ধর’-এ ‘গেহরা হুয়া’ গানটিও প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। অবশ্য জনপ্রিয়তা অরিজিতের কাছে নতুন কিছু নয়। যে সাফল্য তিনি গত দুই দশক ধরে পেয়েছেন তা অবিশ্বাস্য। এমন এক সফল কেরিয়ার সত্ত্বেও মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই এমন ঘোষণা ঘিরে বিস্ময় জাগাই স্বাভাবিক! এদিন অরিজিৎ সোশাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘সকলকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। শ্রোতা হয়ে আমাকে এত বছর ধরে ভালোবাসার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমি আনন্দের সঙ্গেই ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে আমি আর নতুন কোনও কাজ করব না প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে। আমি এটা থেকে সরে আসছি। যাত্রাটা ছিল সুন্দর।’তবে সেই সঙ্গেই অনুরাগীদের আশ্বস্তও করেছেন গায়ক। জানিয়েছেন, ‘ঈশ্বর আমার প্রতি সত্যিই সদয় ছিলেন। আমি ভালো সঙ্গীতের একজন ভক্ত এবং ভবিষ্যতে একজন ছোট শিল্পী হিসেবে নিজে আরও শিখব ও আরও কাজ করব। আপনাদের সকলের সমর্থনের জন্য আবারও ধন্যবাদ। আমার কিছু অসমাপ্ত কাজ বাকি আছে, সেগুলো শেষ করব। তাই এই বছর আপনারা কিছু নতুন গান পেতে পারেন। এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে আমি গান তৈরি করা বন্ধ করব না।’ এই কথা জেনে অবশ্য ক্ষণিকের স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু আদপে অরিজিৎকে এতদিন প্লেব্যাক গায়ক হিসেবেই মূলত দেখা গিয়েছে। তাই সেই ভূমিকা থেকে তাঁর একেবারে সরে যাওয়ায় হৃদয়ে পাষাণভার অনুভব করছেন অনুরাগীরা। প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, ক্ষোভের নানা মুহূর্ত থমকে রয়েছে অরিজিতের গানে। নিঃসন্দেহে সেই সব গান ও শ্রোতার ব্যক্তিগত মনোজগৎ একাকার হয়ে রয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই এমন বিষণ্ণতা আসতেই পারে। আজকের জেন জি থেকে প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে বার্ধ্যক্যে পা রাখা মানুষটিরও মনের কথা গানের সুরে বেঁধে রেখেছেন অরিজিৎ।অরিজিৎ সিংয়ের কেরিয়ারে অবশ্য বাধা পড়েছে নানা রকমের। ফেম গুরুকুলে অরিজিৎ তার কাছের বন্ধু শমিত ত্যাগীকে বাঁচানোর পরিবর্তে মনিকা গাডগিলকে ভোট দিয়েছিলেন। যা নিয়ে বিতর্ক ঘনিয়েছিল। ইলা অরুণের ভর্ৎসনার মুখেও পড়েছিলেন অরিজিৎ। সেই প্রতিযোগিতায় অরিজিৎ চ্যাম্পিয়ন তো দূরের কথা, হয়েছিলেন ষষ্ঠ। কিন্তু সেই তরুণই বলিউডে পা রেখে নিজেকে ক্রমশ অপরিহার্য করে তোলেন। শাহরুখ, সলমন, রণবীর থেকে শুরু করে হালফিলের সব প্রধান গায়ক আর তাঁর কণ্ঠ ক্রমশ একাকার হয়ে গিয়েছে গত কয়েক বছরে। তবে অরিজিৎ সিংয়ের কেরিয়ারের সবচেয়ে বিতর্ক সলমন খানের সঙ্গে মতানৈক্য। ২০১৪ সালের স্টার গিল্ড অ্যাওয়ার্ডসের মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া গোলমালের রেশ গড়ায় বহুদূর। তবে পরবর্তী সময়ে তা স্থায়ী হয়নি। মাঝে শান্তিনিকেতনে তাঁর দেহরক্ষীদের আচরণ নিয়েও বিতর্ক ঘনিয়েছে। কিন্তু সেই সব বিতর্ক অতীত হতেও সময় নেয়নি। সকলের হৃদয়ের রাজা হয়েই বিচরণ করেছেন অরিজিৎ। তবে অরিজিতের এই অসীম জনপ্রিয়তার নেপথ্যে কি কেবলই কণ্ঠ? কণ্ঠের জাদুর পাশাপাশি তারকা, ক্রমে মহাতারকা হয়েও তিনি পা রেখে দিয়েছেন মাটিতেই। এমন ‘ডাউন টু আর্থ’ মানুষকে ভালো না বেসে বোধহয় উপায় থাকে না। এই বাংলার গায়কদের সঙ্গেও তাঁর রীতিমতো সুসম্পর্ক। সকলেরই বড় আপন তিনি। জিয়াগঞ্জের রাস্তায় নিজেই স্কুটি চালিয়ে বেরিয়ে পড়েন অরিজিৎ। তাঁর কোনও ভ্রূক্ষেপই থাকে না এসব বিষয়ে। এই সহজতাই তাঁর ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’। তবে এরই পাশাপাশি এই সহজতার কারণেই তিনি স্পষ্টবক্তাও। আর তা থেকেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সকলেরই মনে রয়েছে আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে আচমকাই ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’ গানটি গেয়ে উঠেছিলেন অরিজিৎ। যার মধ্যে রাজনৈতিক রং খুঁজে পেয়েছিলেন অনেকেই। তবে বিতর্ক স্থায়ী হয়নি। মিলিয়ে গিয়েছে। থেকে গিয়েছে মহাতারকা গায়কের গানের রেশ। তবে অরিজিৎ জানিয়ে দিয়েছেন, গান থামছে না। হয়তো রুপোলি পর্দায় প্রিয় নায়কের কণ্ঠে তাঁর গান আর শোনা যাবে না। কিন্তু ডিজিটাল বিশ্বে গায়ক দেখা দেবেন নয়া অবতারে। সোশাল মিডিয়ায় সেরকমই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। আপাতত তাঁর সেই নতুন ভবিষ্যতের অপেক্ষায় গোটা বিনোদুনিয়া। তবে এছাড়াও অপেক্ষা থাকবে পরবর্তী ছবিতে তাঁর গাওয়া গান শোনার। আপাতত জানা গিয়েছে সলমনের ‘গালওয়ান’ ছবিতে শোনা যাবে অরিজিতের কণ্ঠ। পাশাপাশি গুঞ্জন রয়েছে ‘কিং’ ছবিতে এড শিরানের গাওয়া ‘স্যাফায়ার’ গানটির একটি ভারতীয় সংস্করণে নাকি রয়েছে অরিজিতের কণ্ঠ। আপাতত সেই সব হিসেবের কড়ি আগলে অরিজিতের নতুন গান-জীবনের অপেক্ষায় সকলে।
সোশাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, ‘সকলকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। শ্রোতা হয়ে আমাকে এত বছর ধরে ভালোবাসার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমি আনন্দের সঙ্গেই ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে আমি আর নতুন কোনও কাজ করব না প্লে ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে। আমি এটা থেকে সরে আসছি। যাত্রাটা ছিল সুন্দর।’সেই সঙ্গেই তিনি আরও লিখেছেন, ‘ঈশ্বর আমার প্রতি সত্যিই সদয় ছিলেন। আমি ভালো সঙ্গীতের একজন ভক্ত এবং ভবিষ্যতে একজন ছোট শিল্পী হিসেবে নিজে আরও শিখব ও আরও কাজ করব। আপনাদের সকলের সমর্থনের জন্য আবারও ধন্যবাদ। আমার কিছু অসমাপ্ত কাজ বাকি আছে, সেগুলো শেষ করব। তাই এই বছর আপনারা কিছু নতুন গান পেতে পারেন। এটা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে আমি গান তৈরি করা বন্ধ করব না।’ স্বাভাবিক ভাবেই এমন ঘোষণা মনখারাপ অনুরাগীদের। অকস্মাৎ এমন ঘোষণা অনেকেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। আদৌ কি গায়ক এমন ঘোষণা করলেন, সন্দেহ প্রকাশ অনেকেরই। ১৯৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল জন্ম অরিজিতের। একটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং সাতটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছেন তিনি। গত বছরই পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন তিনি। ২০০৫ সালে ‘ফেম গুরুকুল’-এর প্রতিযোগী হিসেবেই প্রথম সকলের নজর কাড়েন অরিজিৎ। যদিও তিনি সেই প্রতিযোগিতায় জিততে পারেননি। কিন্তু এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তবে পথটা সহজ ছিল না। ‘মার্ডার ২’ ছবিতে গাওয়া তাঁর ‘ফির মহব্বত’ গানটিই ছিল বলিউডে প্রথম গান। বাকিটা ইতিহাস। ক্রমে বলিউডের মেল প্লেব্যাক ও অরিজিৎ প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। অরিজিতের বয়স মাত্র ৩৮। এখনও চল্লিশই পেরোননি। সকলেই নিঃসংশয় ছিলেন সামনে পড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ সোনালি পথ। কিন্তু আচমকাই প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি। সকলকে অবাক করে দিয়ে। কিন্তু সেই সঙ্গেই গায়ক এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি ছবিতে গান গাইবেন না। কিন্তু তাঁর মিউজিক্যাল কেরিয়ার থমকাচ্ছে না। অর্থাৎ অন্যত্র সঙ্গীতচর্চা যেমন করছেন করবেন। যা নিয়ে জল্পনা, তাহলে কি অন্য কোনওভাবে খুব বড় কিছু করতে চলেছেন অরিজিৎ? উত্তরের খানিকটা যেন সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে। তাঁর অসংখ্য অজস্র অনুরাগীদের মনখারাপের সময়ে সেই প্রশ্নের চেয়েও জরুরি হয়ে উঠছে প্লেব্যাক থেকে আচমকাই তাঁর সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত।





