৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে পদ্ম পুরস্কার প্রাপকদের নামের তালিকা ঘোষণা করেছে কেন্দ্র সরকার। পদ্মসম্মানপ্রাপকদের নাম ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। এ বছর পদ্ম বিভূষণ, পদ্মভূষণ এবং পদ্মশ্রী পাচ্ছেন মোট ১৩১ জন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন বঙ্গভাষী ও বঙ্গবাসী। পদ্ম বিভূষণ সম্মান পাচ্ছেন ৫ জন, পদ্ম ভূষণ ১৩ জন ও পদ্মশ্রী সম্মান দেওয়া হচ্ছে ১১৩ জনকে। বাংলা থেকে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-সহ বাংলার মোট ১১ জনের হাতে এবারের পদ্মসম্মান উঠবে। পশ্চিমবঙ্গের কেউ এ বারের পদ্মবিভূষণ ও পদ্মভূষণ প্রাপকের তালিকায় স্থান পাননি। ২০২৬-এও সাহিত্য, শিল্প, খেলা, চিকিৎসা, ব্যবসা, সমাজসেবা— নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষকে পদ্মসম্মান দেওয়া হচ্ছে। পদ্মশ্রী পাচ্ছেন বাঙালি অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। টলিউডের অন্যতম স্তম্ভ প্রসেনজিৎ দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ৩৫০-এরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ছোটপর্দার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি সিরিজ়েও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। সেই প্রসেনজিতের নাম রয়েছে এ বারের পদ্মপ্রাপকদের তালিকায়। শিক্ষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পদ্মশ্রী পাচ্ছেন অশোককুমার হালদার। মালদহের অশোক কর্মজীবন শুরু করেছিলেন রেলের নিরাপত্তাকর্মী হিসাবে। পরে দলিত সাহিত্যিক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। পদ্মসম্মানের তালিকায় তাঁর নামও রয়েছে। পূর্ব বর্ধমানের তাঁতশিল্পী জ্যোতিষ দেবনাথকেও দেওয়া হচ্ছে পদ্মশ্রী। গত প্রায় চার দশক ধরে জামদানি শিল্পী হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছেন জ্যোতিষ। ১০ হাজারেরও বেশি তাঁতশিল্পীকে কাজ শিখিয়েছেন হাতেকলমে। তাঁর নামও রয়েছে পদ্মপ্রাপকদের তালিকায়। পূর্ব বর্ধমানের তাঁতশিল্পী জ্যোতিষ দেবনাথকেও দেওয়া হচ্ছে পদ্মশ্রী। গত প্রায় চার দশক ধরে জামদানি শিল্পী হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছেন জ্যোতিষ। ১০ হাজারেরও বেশি তাঁতশিল্পীকে কাজ শিখিয়েছেন হাতেকলমে। তাঁর নামও রয়েছে পদ্মপ্রাপকদের তালিকায়। পদ্মশ্রী পাচ্ছেন তবলাবাদক কুমার বসু। বেনারস ঘরানার এই শিল্পী ২০০৭ সালে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান। রাজ্য সরকারের তরফেও পুরষ্কৃত হয়েছেন কলকাতার এই তবলাবাদক। বীরভূমের কাঁথাশিল্পী তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়কে পদ্মশ্রী দেওয়া হচ্ছে। কাঁথাসেলাইয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে তাঁর। ২০,০০০-এরও বেশি মহিলাকে কাজ শিখিয়ে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করেছেন তৃপ্তি। এর আগেও তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বঙ্গশ্রী পুরষ্কার, জাতীয় পুরষ্কার এবং কেন্দ্রীয় বস্ত্র মন্ত্রকের ‘শিল্পগুরু’ পুরষ্কার পেয়েছেন। এ বার পদ্মশ্রীর পালকও জুড়ছে তাঁর মুকুটে। পদ্মসম্মান দেওয়া হচ্ছে বাংলার সন্তুরবাদক তরুণ ভট্টাচার্যকে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য হৃদ্রোগের চিকিৎসক সরোজ মণ্ডলও পদ্মশ্রী পাচ্ছেন। সাহিত্য ও শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য পদ্মশ্রী দেওয়া হচ্ছে সাঁওতালি ভাষার স্বনামধন্য সাহিত্যিক রবিলাল টুডুকে। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য পদ্মসম্মান পাচ্ছেন রসায়নের অধ্যাপক ও গবেষক মহেন্দ্রনাথ রায়। একই বিভাগে পদ্মপুরস্কার পাচ্ছেন দার্জিলিঙের শিক্ষাবিদ তথা সমাজকর্মী গম্ভীর সিংহ ইয়োনজ়োনে। গত বছর পদ্মপ্রাপকদের তালিকায় বাংলা থেকে ছিলেন গায়ক অরিজিৎ সিং, অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মমতাশঙ্কর, সরোদবাদক তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, এসবিআই-এর প্রাক্তন চেয়ারপার্সন অরুন্ধতী ভট্টাচার্য প্রমুখেরা। সব মিলিয়ে গত বারেও ১১ জন বঙ্গতনয় ও বঙ্গবাসীর নাম ছিল পদ্মসম্মানের তালিকায়। এ বছরও বঙ্গ থেকে একাদশ জনই সেই তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন। শুধু বাংলার নয়, সারা ভারতের মোট ১৩১ জন গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বকে এ বার পদ্মসম্মানের তালিকায় রাখা হয়েছে। পাঁচ জনকে পদ্মবিভূষণ এবং ১৩ জনকে পদ্মভূষণ দেওয়া হয়েছে। বিনোদন জগতে অসামান্য অবদানের জন্য মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ দেওয়া হয়েছে প্রয়াত অভিনেতা ধর্মেন্দ্রকে। কেরলের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী ভিএস অচ্যুতানন্দনকেও দেওয়া হয়েছে পদ্মবিভূষণ। পদ্মভূষণ পেয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী অলকা যাজ্ঞিক, ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবু সোরেন এবং আমেরিকা নিবাসী টেনিস কিংবদন্তি বিজয় অমৃতরাজ। ভারতীয় ক্রিকেটের দুই তারকা ক্যাপ্টেন রোহিত শর্মা এবং হরমনপ্রীত কৌরেরও নাম রয়েছে পদ্মশ্রীপ্রাপকদের তালিকায়। একই দিনে অশোক চক্র সম্মানও ঘোষণা করেছে কেন্দ্র। এ বার অশোক চক্র সম্মানে ভূষিত হয়েছেন মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্ল। বীরত্বের জন্য দেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুক্লাকে। উল্লেখ্য, এর আগে আর এক মহাকাশচারী তথা উইং কমান্ডার রাকেশ শর্মাও অশোক চক্র পেয়েছিলেন।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। প্রায় চার দশকের অভিনয় জীবনে টলিউডকে উর্বর করতে অনেক অবদান রয়েছে তাঁর। সেই অবদানের কথা মাথায় রেখেই টলিউডের সুপারস্টারকে এই সম্মাননা। একটা সময় বাংলা ছবির দুঃসময়ে প্রায় সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন ‘বুম্বা’। তাঁর হাত ধরেই গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল কমার্শিয়াল ছবি। গোটা ফিল্মি কেরিয়ারে অভিনয় করেছেন প্রায় সাড়ে তিনশোর বেশি ছবিতে। ১৯৬৮ সালে বাবা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ ছবিতে প্রথম শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে হাতেখড়ি। বাংলা ছবির হিরো হিসেবে তিনি ধরা দেন ‘অমরসঙ্গী’ ছবির হাত ধরে। নিভৃতে নানা ক্ষেত্রে দেশসেবায় নিয়োজিত ১৩১ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে রবিবার সন্ধ্যায়। আগামী মার্চ বা এপ্রিল মাসে তাঁদের হাতে ২০২৬ সালের পদ্ম সম্মান তুলে দেবেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। প্রকাশিত নামের তালিকায় রয়েছেন সাহিত্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, কলা, সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক ক্ষেত্রে নিজের জীবন সমর্পিত করা ভারতের কৃতি সন্তানরা। এই তালিকায় রয়েছেন বাংলার কিংবদন্তী অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-সহ ১১ জন বাঙালি। সম্মান প্রাপ্তির খবর শোনার পরই যারপরনাই খুশি মিস্টার ইন্ডাস্ট্রি’। স্মৃতিতে বুঁদ হলেন তাঁর বন্ধু-পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের এই প্রাপ্তি নিয়ে প্রসেনজিৎ বলেন, “ভারত সরকারকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে এই সম্মানের যোগ্য মনে করার জন্য। এই প্রাপ্তি আমার একার নয়। গত চল্লিশ বছরে আমার সঙ্গে যারা কাজ করেছেন আমার পরিচালক, আমার টেকনিশিয়ান বন্ধু, আমার প্রযোজক থেকে নায়িকারা যারা আমার সঙ্গে এতদিন কাজ করেছেন, আমার ভুল ধরে দিয়েছেন আমাকে তৈরি করেছেন এটা তাঁদেরও সম্মান। কারণ তাঁরা না থাকলে আমি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় হতে পারতাম না।” প্রসেনজিৎ আরও বলেন, “আমার ছেলে মিশুককে আজ খুব মিস করছি। আর সবথেকে বেশি মিস করছি আমার মা। যাঁকে ছাড়া আমি প্রসেনজিৎ হয়ে উঠতে পারতাম না। আর আরও একজনকে খুব মনে পড়ছে। আসলে আমার জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হয়েছে গত পনেরো বছর ধরে। নতুন প্রসেনজিৎকে মানুষ পেয়েছেন। আর যে মানুষটা আমাকে বুঝেছিলেন যে, আমি এটা পারি। আমার মধ্যে একটা অন্য অভিনেতা লুকিয়ে রয়েছে তিনি আমার খুব কাছের বন্ধু ঋতুপর্ণ ঘোষ। আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই কিন্তু সবসময় যেন মনে হয় আমাদের সঙ্গেই আছেন। আজ ও থাকলে খুব খুশি হত। আমার দর্শককে একটাই কথা বলতে চাই আপনারা না থাকলে আমি এতটা পথ আসতে পারতাম না। যা হয়েছে সব আপনাদের জন্য।” একটা সময় বাংলা ছবির দুঃসময়ে প্রায় সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন ‘বুম্বা’। তাঁর হাত ধরেই গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল কমার্শিয়াল ছবি। গোটা ফিল্মি কেরিয়ারে অভিনয় করেছেন প্রায় সাড়ে তিনশোর বেশি ছবিতে। ১৯৬৮ সালে বাবা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ ছবিতে প্রথম শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে হাতেখড়ি। বাংলা ছবির হিরো হিসেবে তিনি ধরা দেন ‘অমরসঙ্গী’ ছবির হাত ধরে।
বিশ্বজয়ের কাণ্ডারি দুই অধিনায়ককে পদ্মসম্মানে ভূষিত করছে কেন্দ্র। প্রথমবার ভারতকে মহিলা বিশ্বকাপ জেতানো অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর পাচ্ছেন পদ্মশ্রী পুরস্কার। ভারতকে টি-২০ বিশ্বকাপ এবং চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতানো ক্যাপ্টেন রোহিত শর্মাও রয়েছেন পদ্মশ্রী প্রাপকের তালিকায়। টেনিস কিংবদন্তি বিজয় অমৃতরাজকে পদ্মভূষণ সম্মান দেওয়া হবে। সবমিলিয়ে ২০২৬ সালের পদ্ম সম্মান পাচ্ছেন মোট ৯ ক্রীড়াবিদ। ২০২৬ সালের একমাত্র ক্রীড়াবিদ হিসাবে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মভূষণ পাচ্ছেন বিজয় অমৃতরাজ। ১৯৮৩ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। তারও আগে পেয়েছিলেন অর্জুন পুরস্কার। ভারতীয় ক্রীড়ায় অসামান্য অবদানের জন্য় এবার পদ্মভূষণ পাচ্ছেন তিনি। টেনিস কিংবদন্তি বর্তমানে অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তিনজন ক্রিকেটার রয়েছেন এবারের পদ্মপ্রাপকদের তালিকায়। গতবছর দেশের মাটিতে প্রথমবার মহিলাদের বিশ্বকাপ জেতে ভারত। উইমেন ইন ব্লুর অধিনায়ক ছিলেন হরমনপ্রীত। সেই ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসাবে পদ্মশ্রী পাচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১১ বছরের খরা কাটিয়ে রোহিতের অধিনায়কত্বেই আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতে ভারত। ২০২৪ টি-২০ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক রোহিত। গতবছর তাঁর নেতৃত্বে ভারত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিও জেতে। এবার পদ্মশ্রী পাচ্ছেন তিনি। জাতীয় দলের প্রাক্তন পেসার প্রবীণ কুমারকেও পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। ভারতীয় মহিলা হকি দলের গোলকিপার সবিতা পুনিয়া পাচ্ছেন পদ্মশ্রী। সেইসঙ্গে মরণোত্তর পদ্মশ্রী পাচ্ছেন প্রাক্তন কুস্তি কোচ ভ্লাদিমির মেস্তভিরিশভি। জর্জিয়ার নাগরিক হলেও সুশীল কুমার, যোগেশ্বর দত্ত এবং বজরং পুনিয়াদের মতো অলিম্পিক পদকজয়ীদের কোচিং করিয়েছেন মেস্তভিরিশভি। এছাড়াও পদ্মশ্রী পাচ্ছেন কে পাজানিভেল, তামিলনাড়ুর ঐতিহ্যবাহী সিলামবাম মার্শাল আর্টে অনবদ্য অবদানের জন্য। বুন্দেলখণ্ডের মার্শাল আর্ট বুন্দেলি ওয়ারে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পদ্মশ্রী পাচ্ছেন ভগবানদাস রায়কর।





