বিতর্ক এবং রাজনৈতিক তরজার মধ্যেই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম’-কে নতুন আঙ্গিক দিয়ে এ বছর সাধারণতন্ত্র দিবসের ‘থিম গান’ হিসাবে উপস্থাপন করল নরেন্দ্র মোদির সরকার। অনেকের অনুমান, চলতি বছরে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটকে নজরে রেখেই এই সিদ্ধান্ত। সাধারণতন্ত্র দিবসের ‘থিম গান’ হিসাবে উপস্থাপন করল নরেন্দ্র মোদির সরকার। ১৯৮৮ সালে তৈরি হয়েছিল ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’। সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ভীমসেন জোশী। কথা লেখেন পীযূষ পাণ্ডে। সেই গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, এম বালামুরলীকৃষ্ণর মতো শিল্পী। ভিডিওতে ছিলেন অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন, জিতেন্দ্র, হেমা মালিনী, শর্মিলা ঠাকুরের মতো তারকা। ১৯৮৮ সালের স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরেই চালানো হয়েছিল ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’। দেশের ঐক্যবদ্ধতার প্রতীক হিসাবে গানটি তৈরি করা হয়েছিল। এ বছর ‘বন্দে মাতরম’-কে বেছে নেওয়ার কারণও একই। কিছু দিনে আগে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে জোর বিতর্ক হয়েছিল জাতীয় রাজনীতিতে। গত মাসে শেষ হওয়া শীতকালীন অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কে গানটির রচয়িতা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করায় তৃণমূলের আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নিজেকে শুধরে নিয়ে পরে ‘বঙ্কিমবাবু’ বলে বিষয়টি সামলে নেওয়ার চেষ্টা প্রধানমন্ত্রী করলেও, এ নিয়ে প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে রাজ্য বিজেপি। তৃণমূলের অভিযোগ, বঙ্কিম-অস্ত্রে শান দিয়ে বাংলা জয়ের চেষ্টা করছে বিজেপি। তা করতে গিয়ে বিপাকে! সাধারণতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজেও সেই বন্দে মাতরমকে অন্যতম মূল থিম হিসাবে তুলে ধরা হল। বন্দে মাতরমের প্রথম স্তবকগুলির ভাবনা শিল্পী তেজেন্দ্রকুমার মিত্রের যে ছবিগুলিতে মূর্ত হয়ে উঠেছিল, সেই ছবিগুলির প্রতিলিপি ছিল কর্তব্য পথে দর্শকের আসনের পিছনে। মূল মঞ্চে শিল্পকর্মের মাধ্যমেও সম্মান জানানো হয় বঙ্কিমচন্দ্রকে। ‘আত্মনির্ভর ভারত’কে সঙ্গী করে তামিলনাড়ুর ট্যাবলোতে তুলে ধরা হল, রাজ্যের প্রাচীন সাংস্কৃতি এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন। এছাড়া কেরল, মহারাষ্ট্র, নাগাল্যান্ড, জম্মু-কাশ্মীরের ট্যাবলোয় দেখা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এবারই প্রথমবার বলিউডের ট্যাবলো দেখা যায় কর্তব্য পথে। ছত্তিশগড়ের ট্যাবলোয় তুলে ধরা হয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আদিবাসী যোদ্ধাদের ভূমিকা। আদিবাসী ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং তাঁদের ঐতিহাসিক অবদান।রাজধানীর রাজপথে এবার বঙ্কিমকে নিয়ে মোট ৩০টি ট্যাবলো ছিল। বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন্দ্রেরও বিশেষ ট্যাবলো ছিল। কর্তব্য পথে আয়োজিত হয় বিশেষ নৃত্য অনুষ্ঠান। ট্যাবলোর সারিতে প্রথমেই ছিল গুজরাট। যেখানে দেখা গেল মহাত্মা গান্ধী ও ভিকাজি কামাকে। তুলে ধরা হল স্বাধীনতা দিবসে গুজরাটের ভূমিকা। সাধারণতন্ত্র দিবসে বাংলার ট্যাবলোয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্য়ায়। সঙ্গে দেখা গিয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। ট্যাবলোয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, বিবেকানন্দ, বিনয়-বাদল-দীনেশ, মাতঙ্গিনী হাজরার মতো বিপ্লবীদেরও তুলে ধরা হয়। বাংলাকে স্বাধীন করতে কত রক্ত দিয়েছে বাঙালি, তা তুলে ধরা হয়েছে ট্যাবলোয়। বলে রাখা ভালো, কর্তব্যপথে বাংলার ট্যাবলো নিয়ে এবারও জটিলতা কম হয়নি। হাজার টানাপোড়েনের পর ১৭টি রাজ্যের মধ্যে বাংলার ট্যাবলো সগৌরবে অংশ নেয় এবারের কুচকাওয়াজে।

কয়েকমাস পর বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে সংসদে দাঁড়িয়ে মোদির বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন নিয়ে গর্জে ওঠে গোটা বাংলা। বারবার গেরুয়া শিবিরের বিরুদ্ধে বাংলার মনীষী, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অপমানের অভিযোগ উঠেছে। যদিও সে অভিযোগ নস্যাৎ করতে তৎপর পদ্ম শিবির। এই পরিস্থিতিতে কর্তব্য পথে বাংলার ট্যাবলো যে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। দেশজুড়ে পালিত ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস। এদিন সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘ভারতের সম্মান, গৌরব ও মর্যাদার প্রতীক এই মহান জাতীয় উৎসব আপনাদের জীবনে নতুন শক্তি ও উদ্দীপনা সঞ্চার করুক।’ এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও। তিনি লিখেছেন, ‘প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আমাদের সংবিধানে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতি আবারও অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার দিন এটি। সামাজিক সম্প্রীতির পথে এগিয়ে চলার সংকল্প গ্রহণ করা জরুরি। আজ একটি প্রাচীন প্রবাদ মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি। স্বাধীনতার মূল্য হল চিরন্তন সতর্কতা। সেই সতর্কতা বজায় রাখার জন্যই সকলকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের প্রজাতন্ত্র এবং সংবিধান আজ সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ দাবি করে। এই বিশেষ দিনে দেশের সকল স্বাধীনতা সংগ্রামী, সংবিধান প্রণেতা, আমাদের জওয়ান এবং ভারতের সাধারণ নাগরিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ রীতি অনুযায়ী জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু। এরপর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময় ১০৫ মিমি লাইট ফিল্ড গান দিয়ে ২১ বার ফায়ার। এটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি একটি আর্টিলারি ব্যবস্থা। ১৭২ ফিল্ড রেজিমেন্টের ১৭২১ সেরিমোনিয়াল ব্যাটারির তরফে এই ফায়ারিং। ১৯৫০ সালের এই দিনেই সংবিধান গৃহীত হয়েছিল। ভারত একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বছরের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনের মূল বিষয় হল “বন্দেমাতরমের ১৫০ বছর” পূর্তি, যা জাতীয় ঐক্য এবং স্বাধীনতার জন্য করা আত্মত্যাগকে প্রতিফলিত করে। দিনটি নতুন দিল্লির কর্তব্য পথে একটি জমকালো কুচকাওয়াজের মাধ্যমে উদযাপিত হয়। প্রদর্শিত হয় সামরিক শক্তি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। ভারতের রাষ্ট্রপতি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। কুচকাওয়াজের পর বিভিন্ন রাজ্যের লোকনৃত্য, সঙ্গীত এবং ট্যাবলো প্রদর্শিত হয়। পদ্ম পুরস্কার এবং বীরত্ব পুরস্কারও প্রদান করা হয়।

সাধারণতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান হল কলকাতার রেড রোডে। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস-সহ বিশিষ্টরা। রাজ্য পুলিশের প্রশিক্ষিত বাহিনী, সেনাবাহিনীর একাধিক ইউনিট কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী এদিন রেড রোডে অভিবাদন গ্রহণ করেন। এদিন সকাল থেকেই রেড রোড-সহ ধর্মতলার একাধিক রাস্তায় নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে রেড রোডে শুরু হয় প্রজাতন্ত দিবসের অনুষ্ঠান। নির্ধারিত সময়েই রেড রোডে উপস্থিত হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে রেড রোডের মঞ্চে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে আসন গ্রহণ করেছিলেন বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্দিষ্ট সময়ে রেড রোডে উপস্থিত হয়েছিলেন রাজ্যপাল বোসও। এবারের কুচকাওয়াজে অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল একাধিক স্কুলের প্যারেড। পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল, মিত্র ইনস্টিটিউশন, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল, উচ্চ বালিকা বিদ্যামন্দির বড়িশা, লোরেটো হাউসের পড়ুয়ারা প্যারেডে অংশ নিয়েছিল। ছিল ব্যান্ড পার্টিও। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন অংশের, পাহাড় থেকে সাগরের সংস্কৃতির সমন্বয়ে একটি প্রদর্শনীও হয়। রেড রোডের কুচকাওয়াজে বিশেষ আকর্ষণ ছিল ভৈরব বাহিনী। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে শত্রুর উপর। তাই ২৪ ঘণ্টা ইউনিফর্ম পড়ে, হাতে স্বয়ংক্রিয় তৈরি থাকে সেনার ‘ভৈরব ব্যাটেলিয়ন’। আগ্নেয়াস্ত্র হাতে, তাদের মুখের অংশে রং। পরনে ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম, মাথায় টুপি, হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। যে কোনও অবস্থায় তাদের তৈরি থাকতে হয়। কোনও নির্দেশ পেলেই শত্রুদের প্রথম ধাক্কা যাতে দেওয়া যায়, সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে এই বাহিনীকে। সূত্রের খবর, জম্মু ও কাশ্মীর, রাজস্থান এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের লাইন অফ কন্ট্রোল ও লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে ‘ভৈরব ব্যাটেলিয়ন’ কে মোতায়েন করা হয়েছে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে শত্রুদেশ থেকে হামলার খবর পেলে তাদের রোখার ক্ষমতা রাখে ভৈরব’।রেড রোডের অনুষ্ঠান ঘিরে এলাকা নিরাপত্তার কড়া বলয়ে মোড়া ছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে ১৭টি জোনে ভাগ করা হয়েছিল এই এলাকা। প্রতিটি জোনের দায়িত্বে ছিলেন একজন করে উপ নগরপাল, সেক্টর পর্যায়ে সহকারী কমিশনার ও ইনস্পেক্টর পদের অফিসাররা ছিলেন। এছাড়াও প্রায় ২ হাজারের বেশি পুলিশ কর্মী মহানগরে এদিন নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন রয়েছে বলে খবর।





