‘‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বেশি দড়! রাজ্যের সিইও-র বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে। সময় হলে বলব। তিনি নিজে নানা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত। আশা করব, তিনি বেশি বেড়ে খেলবেন না!’’ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালকেও হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নির্বাচন, নির্বাচন প্রাক্কালে এসআইআর তোড়জোড়। উত্তরের দুর্যোগ সামলেছে ফের সোমবার উত্তরবঙ্গে যাবেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। সাংবাদিক সম্মেলনে পরপর একাধিক তথ্য তুলে প্রকাশ করলেন আশঙ্কা, বোঝালেন, এই বাংলা পৃথক। একদিকে যেমন প্রশ্ন করলেন, এসআইআর-এর নেপথ্যে কি এনআরসি? বিহারে করা গিয়েছে, তা বাংলায় করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী, নজরুল, মাতঙ্গিনীর নাম উল্লেখ করে বললেন, ‘বুঝতে হবে বাংলা একটু আলাদা। এই বাংলা অধিকারের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করে, ছাড়ে না। যদি মনে করেন, এজেন্সিকে দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেবেন, আমরা সব অ্যাকশনের জন্য প্রস্তুত। সব অ্যাকশনের পরেই কিন্তু রিঅ্যাকশন থাকে।’ মমতা মনে করালেন, আহত বাঘ, সুস্থ বাঘের থেকেও ভয়ঙ্কর। নির্বাচনের আগে এসআইআর তোড়জোড়? যদিও বাংলায় এখনও ভোটের নির্ঘন্ট দূর, কিছুই ঘোষণা হয়নি। তার আগে তোড়জোড় শুরু হতেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘বিহারে করতে পেরেছিলেন, কারণে সেখানে বিজেপি সরকার। কিন্তু বাংলা আলাদা। বাংলায় নানা জাতির, নানা ধর্মের মানুষের বাস। এসআইআরের নেপথ্যে কি এনআরসি-র উদ্দেশ্য লুকিয়ে রয়েছে? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, ‘এসআইআর-এর নামে ভোট কাটার চক্রান্ত চলছে। অসম সরকার কী করে বাংলার বাসিন্দাদের নোটিস পাঠাতে পারে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, এসআইএর কাজ শুরু হওয়ার আগে, বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কী করে বলেন, দেড় কোটি ভোটার বাদ দিতে হবে? তাহলে কি পরিকল্পনা হচ্ছে পার্টি অফিসে?’ চারদিকে দুর্যোগ, দুর্ভোগ, উৎসবের আমেজ, এই অবস্থায় দু’ মাসের মধ্যে প্রতিটি মানুষের সম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া কি সম্ভব? এদিন সেও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। মনে করান, তাড়াহুড়ো করে বিজেপির কথায় নাগরিকদের নাম যদি বাদ দেওয়া হয়, কোনও সম্প্রদায়ের যদি অধিকার হরণ করা হয়, তাহলে তা বরদাস্ত করবে না বাংলা সরকার। মমতার বক্তব্য, ‘বন্যায় মানুষের ঘরবাড়ি, কাগজপত্র সব ভেসে গিয়েছে। কোথা থেকে মানুষ এখন কাগজ দেবে? কেউ কেউ আবার উৎসবের ছুটিতে বাইরে আছেন। তাঁরাই বা এখন কাগজ দেখাবেন কীভাবে? এসআইআর নাকি এনআরসি? আমি শুনেছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলিক মিটিঙয়ে, কিছু নির্দেশ দিয়ে গেছেন। বলেছেন অনেক নাম বাদ দেব। বাদ দেবার কে তাঁরা? আজ ক্ষমতায় আছে, কাল নাও থাকতে পারে।’ তার পরেই মমতা বলেন, ‘আমি মনে করি এটা এসআইআর নয়, এনআরসি করার চক্রান্ত চলছে।’ কেন্দ্র, সরকারের একাধিক এজেন্সিকে একহাত নেন। বলেন, ‘যারা বিজেপির কথায় শুধুমাত্র রাজনীতি করছে, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভোটার তালিকা থেকে, উৎসব, সমস্ত এজেন্সিকে দিয়ে গৈরিকীকরণ করছে। একদল মিরজাফর আছে। এঁরা মনে করেছেন, তাঁরাই শেষ কথা বলবেন। ‘এসআইএর-এর নামে বৈধ ভোটারদের বাদ দিলে পরিণতি কী হতে পারে, কোন পর্যায়ে যেতে পারে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, তাও মনে করান মমতা। বিজেপিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আগুন নিয়ে খেলবেন না। নিজেদের সংযত করুন। আপনার মন্ত্রী যদি কাজ শুরু হওয়ার আগে বলেন দেড় কোটি ভোটার বাদ দেবে, প্রথমে ওই মন্ত্রীকে বাদ দিন, নয়তো বলুন এসব চক্রান্ত।’ মমতার সাফ বার্তা, দুটি বিষয় চলতে পারে না একসঙ্গে। এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের এক প্রতিনিধিদল এসেছে বঙ্গে। দলে রয়েছেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জ্ঞানেশ ভারতী। মমতার বক্তব্যে উঠে আসে এই প্রসঙ্গও। বিহারে নির্বাচন কমিশন যে ভাবে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা (এসআইআর) করেছে, বাংলায় তা হবে না। বৃহস্পতিবার নবান্নে এক সাংবাদিক বৈঠক করে এমনই দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দল যখন রাজ্যে, সেই সময়েই এসআইআর বিরোধিতায় আরও একবার সরব হলেন মমতা। পাশাপাশি, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালকেও হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেছেন, ‘‘বিহারে (এসআইআর) করতে পেরেছিলেন। কারণ, ওখানে বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার আছে। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা।’’ এর পরেই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘একদিকে বাংলায় দুর্যোগ চলছে। সামনে কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো, ছটপুজো রয়েছে। আর সেই সময়ে নির্বাচন কমিশনের চার জন অফিসার বিএলও-দের ডেকে হুমকি দিচ্ছেন। বলছেন, তাঁদের ইচ্ছেমতো কাগজ তৈরি করতে হবে।’’ জাতীয় নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিদের ‘বসিয়ে’ রেখে রাজ্যের সিইও ‘অতি সক্রিয়তা’ দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন মমতা। সেই প্রসঙ্গেই তিনি বলেছেন, ‘‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বেশি দড়! রাজ্যের সিইও-র বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে। সময় হলে বলব। তিনি নিজে নানা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত। আশা করব, তিনি বেশি বেড়ে খেলবেন না!’’
এর আগেও এসআইআর নিয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন মমতা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হুঙ্কার দিয়ে রেখেছেন, একজনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে এক লক্ষ লোক নিয়ে গিয়ে দিল্লিতে কমিশনের দফতর ঘেরাও করবেন। তবে বৃহস্পতিবার আরও এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককেই সতর্ক করতে চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী। এবং তা করলেন রাজ্যের সচিবালয়ে বসে। মুখ্যমন্ত্রী পাশে ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ এবং মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। মমতা মনে করালেন দুর্নীতির অভিযোগের কথাও। সময়ের নিরিখে যা ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে অনেকের অভিমত। বৃহস্পতি দুপুরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, ভোটার তালিকার যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরে ১৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে। জানুয়ারি মাসের যে কোনও সময়ে তা হবে বলে দাবি করেন শুভেন্দু। সময়ের হিসাব দিয়ে বিরোধী দলনেতা বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের ৫ মে-র মধ্যে নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। না হলে রাজ্যের শাসনভার সংবিধান মেনে চলে যাবে রাজ্যপালের হাতে। কারণ, বর্তমান সরকারের মেয়াদ ওই পর্যন্তই।’’ সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই শুভেন্দু বলেছেন, ‘‘যারা বলছে তিন মাস, চার মাস ধরে সব প্রক্রিয়া চলবে, তারা ভুল বলছে। তাদের সূত্র ঠিক নয়। ১৫ দিনের মধ্যে ফাইনাল ভোটার তালিকা প্রকাশ করা অসম্ভব। ঈশ্বর এসেও এই কাজ করতে পারবেন না।’’ ঘটনাচক্রে, বৃহস্পতিবার কোলাঘাটে পূর্ব মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং ঝাড়গ্রামের আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক করেন সিইও মনোজ। সূত্রের খবর, সেখানেও জেলাগুলিকে এসআইআর কার্যকর করার ব্যাপারে ‘কড়া’ বার্তা দেওয়া হয়েছে। মমতার অভিযোগ, বিজেপির অঙ্গুলিহেলনেই এই সমস্ত কাজকর্ম হচ্ছে। যার ফলে মানুষের ভোটাধিকার নিয়েই সংশয় তৈরি হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এসআইআর-এর কাজ শুরুর আগে বিজেপির এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কী করে বলেন যে, দেড় কোটি ভোটারের নাম বাদ দিতে হবে? তা হলে কি পার্টি অফিসে পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে আর নির্বাচন কমিশন তাতে সিলমোহর দিচ্ছে? কমিশনের কাছ থেকে আমরা নিরপেক্ষতা আশা করেছিলাম।’’ অসম সরকার কী ভাবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এনআরসি-র নোটিস পাঠাচ্ছে সেই প্রশ্নও তোলেন মমতা। বিরোধী দলনেতার দাবি, সারা ভারতে যেখানে ভোটার বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ সেখানে পশ্চিমবঙ্গের ১০৫টি বিধানসভায় ভোটার বৃদ্ধির হার ২০-৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ লাগোয়া জেলাগুলিতেই এই বৃদ্ধি বলে দাবি তাঁর।





