১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি ভারতীয় সংবিধানের আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। ওই দিন থেকে ভারত সাধারণতন্ত্র হয়। ভারত একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যা স্মরণ করে প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয়। নয়া দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের কাছে কর্তব্য পথে অনুষ্ঠিত জমকালো প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ এবং এরপর ভারতীয় বিমানবাহিনীর ফ্লাইপাস্ট এই দিনের প্রধান আকর্ষণ। ২০২৬ সালেও ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে একটি পরিচিত প্রশ্ন ফের মাথাচাড়া দিয়েছে। এবার ৭৭তম নাকি ৭৮তম প্রজাতন্ত্র দিবস? ২০২৬ সালে ভারত প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার ৭৭তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো-সহ সরকারি সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই বছরের উদযাপন এবং কুচকাওয়াজের থিম আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুষ্ঠানটিকে ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ১৯৫০ সালে প্রথম উৎসব থেকে প্রতিটি উৎসব গণনা করা শুরু হয়। একবার এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলে, নম্বর দেওয়া সহজ এবং ধারাবাহিক হয়ে যায়। ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ ছিল প্রথম সাধারণতন্ত্র দিবস, ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫১-তে দ্বিতীয় এবং গণনা প্রতি বছর অবিরাম বা রিসেট না করে একটানা চলতে থাকে। এই যুক্তিতে ২৬শে জানুয়ারি ২০২৫ ছিল ৭৬তম সাধারণতন্ত্র দিবস এবং ২৬শে জানুয়ারি ২০২৬ স্বাভাবিকভাবেই ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবস হবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “২০২৬ সালের ২৬শে জানুয়ারি ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে নতুন দিল্লির কর্তব্য পথে রাজ্য/কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ১৭টি এবং বিভিন্ন মন্ত্রক/বিভাগ/সার্ভিসের ১৩টি-সহ মোট ৩০টি ট্যাবলো প্রদর্শিত হবে।” আরও বলা হয়েছে, “‘স্বাধীনতার মন্ত্র: বন্দে মাতরম’ এবং ‘সমৃদ্ধির মন্ত্র: আত্মনির্ভর ভারত’ এই বিস্তৃত থিমের অধীনে ট্যাবলোগুলোতে জাতীয় সঙ্গীত বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর এবং বিভিন্ন খাতে ক্রমবর্ধমান আত্মনির্ভরশীলতার ওপর ভিত্তি করে জাতির দ্রুত অগ্রগতির এক অনন্য মিশ্রণ তুলে ধরা হবে, যা ভারতের সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সিক্ত।”
সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তাঁর ভাষণে উঠে এল নারী শক্তির জয়গান। জানালেন, ”দেশের অগ্রগতির লক্ষ্যে মহিলাদের সক্রিয় ও স্বাবলম্বী হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” যুবসমাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “যুবসমাজ দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে।” জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন, “দেশের উন্নতির জন্য মহিলাদের সক্রিয় ও স্বাবলম্বী হওয়া একান্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমাদের মা ও বোনেরা অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে চলেছেন। দেশের উন্নয়নে তাঁরা সক্রিয় অবদান রাখছেন। উন্নত ভারত গঠনে নারীশক্তির ভূমিকা একান্ত আবশ্যক। তাঁদের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি দেশের লিঙ্গ সমতা ও গণতন্ত্রে উজ্জ্বল অবদান রাখবে। রাষ্ট্রপতি বলেন, মহিলাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কেন্দ্রীয় প্রচেষ্টা বহু ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে তুলেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে “বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও” অভিযান শিক্ষা ক্ষেত্রে মহিলাদের উৎসাহিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার আওতায় এখন পর্যন্ত ৫৭ কোটিরও বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশই মহিলাদের। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত ১০ কোটিরও বেশি মহিলা যুক্ত হয়েছেন। কৃষিক্ষেত্র থেকে মহাকাশ, স্টার্ট-আপ থেকে সেনা সর্বত্র মহিলাদের উজ্জ্বল উপস্থিতির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আজ আমাদের মেয়েরা ক্রীড়াক্ষেত্রে বিশ্বপর্যায়ে নজির সৃষ্টি করেছে। গত বছরের নভেম্বরে দেশের মেয়েরা আইসিসি মহিলা বিশ্বকাপ এবং তারপর দৃষ্টিহীনদের মহিলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। দাবা বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দুই ভারতীয় মহিলা। আজ পঞ্চায়েত ক্ষেত্রেও মহিলা প্রতিনিধির সংখ্যা প্রায় ৪৬ শতাংশ। মহিলাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে নয়া উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।” রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ভারতীয় জ্ঞান, ঐতিহ্য, দর্শন, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, সাহিত্য এবং শিল্প বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। আমাদের কাছে গর্বের বিষয় যে “জ্ঞান ভারতম মিশন”-এর মতো প্রচেষ্টা ভারতীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও প্রচার করছে। ভারতীয় ভাষা এবং ঐতিহ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে, স্বনির্ভরতার প্রচেষ্টাকে এক সাংস্কৃতিক ভিত্তি প্রদান করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্রের শক্তি ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বহুমুখী উন্নয়নের পথে এগোতে হলে ঐক্য, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখা জরুরি। দেশের যুব সমাজের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্রের ভিত মজবুত রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এখন অনেকটাই যুবকদের কাঁধে। শিক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন থেকে শুরু করে সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তরুণরাই নতুন ভারতের দিশা দেখাচ্ছে।





