গৌতম গম্ভীরের জমানায় আরও একবার লজ্জার মুখে ভারতীয় দল। নিউজিল্যান্ডের পর ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছেও চুনকাম। ০-২ তে সিরিজ হার ভারতের। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হার। এর আগে এত বড় ব্যবধানে হারার নজর নেই ভারতের। ঘরের মাঠে আরও একবার লজ্জার মুখে পড়ল ভারত। চতুর্থ ইনিংসে ৫৪৯ রান তাড়া করতে নেমে ১৪০ রানে শেষ টিম ইন্ডিয়ার ইনিংস। ৪০৮ রানে হার ভারতের। চতুর্থ দিনের শেষে ২ উইকেট হারিয়ে টিম ইন্ডিয়ার রান ছিল ২৭। পঞ্চম দিন ১১৩ রানে ৮ উইকেট হারায় ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ। গুয়াহাটিতে প্রথম তিনদিন পর হার অবশ্যম্ভাবী ছিল, কিন্তু এইভাবে? বিনা লড়াইয়ে। তাও আবার ঘরের মাঠে! লাল বলের ক্রিকেটে ভারতীয় ক্রিকেট দল এখন শুধুই কাগুজে বাঘ। টেস্ট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর ধারাবাহিকতা ধরে রাখল তেম্বা বাভুমারা। ২৫ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ঘরের মাঠে সিরিজ হার ভারতের। ১৯৯৯-২০০০ সালের পর প্রথমবার ভারতের মাটিতে সিরিজ জয় প্রোটিয়াদের।
ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে এক অনুষ্ঠানে এসে ভারতকে ফেভারিট বলেছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। জানিয়েছিলেন, যতই প্রোটিয়ারা টেস্ট বিশ্বকাপ জিতে একনম্বরে থাকুক না কেন, ঘরের মাঠে ভারতকে হারানো কঠিন। বোর্ডের প্রাক্তন সভাপতির ক্রিকেট বোধ মারাত্মক। কিন্তু তাঁকেও ভুল প্রমাণিত করল গৌতম গম্ভীরের দল। একসময় টেস্টে ঘরের মাঠে যে ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে ভয় পেত বিদেশি দলগুলো, তাঁরাই এখন ইঁদুর। বলে বলে হারাচ্ছে নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলো। আইপিএলের যুগে কি টেকনিক হারাচ্ছে ভারতীয় ব্যাটাররা? না লাল বলের ক্রিকেট খেলার মানসিকতাই আর নেই? ঘরের মাঠে পরপর দুই সিরিজে হার এমন প্রশ্ন তুলবে। ২০২১ সালে সিডনিতে সারাদিন ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ বাঁচিয়েছিল ভারত। কিন্তু গম্ভীরের ভারতের সেই সাধ্য নেই। গোটা দিন ব্যাট করা দূর অস্ত, মধ্যাহ্নভোজ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারল না ভারতীয় ব্যাটাররা। মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টায় শেষ ইনিংস। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন বাভুমা। প্রথম ইনিংসে ৪৮৯ রান তোলে দক্ষিণ আফ্রিকা। শতরান করেন সেনুরান মুথুস্বামী। ১০৯ রান করে আউট হন। মাত্র ৭ রানের জন্য শতরান হাতছাড়া করেন মার্কো জ্যানসেন। ৯৩ রানে আউট হন। ব্যাট হাতে অবদান রাখার পর বল হাতে ৬ উইকেট তুলে নেন। প্রোটিয়া পেসারের কাছে আত্মসমর্পণ ভারতীয় ব্যাটারদের। একমাত্র রান পান যশস্বী জয়েসওয়াল (৫৮) এবং ওয়াশিংটন সুন্দর (৪৮)। ২০১ রানে অলআউট হয়ে যায় ভারত। প্রথম ইনিংসের শেষে ২৮৮ রানে পিছিয়ে ছিল টিম ইন্ডিয়া। কিন্তু ফলো অন দেয়নি দক্ষিণ আফ্রিকা। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করে ২৬০ রানে ইনিংস ঘোষণা করে প্রোটিয়ারা। তখনই ম্যাচের দেওয়াল লিখল হয়ে গিয়েছিল। বাকিটা সময়ের অপেক্ষা। ৫৪৯ রান করে ম্যাচ জেতার আশা ভারতের অতি বড় সমর্থকও করেনি। তবে ঘরের মাঠে বিনা লড়াইয়ে আত্মসমর্পণও ভাবা যায়নি। দ্বিতীয় ইনিংসে আরও অধঃপতন। দেড়শো রানের গণ্ডিও পার হল না। ১৪০ রানে শেষ। ইডেনের পর ফের জ্বলে উঠলেন সাইমন হারমার। দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট তুলে নেন। একমাত্র কিছুটা লড়াই করেন রবীন্দ্র জাদেজা। ৫৪ রানে আউট হন। এটাই ভারতীয় ইনিংসে সর্বোচ্চ রান। টেস্টের সেরা মার্কো জ্যানসেন।
ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হোয়াইটওয়াশ হতে হয়েছে। ২৫ বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে সিরিজ হারল ভারত। ঘরের মাঠে। ইডেনের পর গুয়াহাটিতে ৪০৮ রানে হার। টেস্টে এত রানে হারের সম্মুখীন ভারত আগে হয়নি। চলছে কোচ গম্ভীরের সমালোচনা। ওয়ানডে বা টি–টোয়েন্টি ঠিক আছে। কিন্তু টেস্টে কোচ গম্ভীর একেবারেই অচল। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনরা ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন। গুয়াহাটি টেস্ট হেরে গম্ভীর শুরুতেই জানিয়ে দিলেন, ‘এখানে আমি আর কী বলব। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডই নেবে সিদ্ধান্ত। আমি আগেও বলেছি ভারতীয় ক্রিকেট গুরুত্বপূর্ণ। কোচ গম্ভীর নয়।’ এরপরই কিছুটা সাফাইয়ের সুরে বলেছেন, ‘আমিই সেই ব্যক্তি যে ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ ড্র করে ফিরেছে। আমার কোচিংয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, এশিয়া কাপে ভারত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই দলটা এখনও শেখার পদ্ধতিতে রয়েছে। দায় তো সবারই। তবে শুরুটা আমাকে দিয়েই হবে। আসলে এটাই হল রূপান্তরের (ট্রানজিশন) শুরু। আপনাকে সময় দিতেই হবে। ব্যাটিং বা বোলিং আলাদা করে নয়। সব বিভাগেই হারতে হয়েছে। ব্যক্তিগত কাউকে নয়। এই হারের দায় সবার। আমি কখনও ব্যক্তিগত কাউকে দায়ী করি না।’
গম্ভীরের কোচিংয়ে ১৮ টেস্টের মধ্যে ভারত হেরেছে ১০ টেস্ট। নিউজিল্যান্ডের কাছে হোয়াইটওয়াশ দিয়ে শুরু হয়েছিল। আর এখন প্রোটিয়াদের কাছেও হোয়াইটওয়াশ হতে হল। গম্ভীরের কথায়, ‘টেস্ট খেলার জন্য তারকা হতে হবে এরকম তো কোনও কারণ নেই। স্কিলের সঙ্গে মানসিক কাঠিন্য দরকার। টেস্ট সাফল্য পেতে হলে সবাইকে মিলে চেষ্টা করতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কোনও লাভ নেই। আমরা ওয়াশিংটনকে যতটা বেশি সম্ভব সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছি। আপনি যদি ভাবেন ১০০–র বেশি টেস্ট খেলা অশ্বিনের মতো খেলে দেবে ওয়াশিংটন, তা হলে তরুণ ছেলেটার উপরে অবিচার করা হবে। এটা নিয়ে আপনাদেরও ভাবা উচিত। সবে ১০–১২–১৫টা টেস্ট খেলেছে ওরা। এখনও শেখার অনেক জায়গা রয়েছে। বিভিন্ন পরিস্থিতি, বিভিন্ন পরিবেশে বল করা শিখছে। এত বেশি অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে একসঙ্গে হারালে সেটার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন। এই জন্যই এটাকে রুপান্তর বলছি। এই ক্রিকেটারদের সময় দেওয়া দরকার। আমার মনে হয় না আগে কখনও একই সঙ্গে ব্যাটিং এবং বোলিং দুই বিভাগেই রুপান্তর হয়েছে বলে। আগে ব্যাটিং বিভাগ ভাল থাকত। বোলিং বিভাগে রুপান্তর হত। অথবা উল্টোটা। এই দলে পুরোটাই নতুন করে তৈরি হচ্ছে। সকলের এটা বোঝা উচিত, এই দলে যারা বসে আছে তাদের সেই যোগ্যতা এবং দক্ষতা রয়েছে। আমরা সকলেই টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা দেখতে চাই। সেটার জন্য অভিজ্ঞতা দরকার। এর পর যখন ওরা কঠিন পরিবেশে গিয়ে খেলবে, ঠিক কাজের কাজ করে দেবে।’




