পুজোর অনুদান। ভোটবাক্সে দক্ষিনা? পুজো অনুদানের নেপথ্যে রয়েছে নিজের ছবি টাঙানোর বাধ্যবাধকতা। শুরুতে অঙ্কটা ছিল ১০ হাজার। বাড়তে বাড়তে সাত বছরে দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ১০ হাজার। সাত বছর আগে প্রাপক বারোয়ারির সংখ্যা ছিল ২৮ হাজারের বেশী। সাত বছরে বাড়তে বাড়তে পৌঁছেছে ৪৫ হাজারে। মুখ্যামন্ত্রীর উদ্বোধনের সংখ্যায় নজির। ২০২৫ এ ৩০০০ ছাড়িয়েছে। কলকাতা এবং জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল মিলিয়ে তিন হাজারেরও বেশি পুজো উদ্বোধন করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাঁকা থাকা পুজোর মাঠে তৃণমূলনেত্রী একাই স্ট্রাইকার, মিডিও থেকে নিজেই গোলরক্ষক। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর পুজো উদ্বোধনকে কুশলী রাজনীতিকের মতো জনসংযোগের মঞ্চ করে তোলার অস্ত্র বের করা। বাম জমানায় নানা ক্ষেত্রে সিপিএমের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও পুজোয় ছিল না। বামপন্থী হয়ে পুজোর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভবও ছিল না। সুভাষ চক্রবর্তীর মতো কিছু নেতার উদ্যোগে কিছু এলাকায় স্থানীয় স্তরের কিছু নেতা পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকলেও দলগত ভাবে মণ্ডপে মণ্ডপে সিপিএমের উপস্থিতি থাকত না। উল্টে আদর্শের কারণে পুজো থেকে সচেতন ভাবে ‘দূরেই’ থাকত সিপিএম। উপস্থিতি পুজোর মূল মণ্ডপ থেকে কিঞ্চিৎ দূরে রাস্তার ধারে পুজোর গ্যালারিতে। প্রগতিশীল মার্ক্সীয় পুস্তক বিপণন কেন্দ্রে।
২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে প্রথম পুজোর আগে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত মমতা দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন মণ্ডপে ঘুরছিলেন। গভীর রাতে চেতলার একটি আবাসনে হঠাৎই ঢুকে পড়ে মুখ্যমন্ত্রীর সংক্ষিপ্ত কনভয়। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী আবাসনের পুজো দেখতে এসেছেন। সেই মুহূর্তেই সেই পুজো ‘মমতার পুজো’। বিরোধী নেত্রী থাকার সময় থেকেই মমতা কলকাতার কিছু পুজোয় যেতেন। জেলার পুজোয় শুভেচ্ছাবার্তা পাঠাতেন। ২০০৪ সালের পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু জেলার নেতা কালীঘাটে এসে মমতার ভিডিয়োবার্তা রেকর্ড করে নিয়ে যেতেন। তার পরে তা সিডি-র মাধ্যমে দেখানো হত প্যান্ডেলে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে তা আরও অনেক বড় আকারে উপস্থাপিত করেছেন মমতা। পুজোর ময়দানে একাই দাপিয়ে বেড়ান প্রতি বছর। ব্যতিক্রম পুজোমণ্ডপ উদ্বোধনী কর্মসূচিতে ‘ভার্চুয়াল উদ্বোধন’ সূচি।
বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা কলকাতা বা জেলার পুজো উদ্বোধনে হাতে গোনা। কলকাতায় একমাত্র সজল ঘোষ ছাড়া বিজেপির হাতে কোনও বড় পুজো নেই। পুজো উদ্বোধনে মমতার কেন্দ্রের লাগোয়া এলাকায় তিনটি মণ্ডপ উদ্বোধনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মমতা পুজোর মাঠ ক্লাবগুলিকে অনুদান দিয়ে এবং কার্নিভাল চালু করে। মুখ্যমন্ত্রী অধীনস্থ তথ্যসংস্কৃতি দফতরের তত্ত্বাধানে রেড রোডের দু’পাশে আগামী ৫ অক্টোবরের কার্নিভালের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরেই পুজোর অনুদান দেওয়া শুরু করেননি মমতা। অনুদান শুরু করেছিলেন ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসারও দু’বছর পর, ২০১৮ সাল থেকে। ২০১৪ সালে বিজেপি দেশের ক্ষমতায় আসার পরেও পুজোয় অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি মমতা। অনুদান চালু করেছেন ২০১৮ সাল থেকে। রাজ্যে বুথ সংখ্যা ৮০ হাজারের কিছু বেশি। পুজোর অনুদান পাচ্ছে ৪৫ হাজার কমিটি। গড় করলে দেখা যাবে প্রতি দু’টি বুথ পিছু একটি কমিটি মমতার দেওয়া পুজো অনুদান পাচ্ছে। মমতার বার্তা ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। পুজো অনুদানের নেপথ্যে রয়েছে নিজের ছবি টাঙানোর বাধ্যবাধকতা। প্রথম বার পুজো অনুদানের অঙ্ক ছিল ১০ হাজার টাকা। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় ২৫ হাজার টাকা। কোভিড পর্বে ২০২০ এবং ২০২১ সালে এক লাফে ৫০ হাজার টাকা করা হয় পুজো অনুদানের অর্থ। ২০২২, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে অনুদান দেওয়া হয় যথাক্রমে ৬০, ৭০ এবং ৮৫ হাজার টাকা। আগামী বছর রাজ্যে বিধানসভা ভোট। তার আগে এ বার অনুদানের অঙ্ক পৌঁছেছে ১ লক্ষ ১০ হাজারে। পুজো অনুদানের পাশাপাশি পুজো কমিটিগুলিকে বিদ্যুতের বিলেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। ছাড়ের পরিমাণও বছর বছর বেড়েছে। যেমন বেড়েছে। পুজোয় অনুদান দিয়ে ভোটের বাজারে বিপণন করেছেন মমতা।





