Friday, April 24, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে ভয়?‌ ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে হলে ভয় নয়!‌

নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে ভয় বাড়তে শুরু করেছে। তবে ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে হলে ভয় নয়, জরুরি সতর্কতা। আর নিপার ক্ষেত্রে সামান্য সতর্কতাই রোগকে দূরে রাখতে অনেকখানি কার্যকর। কারণ নিপা এমন এক ভাইরাস যার সংক্রমণে মৃত্যুর আশঙ্কা ৪০-৭৫ শতাংশ হলেও এটি কোভিডের মতো অত দ্রুত সংক্রমিত হয় না। তাই একটু সাবধান হলে সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব। আর তার জন্য সবার আগে খেয়াল রাখা উচিত খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে। অন্তত তেমনই জানাচ্ছেন এক গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট পালানিপ্পন মানিক্যম। দক্ষিণ ভারতে মাদুরাই শহরের ওই খ্যাতনামী চিকিৎসক বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত। মাস কয়েক আগে যখন দক্ষিণ ভারতের কেরলে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক ভাবে ছড়াতে শুরু করেছিল, সেই সময়েই নিজের ইনস্টাগ্রামে একটি সচেতনতামূলক ভিডিয়ো পোস্ট করেছিলেন তিনি। সেখানেই তিনি জানিয়েছেন, নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়। নিপা ভাইরাস ছড়ায় এক ধরনের ফ্রুট ব্যাট বা ফল খাওয়া বাদুড়ের থেকে। চিকিৎসক পালানিপ্পন বলছেন, ‘‘ওই ধরনের বাদুড় মূলত বেশি মিষ্টি ফল খেতে ভালবাসে। আর ওই ধরনের গাছেই থাকে বেশি। আর ওই বাদুড়ের লালা এবং মল-মূত্র থেকে ভাইরাস ছড়ায় গাছের ফল এবং পাতায়। সেই ফলে হাত দিলে বা খেলে তা থেকে ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে শরীরে।’’ চিকিৎসক জানাচ্ছেন, এই মূল বিষয়টি জানা থাকলেই সতর্ক হতে সুবিধা হবে সবচেয়ে বেশি। নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সবার আগে খাবারের ব্যাপারে সতর্ক হতে বলছেন চিকিৎসক। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা মূলক নির্দেশিকা রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’-এরও। যে কোনও ফলে বা শাকসব্জিতে হাত দিলে অবশ্যই হাত ভাল ভাবে পরিষ্কার করা উচিত। চিকিৎসক বলছেন, মিষ্টি ফল রয়েছে বা খেজুরের গাছ রয়েছে এমন জায়গায় থাকা শস্যক্ষেতে বাদুড়ের মলমূত্র মিশতে পারে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে হাত ভাল ভাবে ধুয়ে নেওয়াই ভাল।

ফল খাওয়ার আগে: ১। ‘হু’-এর নির্দেশিকায় বলা হচ্ছে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে যে কোনও ফল খেলে তা ভাল ভাবে ঠান্ডা জলে ঘষে ধুয়ে তারপরে খাওয়া উচিত।

২। ঝুঁকি কমাতে ফল বা সব্জির খোসাও ছাড়িয়ে নেওয়া উচিত। কলার খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া হয়। পেঁপেরও খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া হয়। কিন্তু পেয়ারা জাতীয় ফল খোসা সমেতই খান অধিকাংশে। এক্ষেত্রে সতর্কতা হিসাবে পেয়ারারও খোসা ছাড়িয়ে নিতে বলছেন চিকিৎসক।

৩। মাটিতে পড়ে থাকা ফল বা ফলে আঁচড় বা কামড়ের দাগ থাকলে সেই ফল না খাওয়াই ভাল। কারণ, সে ক্ষেত্রে ফলের ভিতরেও ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

৪। বাইরের কাটা ফল না খেয়ে বাজার থেকে দেখে কিনে ভাল করে পরিষ্কার করে বাড়িতে এনে খান। তাতে নিরাপত্তা বেশি।

নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে শূকর। সে ক্ষেত্রে শূকরের মাংস এড়িয়ে চলাই ভাল বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ। কারণ শূকর ওই ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল কি না, তা রান্না হওয়া খাবার খাওয়ার সময়ে বোঝার উপায় নেই। হু-ও জানাচ্ছে নিপা ভাইরাস কোনও এলাকায় ছড়ালে প্রথমে সেই অঞ্চলের শূকরের মধ্যেও ওই ভাইরাস ছড়াচ্ছে কি না সে ব্যাপারে কড়া নজর রাখা উচিত। বিশেষ করে পশুখামারে কোনও শূকর অসুস্থ বলে মনে হলে অবিলম্বে তাকে বাকি প্রাণীদের থেকে আলাদা করা উচিত এবং মৃত্যু হলে সতর্কতা বজায় রেখে তার দেহ সরানো উচিত। কারণ তা থেকেও ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকবে।

মাস্কের ব্যবহার: নিপা ভাইরাস মানুষের হাঁচি, কাশি, নিঃশ্বাসের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে বলে জানাচ্ছে হু। সতর্কতামূল ব্যবস্থা হিসাবে সর্দি-কাশি হয়েছে এমন মানুষের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, মনে করে হাত ধোয়া, নাকে-মুখে-চোখে হাত না দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে হু। চিকিৎসক পালানিপ্পন জানাচ্ছেন, ভিড় এলাকায় থাকলে কোভিডের মতোই এ ক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।

পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাসের খোঁজ! উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের দুই নার্সকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে তাঁরা এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলেই সন্দেহ। তবে বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পুণেতে নমুনা পাঠানো হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে খবর, দু’জনের অবস্থা সঙ্কটজনক। ভেন্টিলেশনে রেখে তাঁদের চিকিৎসা চলছে। এই ভাইরাসের উৎস মূলত বাদুড়। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল ভাল ফলের সঙ্গে মিশে থাকলে সেখান থেকেও ছড়াতে পারে এই ভাইরাস। আক্রান্তের ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক বা অন্যান্য জিনিসপত্র থেকেও সংক্রমণের ক্ষমতা রাখে নিপা ভাইরাস। সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো উপসর্গ হলেও নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার ৫০-৬০ শতাংশ। আক্রান্তের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাই তাঁকে সুস্থ করতে পারে। সে জন্য দ্রুত রোগ ধরা পড়া অত্যন্ত জরুরি। নিপাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘জুনটিক ভাইরাস’। অর্থাৎ পশুর শরীর থেকে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢোকে। আক্রান্ত পশুদের দেহের অবশিষ্টাংশ, বা মলমূত্র থেকে সংক্রমণ ঘটতে পারে। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৩–১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ শুরু হয়। প্রথমে জ্বর মাথাব্যথার মতো সাধারণ কষ্ট থাকে, যাকে সাধারণ ফ্লু বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি রোগী আচ্ছন্ন হয়ে যান, ভুল বকা শুরু হয়, কাউকে চিনতে না পারেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উপযুক্ত পরিষেবা আছে এমন হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করতে হবে। ব্রেনে প্রদাহ হলে, যাকে বলে এনসেফেলাইটিস, অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে৷ রোগের প্রথম দিকে অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়। এঁদের থেকেই রোগ ছড়ায় বেশি। সে জন্য রোগীকে আলাদা করে রাখতে হয়। সতর্ক থাকতে হয় সেবাকর্মীদের। তা হলে আর রোগ ছড়ানোর ভয় তত থাকে না। চিকিৎসক শুভম সাহার কথায়, “নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষ কোনও লক্ষণ বোঝা যায় না। জ্বর, মাথা ধরা, পেশির যন্ত্রণা, বমি বমি ভাবের মতো সাধারণ ‘ভাইরাল ফিভার’-এর লক্ষণ দেখা যায়। নিপা ভাইরাস খুব দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ৫ থেকে ৬ দিনের মধ্যে কোমায় চলে যেতে পারেন রোগী। ফুসফুসে সংক্রমণ হলে মৃ্ত্যুও ঘটতে পারে। নিপার কোনও টিকা এখনও আবিষ্কার হয়নি।” সাধারণ পরীক্ষায় নিপার সংক্রমণ ধরা পড়ে না। বায়ো-সেফটি লেভেল-থ্রি স্তরের কোনও ল্যাবরেটরিতেই নিপা ভাইরাসের পরীক্ষা করা সম্ভব। কারণ, এই স্তরের ল্যাবরেটরি না হলে যিনি পরীক্ষা করবেন তাঁরও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আক্রান্তের থুতু-লালা, মূত্রের নমুনা বা সেরিব্রাল স্পাইনাল ফ্লুইড থেকেই নিপা ভাইরাস চিহ্নিত করা সম্ভব। বিপজ্জনক এই ভাইরাসের মোকাবিলা করতে টিকাই একমাত্র উপায় হতে পারে। জেনোভার প্রতিষেধক কাজ করলে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচবে বলেই আশা করছেন গবেষকেরা। চিকিৎসক শুভম সাহা বলেন, “নিপা ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে আগে আমাদের সচেতন হতে হবে। বাজার থেকে ফল নেওয়ার সময় ভাল করে দেখে কিনতে হবে। মাঠেঘাটে পড়ে থাকা ফল না খেলেই ভাল। মাংস বেশি সময় ধরে রান্না করলে, আগুনের তাপে জীবাণু মরে যায়। ফলে জীবাণু বা ভাইরাস ঘটিত রোগের হাত থেকে সহজেই রেহাই পাওয়া যায়। নিপা ভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে ৭৫ শতাংশ বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই আগে থেকে আমাদের সতর্ক হতে হবে।”

যেখানে রোগ হয়নি সেখানে সাধারণ ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে যে সব নিয়ম মেনে চলতে বলা হয়, যেমন, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর ভাবে থাকা, নাকে–মুখে হাত দেওয়ার আগে বা খাবার খাওয়ার আগে হাত ভাল করে ধুয়ে নেওয়া ইত্যাদি, সেটুকু মানলেই চলে। তবে যেখানে রোগ হচ্ছে সেখানে তার সঙ্গে আরও কয়েকটি নিয়ম মানা জরুরি৷ যেমন, শুয়োরের থেকে সব রকম দূরত্ব বজায় রাখা, সমস্যা না মেটা পর্যন্ত ফল খাওয়া বন্ধ করা, ঘরে পরিচ্ছন্ন ভাবে বানানো সুসিদ্ধ খাবার খাওয়া, রাস্তাঘাটে বেরোনোর সময় মাস্ক পরে নেওয়া। এন৯৫ মাস্ক পরে নিলে বিপদের আশঙ্কা কম থাকে। রোগীর সেবা যাঁরা করেন তাঁদের মাস্ক পরা ও হাত ধোয়ার ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক হওয়া দরকার।

বাংলায় ফের নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে নিপা ভাইরাস। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বেশ কয়েকজন। তাঁদের অবস্থা সংকটজনক। যা যথেষ্ট উদ্বেগের। এখনও পর্যন্ত এই রোগের কোনও ওষুধ কিংবা প্রতিষেধক নেই। তাই সাবধানতা অবলম্বনই একমাত্র পথ। বিশেষ সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষত ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। বাদুড় কিংবা অন্যান্য পশুর কামড় দেওয়া ফল ভুলেও খাবেন না। বিশেষত খেজুর রস এই সময় না খাওয়াই উচিত। পেয়ারা, লিচু খাওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। রাস্তাঘাটে কাটা ফল এই সময়ে না খাওয়াই ভালো। নইলে পুষ্টির পরিবর্তে সংক্রমণের সম্ভাবনাই বেশি। এই সময়ে ফল খেলে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। সুযোগ থাকলে নুন জলে ডুবিয়ে রেখে খেতে হবে। বাদুড় ও শূকরের সংস্পর্শে আসা চলবে না। শুধু পরিষ্কার করে ফল খাওয়াই নয়। বাইরে থেকে আসার পর হাত-পা ভালো করে ধুয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে আসলে কোয়ারেন্টাইন বা নিভৃতবাসে থাকা উচিত। এই রোগের সূত্রপাত সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নেওয়া যাক। তথ্য বলছে, ১৯৯৮ সালে প্রথম মালয়েশিয়ায় এই ভাইরাসের সন্ধান মেলে। শূকর প্রতিপালকদের মধ্যে প্রথম এই রোগ ধরা পড়ে। শিলিগুড়িতে মৃত্যুর হার ছিল ৬৮ শতাংশ। নদিয়াতে ১০০ শতাংশ। ২০১৮ সালে কেরলের কোঝিকোড়, মল্লপুরম-সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় নিপা ভাইরাসের ছোবলে প্রায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।নিপা ভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত রুখতে কোমর বেঁধে নেমেছে স্বাস্থ্যদপ্তর। একাধিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাদুড় বা বাদুড়ের বিষ্ঠার সংস্পর্শে আসা ফল খেলে বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে এই রোগ হতে পারে। আক্রান্ত শূকর বা বাদুড়ের থেকেও সরাসরি মানুষের শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। জ্বর, শ্বাসকষ্ট, প্রবল মাথার যন্ত্রণা, বমি বমি ভাব, কাফ মাসলে ব্যথা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখমণ্ডলের পেশি সঙ্কুচিত হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে সাবধান হতে বলছেন চিকিৎসকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles