বিশ্বজুড়ে যক্ষ্মা বা টিউবারকুলোসিস (টিবি) এখনও এক আতঙ্কের নাম। ফুসফুসে এর প্রকোপ সর্বাধিক হলেও, শরীরের অন্য অঙ্গও কিন্তু এই জীবাণুর হানাদারি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে এই জীবাণু যখন হাড়ে, বিশেষ করে শিরদাঁড়া বা মেরুদণ্ডে পৌঁছয়, তখন পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় স্পাইনাল টিউবারকুলোসিস বা ‘পট’স ডিজিজ’। স্পাইনাল টিবি-র জন্য দায়ী জীবাণুটি হল ‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস’, যা ফুসফুসের টিবির জন্যও দায়ী। মূলত, ফুসফুসে প্রাথমিক সংক্রমণের পরেই এই জীবাণু রক্তের মাধ্যমে শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। মেরুদণ্ড হল এর অন্যতম পছন্দের আশ্রয়স্থল। বিশেষত, পিঠের নীচের অংশ বা থোরাসিক স্পাইন এতে বেশি আক্রান্ত হয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, এইচআইভি সংক্রমণ বা এমন কোনও ওষুধ সেবন যা শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দাবিয়ে রাখে, সেগুলি স্পাইনাল টিবি-র আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। মেরুদণ্ডের টিবি-র উপসর্গগুলি প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময়েই অস্পষ্ট থাকে, যার ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়। তবে কিছু লক্ষণ সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। মূল উপসর্গ হল পিঠে বা কোমরে একটানা ব্যথা। এই ব্যথা বিশ্রাম নিলেও কমতে চায় না এবং রাতে বাড়তে পারে। আক্রান্ত স্থানে চাপ দিলে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। দিনের অন্য সময় স্বাভাবিক থাকলেও, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে হালকা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা এই রোগের অন্যতম লক্ষণ। শারীরিক দুর্বলতা ও ওজন হ্রাস: কোনও আপাত কারণ ছাড়াই রোগীর ওজন কমতে থাকে। এর সঙ্গে থাকে ক্লান্তি, দুর্বলতা এবং খিদে কমে যাওয়ার মতো সমস্যা। রাতে ঘাম হওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। রোগ বাড়তে থাকলে মেরুদণ্ডের কশেরুকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং স্পাইনাল কর্ড বা স্নায়ুর উপর চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরা, অবশ হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা এবং ধীরে ধীরে হাঁটাচলার ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। পরিস্থিতি জটিল হলে কোমর থেকে নিম্নাঙ্গ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। রোগ যখন অনেকটা ছড়িয়ে পড়েছে, তখন মেরুদণ্ড সামনের দিকে ঝুঁকে কুঁজের (কাইফোসিস) মতো আকার ধারণ করতে পারে, যাকে ‘গিবাস ডিফর্মিটি’ বলা হয়।
স্পাইনাল টিবি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা গেলে এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসা করালে এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। এক্স-রে, সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই-এর মতো পরীক্ষার মাধ্যমে মেরুদণ্ডের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। অনেক সময় বায়োপসি বা ফ্লুইড পরীক্ষা করে জীবাণুর উপস্থিতি সম্পর্কেও নিশ্চিত হন চিকিৎসকেরা। রোগের মূল চিকিৎসা হলো অ্যান্টি-টিউবারকুলার থেরাপি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একাধিক ওষুধ ৯ থেকে ১২ মাস, বা ক্ষেত্রবিশেষে ১৮ মাস পর্যন্ত খেতে হয়। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে ওষুধের কোর্স শেষ করা অত্যন্ত জরুরি। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করে দিলে জীবাণু ফের সক্রিয় এবং আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। মেরুদণ্ডকে বিশ্রাম দিতে এবং বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে বিশেষ ধরনের ব্রেস বা বেল্ট পরার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদি স্নায়ুর উপর চাপ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছয় বা শিরদাঁড়ার গঠন ভেঙে পড়ে, তবে শল্যচিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
ভুল ভঙ্গিতে শোয়া-বসা-কাজ করার জন্য শরীরের নানা অংশের সঙ্গে দুই হাতে ও কাঁধেও ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে ৮-৯ ঘণ্টা টানা ডেস্কে বসে কাজে লিপ্ত অধিকাংশই ভোগেন হাত-পিঠ ও কোমরের ব্যথা। উঠতে বসতে পেশিতে টান তো ধরেই, অনেক সময়ে ঘাড় ও কাঁধের পেশি শক্ত হয়ে গিয়ে ফ্রোজেন শোল্ডারের উপসর্গও দেখা দেয়। এই রোগে কাঁধের বল ও সকেট সন্ধি আক্রান্ত হয় একটা সময়ের পর এমন জায়গায় চলে যায় যে, ব্যথার ওষুধ বা মলমেও কোনও কাজ হয় না। ফিজিয়োথেরাপির সাহায্য ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। তবে যোগাসন প্রশিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, নিয়মিত যদি একটি যোগাসন অভ্যাস করা যায়, ব্যথাবেদনা কমে যাবে সহজেই। এই যোগাসন কঠিন নয়, চেয়ারে বসেই করা যাবে। অফিসে কাজের ফাঁকেও করে নিতে পারেন। যোগাসনের এই বিশেষ পদ্ধতির নাম ‘আর্ম সার্কলিং’। অর্থাৎ, সহজ করে বললে হাত ঘোরানো। দাঁড়িয়ে বা চেয়ারে বসে এই আসন অভ্যাস করা যায়। পদ্ধতিতে খুব একটা তফাত নেই। চেয়ারে বসে সহজে কী ভাবে আসনটি করা যাবে তার পদ্ধতি কী ভাবে?
চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন। পিঠ ঝোঁকালে চলবে না। শিরদাঁড়া টানটান রাখতে হবে। পায়ের পাতা মাটিতে থাকবে। এ বারে দুই হাত কাঁধ বরাবর দু’দিকে সোজা করে ছড়িয়ে দিন। কনুই টানটান থাকবে। ধীরে ধীরে শ্বাসপ্রশ্বাস নিন। এতে মন স্থির হবে। তার পর দুই হাত দু’পাশে ছড়ানো অবস্থায় প্রথমে ঘড়ির কাঁটার দিকে একসঙ্গে ঘোরান। ৭ বার ঘোরাতে হবে। হাত দু’টি কোলের উপর রেখে ১০ সেকেন্ড বিশ্রাম নিন। এর পর একই ভঙ্গিতে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে হাত দু’টি ঘোরান। এ বারেও ৭ বার করতে হবে। এ ভাবে এক সেট সম্পূর্ণ হবে। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে ৩ সেট করে রোজ অভ্যাস করতে হবে।
উপকারিতা বলতে কাঁধ ও ঘাড়ের পেশি সুগঠিত হবে। কাঁধ, ঘাড় ও পিঠের ব্যথাবেদনা কমবে। ফ্রোজেন শোল্ডারের সমস্যা থাকলে এই আসন করে উপকার পেতে পারে। মেরুদণ্ড নমনীয় হবে, স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি কমবে। হাত বা কাঁধে অস্ত্রোপচার হলে আসনটি করবেন না। স্লিপ ডিস্কের সমস্যা থাকলে আসনটি করা যাবে না।





