‘‘যদি মামলাকারীরা সুপ্রিম কোর্টে যান, তা হলে নিশ্চয়ই লড়ব।’’। বললেন বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায় খারিজ করে কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বহাল রেখেছে। ডিভিশন বেঞ্চের সেই রায়কে যদি চ্যালেঞ্জ করে মামলাকারীরা সুপ্রিম কোর্টে যান, তা হলে শীর্ষ আদালতে তাঁদের হয়ে আইনি লড়াই লড়বেন বলে জানিয়ে দিলেন সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ তথা আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য। বিকাশ পেশাগত ভাবে আইনজীবী। তাঁর উপর কোনও নির্দেশ জারি করে তাঁকে রুখতে চাইছে না সিপিএম। দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘‘আমরা পার্টিগত ভাবে কোনও নির্দেশ তাঁকে আগেও দিইনি। এখনও দেব না। কারণ, পেশাগত ভাবে তিনি কী করবেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। সবটাই নির্ভর করে তাঁর বোধের উপর। কোনও ডাক্তারকে তো আমরা বলি না যে, এই রোগীর অস্ত্রোপচার করবেন না। এ ক্ষেত্রেও তেমনই।’’ ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বহাল থাকার রায় ঘোষণার পরে তৃণমূল যেমন উচ্ছসিত, তেমনই বিরোধী শিবির কিছুটা ম্রিয়মাণ। এর ঠিক উল্টো ছবি দেখা গিয়েছিল ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের ঘটনায়। সিপিএমের অবস্থা হয়েছে একদিকে দুর্নীতি নিয়েও তাদের বলতে হচ্ছে আবার চাকরিরতদের কথাও ভাবতে হচ্ছে। সিপিএমের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘বিকাশদা আইনগত ভাবে হয়তো ঠিকই বলছেন। কিন্তু এই প্যানেলে আমাদের সমর্থকদের পরিবারের ছেলেমেয়েরাও রয়েছেন। তাঁদেরকেও দাগিয়ে দেওয়া বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।’’
কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, ৩২ হাজারের নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে। তবে এত শিক্ষকের চাকরি বাতিল করে দেওয়া যাবে না। ন’বছর ধরে তাঁরা চাকরি করেছেন। চাকরি বাতিল করলে তাঁদের পরিবারের উপরেও প্রভাব পড়বে। মূলত মানবিক কারণেই চাকরি বাতিলের নির্দেশ খারিজ করেছে আদালত। ডিভিশন বেঞ্চ এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তদন্তে কোথাও এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে, যাঁরা চাকরি পেয়েছেন তাঁরা ব্যক্তিগত ভাবে দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। সিবিআই তদন্তে উঠে এসেছে যে, মোট ২৬৪ জন প্রার্থীর ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। তাঁদের অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে উত্তীর্ণ করা হয়েছিল। তদন্তে এই ২৬৪ জনকে চিহ্নিতও করা হয়েছে। আরও ৯৬ জন প্রার্থী যোগ্যতা অর্জনের ন্যূনতম নম্বর পাননি। তবুও তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই কিছু প্রার্থীর সমস্যা রয়েছে বলেই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ‘ভুয়ো’ বলা যায় না। ৩২ হাজার শিক্ষকের নিয়োগকে একযোগে বাতিল করার কোনও আইনি ভিত্তি নেই। ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের পর্বে সিপিএম এবং ব্যক্তি বিকাশের অবস্থান ছিল দুই মেরুতে। দলের ছাত্র-যুব সংগঠন থেকে শুরু করে প্রথম সারির নেতারা বলেছিলেন, চাল আর কাঁকর আলাদা করতে হবে। সকলের নিয়োগেই অনিয়ম হয়েছে, তা বলা যায় না। অতএব, যিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁকে দুর্নীতিগ্রস্তদের সঙ্গে একই বন্ধনীতে ফেলা যায় না। পক্ষান্তরে বিকাশের বক্তব্য ছিল, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হলে পুরো প্যানেলই বাতিল করা উচিত। আইনজীবী সাংসদ ৩২ হাজারের চাকরি বহালের রায়ের পরেও সেই অবস্থানেই অনড়। বিকাশ মনে করেন, এ ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিই হয়েছে।
এদিকে আবার, উচ্চ প্রাথমিকের নিয়োগে সুপার নিউমেরারি বা অতিরিক্ত শূন্যপদ তৈরির সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিল হাই কোর্ট। বুধবার কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বহাল রাখায় স্বস্তি পেয়েছিল রাজ্য। তার ২৪ ঘণ্টা কাটতে না-কাটতেই উচ্চ আদালতের অন্য একটি রায়ে ধাক্কা খেল রাজ্য। বৃহস্পতিবার বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর বেঞ্চ সুপার নিউমেরারি পদ তৈরি নিয়ে রাজ্যের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত (রেগুলার) নিয়োগের মতো সুপার নিউমেরারি পদ তৈরি করা যায় না। বিশেষ পরিস্থিতিতেই ওই পদ তৈরি করা হয়। উচ্চ প্রাথমিকে শারীরশিক্ষা এবং কর্মশিক্ষা বিষয়ে ওয়েটিং লিস্ট বা অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিয়োগ করতে চেয়ে অতিরিক্ত শূন্যপদ তৈরি করে রাজ্য। ১৬০০ সুপার নিউমেরারি পদ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২২ সালের ১৯ মে এবং ১৪ অক্টোবর বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়। বৃহস্পতিবার ওই দুই বিজ্ঞপ্তি খারিজ করে দিয়েছেন বিচারপতি বসু। উচ্চ প্রাথমিকের এই মামলার বাকি বিষয়ের শুনানি আগামী জানুয়ারি মাসে হবে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে সুপার নিউমেরারি পদ তৈরির উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয় হাই কোর্ট। সম্প্রতি ২৬ হাজার চাকরি বাতিল মামলায় সুপার নিউমেরারি পদ নিয়ে রাজ্যের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেনি সুপ্রিম কোর্ট। গত এপ্রিল মাসে সেই নির্দেশ দেখিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে আবেদন করে রাজ্য। তাদের বক্তব্য ছিল, উচ্চ প্রাথমিকে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সুপার নিউমেরারি পদে নিয়োগের অনুমতি দিক আদালত। তবে গত ৭ মে আদালত সুপার নিউমেরারি পদের উপর স্থগিতাদেশ বহাল রাখে বিচারপতি বসুর একক বেঞ্চ। তার পর ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয় রাজ্য। ডিভিশন বেঞ্চও একক বেঞ্চের নির্দেশ বহাল রেখেছিল।




