মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য অবমাননাকর, ভিত্তিহীন, মানহানিকর। আইনি নোটিস শুভেন্দুর। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রমাণ দিতে না পারলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার হুঁশিয়ারি বিরোধী দলনেতার। I-PAC-এর দফতরে ED-র তল্লাশির প্রতিবাদে, শুক্রবার যাদবপুর থেকে হাজরা পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিল করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মিছিল শেষে হাজরার সভা থেকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন বিজেপিকে! কয়লাকাণ্ডে নিয়ে আক্রমণ করেন অমিত শাহ ও শুভেন্দু অধিকারীকে। হুমকির সুরে বলেন, ‘আপনাদের ভাগ্য় ভাল এখনও যে, আমি চেয়ারে আছি বলে না, ওই পেনড্রাইভগুলো বাইরে বের করে দিই না।’ এই দিনই রাতে এএনআই সূত্রে খবর এল, সংঘাতের পারদ আরও একধাপ চড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মানহানির আইনি নোটিস পাঠালেন শুভেন্দু অধিকারী। দিলেন উত্তর দেওয়ার ৭২ ঘণ্টা সময়। আইনজীবীর মারফত শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীকে নোটিস পাঠিয়ে বলেছেন, ০৮.০১.২০২৬ এবং ০৯.০১.২০২৬ তারিখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিরুদ্ধে বেপরোয়া, ভিত্তিহীন এবং প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করেছেন। প্রকাশ্যে ইঙ্গিত করেছেন যে, শুভেন্দু ও ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অমিত শাহ কয়লা কেলেঙ্কারিতে জড়িত। মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেছেন, এই ধরনের অভিযোগের সমর্থনে আপনার কাছে প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, এই সব কথা বলে আদতে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর পরিবার পরিবারের সদস্যদের এবং রাজনৈতিক দলের গুরুতর বিষয়গুলি থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছেন। এটি একটি পরিকল্পিত এবং অশুভ পরিকল্পনা! সেই প্রেক্ষিতেই এই নোটিস পাঠিয়েছেন শুভেন্দু। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত নথি,তথ্য ও প্রমাণ শুভেন্দু অধিকারীর হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা না করা হলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি, মানহানির মামলা করা হবে বলেও সতর্ক করেছেন শুভেন্দুর আইনজীবী। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা একটি পোস্টে লেখেন, ‘আজ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইডির তদন্ত থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য, আমার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মানহানিকর অভিযোগ করেছেন। মাননীয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ও আমার নাম ‘কথিত’ কয়লা কেলেঙ্কারির কয়লা কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে দেন। ব্যক্তিগত অপমানে করা হয়েছে এই বেপরোয়া বক্তব্যগুলির মাধ্যমে। কোনও প্রমাণ ছাড়াই জনসমক্ষে এই অভিযোগগুলি করা হয়। এই ধরনের অপ্রমাণিত দাবি কেবল আমার সুনামকেই ক্ষুণ্ণ করেনি বরং জনসাধারণের আলোচনার মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ন করেছে’। শুভেন্দু স্পষ্ট উল্লেখ করেন, যদি তিনি অভিযোগের পক্ষে প্রামাণ্য নথি দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি মানহানির জন্য উপযুক্ত দেওয়ানি এবং ফৌজদারি ধারায় মামলা করবেন।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তাদের অভিযোগ, আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশির সময় পুলিশের সাহায্য নিয়ে তাদের হেফাজত থেকে ‘অপরাধ সংক্রান্ত নথি’ নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। আবেদনে ইডি অভিযোগ করেছে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সাংবিধানিক পদে থেকে ‘বেআইনি ভাবে’ তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন। পিএমএলএ (টাকা তছরুপ বিরোধী আইন)-এর অধীনে রাজনৈতিক পরামর্শদাতার সংস্থার কর্তার বাড়িতে আইনি ভাবে তল্লাশি চলছিল। কয়লা দুর্নীতিকাণ্ডে একটি মামলায় সেই অভিযান হয়েছে। সেই আইনি তল্লাশিতে মুখ্যমন্ত্রী বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ। ২০২০ সালে সিবিআই কয়লা পাচার সংক্রান্ত একটি এফআইআর করে। ওই এফআইআরের ভিত্তিতে পিএমএলএ ২০০২ অনুযায়ী তদন্ত শুরু করে ইডি। প্রায় ২,৭৪২ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের মামলায় তদন্ত করছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তাদের অভিযোগ, এই টাকার একটি অংশ হাওয়ালা মারফত আইপ্যাকের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, বিশেষত গোয়ায়। সেই মামলার সূত্রে দিল্লি ও কলকাতায় ১০টি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। তার মধ্যে ছিল প্রতীকের বাড়ি এবং সল্টলেক সেক্টর ফাইভে সংস্থার দফতর। ইডি আদালতে অভিযোগ করেছে, তল্লাশি চলাকালীন প্রথমে দক্ষিণ কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার প্রিয়ব্রত রায় এবং পরে কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা ঘটনাস্থলে যান। তার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা নিজে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেন। ইডির দাবি, তাদের অনুমোদিত তল্লাশি চলার সময় ডিজিটাল ডিভাইস (ল্যাপটপ, মোবাইল, হার্ডডিস্ক), গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জোর করে পুলিশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ইডির মতে, এতে তাদের তদন্ত সম্পূর্ণভাবে ‘বাধাগ্রস্ত’ হয়। ডিজিটাল ফরেন্সিক কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। ইডির আরও দাবি, তারা আইপ্যাকের দফতরে ঢুকে তল্লাশি শুরু করলেও রাজ্য পুলিশের বাধায় কাজ করা যায়নি। পরে একটি ‘ইনসিডেন্ট রিপোর্ট’ তৈরি করা হয়। হাই কোর্টে ইডির দাবি, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ২০২৩ অনুযায়ী এই ঘটনায় একাধিক ‘অপরাধ’ হয়েছে। যেমন— সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা, বেআইনি আটক, বলপ্রয়োগ, চুরি (ডিজিটাল ডিভাইস ও নথি), প্রমাণ লোপাট, অপরাধমূলক ভয় দেখানো, ষড়যন্ত্র। ইডি আদালতে জানিয়েছে, তারা চায়, সিবিআই–কে দিয়ে এফআইআর করে সম্পূর্ণ ঘটনার তদন্ত হোক। মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা হোক। বাজেয়াপ্ত করা সব ডিজিটাল ডিভাইস ইডি–কে ফেরত দেওয়া হোক। ঘটনাস্থলের সেই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হোক। ভবিষ্যতে ইডি–র কাজে রাজ্য পুলিশের হস্তক্ষেপ বন্ধ হোক। ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হোক।





