শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জেতার পরে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হার মানতে হয়েছে ভারতের মহিলা দলকে। রবিবারের বিশাখাপত্তনমে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ভারতের মহিলা দল করল ৩৩০ রান। অজিদের বিরুদ্ধে হেরে গেলে নক আউটে পৌঁছনোর আশা কমবে হরমনপ্রীতদের। বল করতে নেমে অজিদের নিকেশ করাই লক্ষ্য এখন ভারতের। প্রোটিয়া ব্রিগেডের বিরুদ্ধে বোলিং ব্যর্থতাতেই ভারতকে হার মানতে হয়েছিল। রবি সন্ধ্যায় ভারতের বোলিং কীরকম হয়, সেটাই দেখার। একাধিক রেকর্ড গড়লেন স্মৃতি মান্ধানা। এক বছরে এক হাজার রান। দ্রুততম হিসেবে পাঁচ হাজার রান ও কনিষ্ঠতম হিসেবে পাঁচ হাজার রান করেন ভারতের ওপেনার স্মৃতি। মহিলাদের বিশ্বকাপে ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগে উদ্বোধন করা হল মিতালি রাজ স্ট্যান্ডের। বিশ্বকাপের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ ঘিরে টানটান উত্তেজনা ছিলই। টসে জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক অ্যালিসা হিলি। তিনি জানিয়েছেন, দলে একটিমাত্র পরিবর্তন আনা হয়েছে। সোফি মলিনিউক্স ফিরেছেন, জর্জিয়া ওয়ারহাম বাদ পড়েছেন। ভারতের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রথমে ব্যাট করতে নামা নিয়ে। এটি সেই একই ভেন্যু যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ভারত রান তাড়া করতে গিয়ে হেরে গিয়েছিল। হরমানপ্রীত বলেন, ‘‘পিচ আগের ম্যাচের তুলনায় অনেক ভাল দেখাচ্ছে। একই একাদশ নিয়ে নামছি। কখনও জিতবেন, কখনও হারবেন সেটা তো আগে থেকে বলা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ হল কীভাবে ফিরে আসা যায়। আমরা আগের ম্যাচে ৯৫ ওভার পর্যন্ত লড়াই করেছি, অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে।’’ স্মৃতি মান্ধানা ও প্রতীক্ষা রাওয়াল ওপেন করতে নেমে ১৫৫ রান করেন। প্রতীক্ষা ৯৬ বলে ৭৫ রান করেন। ১০টি বাউন্ডারি ও একটি ছক্কায় সাজানো ছিল তাঁর ইনিংস। অন্যদিকে স্মৃতি ৬৬ বলে ৮০ রানের ইনিংস খেলেন। ৯টি বাউন্ডারি ও ৩টি ছক্কা হাংরান তিনি। যেভাবে শুরু করে দিয়েছিলেন প্রতীক্ষা ও স্মৃতি, সেই মোমেন্টাম ধরে রাখতে পারলেন না বাকিরা। বাংলার রিচা ঘোষ অবশ্য ২২ বলে ৩২ রানের এক ইনিংস খেলেন। হরলীন দেওল (৩৮), অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর (২২) ও জেমাইমার (৩৩) জন্য ভারত শেষমেশ ৩৩০ রানে শেষ হয়। পুরো পঞ্চাশ ওভারও খেলতে পারল না ভারত। ৪৮.৫ ওভারে শেষ হয়ে গেল ভারতের ইনিংস। ভারতের পরের দুটো ম্যাচ ইংল্যান্ড ও নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে। এই ম্যাচে জয় ভারতকে নক আউটে দৌড়ে রাখবে।
১১২ ইনিংসে এই মাইলফলকে পৌঁছলেন স্মৃতি। ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে এই রেকর্ড ছিল বিরাট কোহলির। তিনি ১১৪টি এক দিনের ইনিংসে ৫,০০০ রানের মাইলফলকে পৌঁছেছিলেন। কোহলি ছাড়াও স্মৃতি রবিবার পিছনে ফেলে দিলেন শিখর ধাওয়ান, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, মহেন্দ্র সিংহ ধোনি, গৌতম গম্ভীর, সচিন তেন্ডুলকর, রোহিত শর্মাকে। স্মৃতি, কোহলির পর ভারতীয়দের মধ্যে এক দিনের ক্রিকেটে দ্রুততম ৫,০০০ রান করার তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ধাওয়ান। তিনি ১১৮ ইনিংসে এই কীর্তি গড়েছিলেন। এরপর রয়েছেন সৌরভ (১২৬ ইনিংস), ধোনি (১৩৫), গম্ভীর (১৩৫), সচিন (১৩৮), রোহিত (১৪২), মিতালি রাজ (১৪৪), রাহুল দ্রাবিড় (১৪৮)। শুধু দ্রুততম হিসেবেই নয়, কনিষ্ঠতম হিসেবেই মহিলাদের এক দিনের ক্রিকেটে ৫০০ রান করার রেকর্ড গড়লেন ২৯ বছরের স্মৃতি। মহিলাদের এক দিনের ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটার হিসেবে এক ক্যালেন্ডার বছরে ১,০০০ রান করলেন স্মৃতি। এক ক্যালেন্ডার বছরে সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার বেলিন্দা ক্লার্কের। তিনি ১৯৯৭ সালে ১৬টি এক দিনের ম্যাচে ৯৭০ রান করেছিলেন। তারপর থেকে এই ২৮ বছরে আর কেউ ৯০০ রানের গণ্ডিও পার করতে পারেননি। ২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার লরা উলভার্ট (১৮ ম্যাচে ৮৮২ রান) কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। স্মৃতি সকলকে ছাপিয়ে গেলেন।
৩৩০ করেও হার ভারতের। পর পর দুই ম্যাচে হারতে হল ভারতকে। কাজে লাগল না স্মৃতি মন্ধানার তিন বিশ্বরেকর্ড। বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৩৩০ রানের বিশাল স্কোর খাড়া করেও ৩ উইকেটে হারতে হল হরমনপ্রীত কৌরের দলকে। মহিলাদের এক দিনের ক্রিকেটে রান তাড়া করার বিশ্বরেকর্ড করে জিতল অস্ট্রেলিয়া। এক ওভার বাকি থাকতে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় অসিরা। আগামী রবিবার আরও এক কঠিন প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। সেই ম্যাচে হারলে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বে ভারত। স্মৃতির ৬৬ বলে ৮০ রানের ইনিংস ম্লান হয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক অ্যালিসা হিলির ১০৭ বলে ১৪২ রানের ইনিংসের কাছে। ২১টি চার, ৩টি ছক্কা রয়েছে হিলির ইনিংসে। ১২০টি এক দিনের ম্যাচ খেলা ৩৫ বছরের হিলি তাঁর যাবতীয় অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ম্যাচ বার করলেন। একটা সময়ে মনেই হয়নি অস্ট্রেলিয়া জিততে পারে। কারণ, ওপেনিং জুটিতে বড় রান তুললেও পাওয়ার প্লে-র পর রান তোলার গতি বাড়াতে পারেনি। প্রথম ১০ ওভারে ৮২ রান উঠলেও পরের ২০ ওভারে ১০০-র সামান্য বেশি রান করে অস্ট্রেলিয়া। ওই সময় দুই স্পিনার বাঁহাতি শ্রী চরণী এবং ডানহাতি দীপ্তি শর্মাকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয় অসি ব্যাটারদের। শ্রী চরণী ভারতীয় বোলারদের মধ্যে সেরা ছিলেন। তাঁর ১০ ওভারে ৪১ রান ওঠে। তিনি তিন উইকেট নেন। কিন্তু তার পরেও অস্ট্রেলিয়া বুঝিয়ে দিল কেন তারা সাত বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। হিলিকে শুরুতে সঙ্গত দেন ফোব লিচফিল্ড (৪০)। তিনি আউট হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া ধাক্কা খায় চোটের জন্য এলিস পেরি উঠে যাওয়ায়। যদিও তিনি আবার পরে ব্যাট করতে নামেন। পেরি উঠে যাওয়ার পর দু’ওভারে ফিরে যান বেথ মুনি (৪) এবং অ্যানাবেল সাদারল্যান্ড (০)। বিশেষ করে মুনির ফিরে যাওয়াটা অস্ট্রেলিয়ার কাছে বিরাট ধাক্কা ছিল। কিন্তু একা হিলিই জিতে দিলেন অস্ট্রেলিয়াকে। সঙ্গে ছিলেন অ্যাশলে গার্ডনার। ২৭.১ ওভারে অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেট হারিয়ে যখন ১৭০ রান তুলে সমস্যায়, সেখান থেকে ম্যাচ ঘোরান হিলি এবং গার্ডনার। দু’জনে চতুর্থ উইকেটে ৯৫ রান যোগ করেন। ৩৯তম ওভারে হিলি আউট হওয়ার পরেও ভারতের সামনে সুযোগ ছিল। তখনও অস্ট্রেলিয়ার দরকার ছিল ৬৬ রান। কিন্তু গার্ডনারের সঙ্গে তাহিলা ম্যাকগ্রা (৮ বলে ১২), সোফি মোলিনু (১৯ বলে ১৮), কিম গার্থ (১৩ বলে অপরাজিত ১৪) মাথা ঠান্ডা রেখে দলকে জেতান। মহিলাদের এক দিনের ম্যাচে রবিবার অস্ট্রেলিয়ার ৩৩১ রান তাড়া করে জেতা বিশ্বরেকর্ড। আগে কখনও এত রান তাড়া করে জেতেনি কোনও দল। রেকর্ড ছিল শ্রীলঙ্কার। তারা গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৩০২ রান তাড়া করে জিতেছিল। প্রশংসা করতে হবে স্মৃতির ইনিংসের। সমালোচনার জবাব দেওয়ার মঞ্চ হিসেবে বিশ্বকাপের কঠিনতম ম্যাচটিকেই বেছে নিয়েছিলেন স্মৃতি। মহিলাদের এক দিনের ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটার হিসাবে এক ক্যালেন্ডার বছরে ১,০০০ রান করলেন স্মৃতি। মহিলাদের এক দিনের ক্রিকেটে দ্রুততম হিসেবে ৫,০০০ রান করার কৃতিত্বও অর্জন করলেন স্মৃতি। ১১২ ইনিংসে এই মাইলফলকে পৌঁছোলেন স্মৃতি। শুধু দ্রুততম হিসাবেই নয়, কনিষ্ঠতম হিসাবেও মহিলাদের এক দিনের ক্রিকেটে ৫,০০০ রান করার রেকর্ড গড়লেন ২৯ বছরের স্মৃতি। ভারতকে ডুবিয়েছে ব্যাট করার সময় শেষ সাত ওভারের ব্যর্থতা। রিচা ঘোষ ২২ বলে ৩২ রান করে আউট হয়ে যাওয়ার পরে ভারত শেষ সাত ওভারে মাত্র ৩৬ রান তোলে। যেখানে ৩৫০ রান করা সম্ভব ছিল সেখানে ৩৩০ রান করেই থামতে হয় ভারতকে। ম্যাচের পরে ঠিক এই কথাই বলেন হরমনপ্রীত। ভারত অধিনায়ক বলেন, ‘‘আমরা যে ভাবে শুরু করেছিলাম, তাতে আরও ৩০-৪০ রান আমরা করতে পারতাম। শেষ ৬ ওভারে আমরা রান তুলতে পারিনি। তার খেসারত দিতে হল। আগের তিনটে ম্যাচে আমরা মাঝের ওভারগুলোয় ভাল ব্যট করতে পারিনি। আমাদের লোয়ার অর্ডার দায়িত্ব নিয়েছিল। আজ প্রথম ৪০ ওভার ভাল খেললাম। কিন্তু শেষের দিকে রান তুলতে পারলাম না।’’ পর পর দু’টি ম্যাচে হারতে হলেও চিন্তিত নন হরমনপ্রীত বলেন, ‘‘এগুলো হতেই পারে। দুটো ম্যাচ খারাপ গেলে বিশাল কিছু তফাত হয় না। আসল হল আমরা কী করে ঘুরে দাঁড়াতে পারি।’’





