ফ্যাশনের খাতিরে ট্যাটু করানো যতটা সহজ, তোলা ততটা নয়। সস্তার টোটকায় বিশ্বাস করে নিজের ক্ষতি না। হুজুগে পড়ে শরীরে খোদাই করেছিলেন প্রিয় মানুষের নাম। কিংবা পছন্দের কোনও নকশা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্থায়ী ছবিই এখন মাথাব্যথার কারণ। সময়ের সঙ্গে ফ্যাশন বদলায়, রুচিও বদলায়। তাই এখন অনেকেই চাইছেন পুরনো ট্যাটু মুছে ফেলতে। কিন্তু লেজার ট্রিটমেন্টের খরচ বা ভয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন ঘরোয়া টোটকার দিকে। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে মহাবিপদ। ঘরোয়া টোটকা। ইন্টারনেট খুঁজলেই মেলে নুন-লেবু ঘষা কিংবা স্যান্ডপেপার দিয়ে ত্বক ঘষে ট্যাটু তোলার নিদান। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, এসব পদ্ধতি শুধু যে অকার্যকর তাই নয়, একই সঙ্গে মারাত্মক ক্ষতিকর। ট্যাটুর কালি থাকে ত্বকের গভীর স্তর বা ডার্মিসে। নুন বা লেবুর রস সেই গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। উল্টে অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় চামড়া পুড়ে ক্ষত তৈরি হয়। স্যান্ডপেপার ব্যবহার করলে রক্তপাত এবং ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে ১০০ শতাংশ। এমনকী পারক্সাইড বা বাজারচলতি রিমুভাল ক্রিম ব্যবহারের ফলে অ্যালার্জি ও কেমিক্যাল বার্ন হওয়ার উদাহরণও প্রচুর। ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ডার্মাটোলজি-তে প্রকাশিত তথ্য মতে, ঘরোয়া উপায়ে ট্যাটু তুলতে গেলে কালির দাগ পুরোপুরি যায় না। উল্টে ত্বকে স্থায়ী ক্ষত বা স্কারিং তৈরি হয়। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজির মতে, নিজে নিজে এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে অনেকে ত্বকের ক্যানসার বা গভীর সংক্রমণের ঝুঁকি ডেকে আনেন। বোর্ড সার্টিফায়েড ডার্মাটোলজিস্টদের মতে, ট্যাটু রিমুভালের একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত ও নিরাপদ উপায় হল ‘লেজার ট্রিটমেন্ট’। আধুনিক লেজার পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট তরঙ্গের আলো ব্যবহার করে কালির কণাগুলিকে ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে ফেলা হয়। যা পরবর্তীতে শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিলীন হয়ে যায়। এটি সময়সাপেক্ষ হলেও ত্বকের ক্ষতি করে না। তবে ট্যাটুর রং ও গভীরতা ভেদে একাধিক সেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
ট্যাটু করার সময় কালি ত্বকের উপরের স্তর ভেদ করে নিচের স্তরএ ঢোকানো হয়। এই স্তর সহজে বদলায় না বলেই ট্যাটু দীর্ঘদিন থাকে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে,ঘরোয়া উপায়ে ট্যাটু পুরোপুরি তোলা খুবই কঠিন।
আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজির তরফে জানা যায়, ঘরোয়া পদ্ধতিতে ট্যাটু তুলতে গিয়ে ত্বকের ক্ষতি, সংক্রমণ ও দাগ পড়ার ঝুঁকি থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্যাটু তোলার কিছু ঘরোয়া টিপস ভাইরাল হলেও, এগুলির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে এখনও দ্বন্দে রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কী কী ঘরোয়া উপায় তোলা যেতে পারে ট্যাটু ? ইন্টারনেটে পাওয়া যায় বেশ কিছু টিপস। তবে সেগুলো কী আদতেও মেনে চলবেন?
লেবু ও নুন- লেবুর সাইট্রিক অ্যাসিড ও নুনের ঘর্ষণে ত্বকের উপরের স্তর কিছুটা উঠে যেতে পারে। কিন্তু চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ত্বক পুড়ে যাওয়া, জ্বালা ও ইনফেকশনের ঝুঁকি বেশি। অ্যালোভেরা জেল- অ্যালোভেরা ত্বকের ক্ষত সারাতে সাহায্য করে, কিন্তু ট্যাটুর কালি তুলতে পারে—এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি।
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড- কিছু ক্ষেত্রে ট্য়াটু হালকা হতে পারে, সতর্ক করেছে নিজে নিজে ব্যবহার করলে ত্বকের ভয়ানক ক্ষতি হতে পারে। স্ক্রাব বা স্যান্ডপেপার- অনেকে স্ক্রাব বা স্যান্ডপেপার দিয়ে তুলতে চান ট্যাটু। গবেষণা বলছে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক পদ্ধতি। এতে ত্বকে স্থায়ী দাগ পড়তে পারে, রক্তপাত ও ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রবল ঝুঁকি থাকে।
ভারতের একাধিক ডার্মাটোলজিস্টের মতে, ঘরোয়া উপায়ে ট্যাটু তুলতে গেলে কালি পুরোপুরি যায় না, বরং ত্বকের ক্ষতি স্থায়ী হয়। ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ডার্মাটোলজি-তে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ঘরোয়া পদ্ধতিতে ট্যাটু তোলার ফলে স্কিন ইনফেকশন, অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন ও স্কারিং-এর ঝুঁকি বেড়ে যায়। হোম রেমেডি বা ঘরোয়া পদ্ধতি কার্যকর নয়, লেজার সবচেয়ে কার্যকর, কিন্তু একাধিক সেশন লাগতে পারে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।” বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত ও নিরাপদ পদ্ধতি হল লেজার ট্যাটু রিমুভাল। ত্বকের ধরন ও কালি অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হবে বলে পরামর্শ দেন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা। প্যাচ টেস্ট করাও জরুরি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘরোয়া উপায়ে ট্যাটু পুরোপুরি তোলা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। সাময়িকভাবে হালকা হতে পারে, কিন্তু তার বিনিময়ে ত্বকের ক্ষতি মারাত্মক হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সরান আপনার ট্যাটু।





