ক্রিকেট। রাজনীতি। কোনটা আগে? কোনওদিন ব্যাটে হাত না দেওয়া রাজনীতিক ক্রিকেটের সমালোচক! গ্যালারিকে তুষ্ট করতে ভুমিকা রাজনীতিকের। দেশের জনতা ক্রিকেটমাঠের সঙ্গে ভারত-পাক রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলবে। খেলার মাঠ এবং রাজনীতি বরাবর হাত ধরাধরি করে চলে এ দেশে। এশিয়া কাপের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিসিসিআই তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বঙ্গ ক্রিকেটেও খামতি নেই। কেনই বা খেলার সিদ্ধান্ত? আবার বিবৃতির প্রায়শ্চিত্ত? খেলা উচিত হয়েছে? খেলা উচিত হয়নি? তর্কে-বিতর্ক। তুফান ড্রয়িংরুম থেকে ড্রয়িংরুমে। সমাজমাধ্যমের এ দেওয়াল থেকে ও দেওয়ালে। সারা দেশ বিতর্কে নেমে পড়েছে! প্রাক্তন ক্রিকেটার, রাজনীতিক, সবজান্তা দাদা, পাড়ার লালু ভুলু, চ্যানেলের বিনাপয়সায় পাওয়া সহজলভ্য দিগ্গজ, কোনওদিন ব্যাটে হাত না-দেওয়া প্রাজ্ঞ, পাকেচক্রে নারদ-নারদ লেগে গেলে টিভি-র সামনে বসা জিভে টকাস-টকাস শব্দ করে তেঁতুলের আচার খাওয়ার মতো যুদ্ধস্বাদলোভী বীর। সকলে তর্কে এসে মাথা মেরে জুটে গেছে।
ভারতীয় ক্রিকেটারদের কি কোনও বিবেক নেই র্যা? টাকা-টাকা আর টাকা? ল্যাল-ল্যাল করে দুবাইয়ে খেলতে চলে গেল? ছিছিক্কার চারদিকে। টসের পরে পাকিস্তানের অধিনায়ক সলমন আলি আঘার সঙ্গে হাত মেলাননি ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। ছোট হাফ টার্নে ঘুরে সটান হাঁটা লাগিয়েছিলেন সাজঘরের দিকে। হাত মেলাননি সলমনও। দুটো বিপরীতমুখী ট্রেন পাশাপাশি লাইনে একে অপরের পাশ দিয়ে চলে গেল। ভারতীয় অধিনায়ক নিতান্ত নিমরাজি হয়ে খেলতে এসেছেন। কারণ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যালেন্ডার মেনে চলতে হয়। যখন-তখন ‘না’ বলে দেওয়া যায় না। ক্রিকেটবিশ্বে সবচেয়ে উত্তেজক এবং দামি ম্যাচ বলে কথা। স্পনসর আছে। দর্শক আছে। বিশেষজ্ঞ আছে। ভারত জুড়ে থাকা লভ্যাংশ কাচিয়েকুচিয়ে তুলে নিতে হবে তিন ঘণ্টার রিয়্যালিটি শো থেকে। তবেই না! অর্থগৃধ্নু ক্রিকেটারদের কাণ্ডকারখানায় ভারতবাসী হিসাবে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। মুনাফাখোর বিসিসিআইয়ের নিন্দায় কান পাতা দায়! ভনভন করছে সেই মক্ষিকারব। পাকিস্তানকে লেজেগোবরে করে হারালেও কোনও বালাই নেই। শোল্ডার ড্যাশ। সাইডলাইনের বাইরে পাক সেনারা। যাবতীয় সাইড শো সেন্টার সার্কলের।
নীরব প্রতিবাদে। বদলা। পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের দূরেই রাখল সূর্যকুমারের ভারত। ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফ্টই পাক অধিনায়ককে ভারতের অধিনায়কের সঙ্গে হাত মেলাতে নিষেধ করেছিলেন? কে জানে! সলমন আলি আঘা হঠাৎ সলমন ‘দাবং’ খান হয়ে প্রতিপক্ষের অধিনায়কের হাত-টাত মুচড়ে অর্থাৎ মর্দন করে দিতে পারেন? না কি চড়-টড়? পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডে সরকারি ভাবে আইসিসি-র কাছে দাবি, পাইক্রফ্টকে অবিলম্বে এশিয়া কাপের ম্যাচ রেফারির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে। বিশাল একটা ছক্কায় ম্যাচ জিতে যখন সূর্যকুমার সতীর্থ শিবম দুবেকে নিয়ে ফিরছেন সাজঘরে, প্রথামতো পাকিস্তানের পুরো দল তাঁদের সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য দাঁড়িয়ে বাউন্ডারির ধারে। তাদের সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ঔদ্ধত্যের বিজ্ঞাপন চুয়িংগাম চিবোতে চিবোতে। পরিপার্শ্বকে তাচ্ছিল্য। ম্যাচ অফিশিয়ালদের সঙ্গেও হাত মেলাননি। ভারতীয় সাজঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় ভিতর থেকে। পাকিস্তানের এক ক্রিকেটার ভারতীয় ড্রেসিংরুমে গেলেও বন্ধ দরজা খোলেনি। করমর্দন সংঘটিত না-হওয়ার প্রতিবাদ। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পাকিস্তান অধিনায়ক এলেন না। সাম্প্রতিককালে ক্রিকেটে দেখা যায়নি। ম্যাচের সেরা, পরাজিত অধিনায়ক এবং বিজয়ী অধিনায়ক। এই ক্রমপর্যায়ে পুরস্কার বিতরণীতে ডাক। রবি রাতে ম্যাচের সেরা কুলদীপ যাদবের পরেই সটান সূর্য উদয়! পাকিস্তান টিমকে ক্যামেরার ফ্রেমে খুঁজে পাওয়া গেল না। সঞ্জয় মঞ্জরেকর সত্যিই যাকে বলে, ‘অসাম’! পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মিষ্টি করে সূর্যের জন্য ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ গেয়ে দিলেন। এশিয়া কাপে গায়ক মঞ্জরেকরের পারফরম্যান্স, একেবারে গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো। পিন চাপালেই গান শুরু! একদা বাংলাভাষাতেও গান গেয়েছিলেন অনুপম রায়ের পরিচালনায়। বাংলায় তাঁর গুণমুগ্ধেরা ভেবেছিলেন, মুম্বই থেকে কিশোরকুমারই এলেন বুঝি। তেমন কিছু হয়নি। ওই প্রথম। ওটাই শেষ। মঞ্জরেকর সত্যিই ‘অসাম’। অ-সামঞ্জরেকর। মঞ্জরেকরের কোঁত পেরে ধারাবিবরণী শুনলে মনে হয়, কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। যে সমস্ত মন্তব্য করেন, তাতে পরশ্রীকাতরতা মকমক। রবীন্দ্র জাডেজা সম্পর্কে ‘বিট্স অ্যান্ড পিসেস ক্রিকেটার’ বিশেষণ স্মর্তব্য।
ফের আসা যাক হ্যান্ডশেক বিতর্ক! দুবাইয়ে কার নির্দেশে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলায়নি সূর্যকুমারের ভারত? নিউজিল্যান্ডের নাগরিক তথা অধুনা পাকিস্তান দলের হেড কোচ মাইক হেসন ম্যাচের পরে বলেন, ম্যাচের শেষে ভারতীয় দল পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত না মেলানোর প্রতিবাদে পাকিস্তানের অধিনায়ক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যাননি। হেসন আরও জানিয়েছেন, ভারতীয় ক্রিকেটারেরা খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব দেখাননি। এমনটা কোনও ভারতীয় ক্রিকেট অধিনায়ক করেছেন বলে মনে করতে পারছি না। কোনও ভারতীয় খেলোয়াড়ই কি করেছেন? মনে তো পড়ে না। প্রথাগত কথাবার্তা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে মাইক্রোফোনটা না-ফিরিয়ে দিয়ে সূর্যকুমার জানালেন, তাঁর আরও কিছু কথা বলার আছে। সে কথা পহেলগাঁও নিয়ে। সে কথা তাঁরা পহেলগাঁওয়ের শহিদদের পরিবারের পাশে আছেন, তা জানিয়ে। ভারতীয় সেনাকে সাধুবাদ জানিয়ে। সে কথা পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দিয়ে দেশবাসীকে ‘রিটার্ন গিফ্ট’ দেওয়ার ঘোষণা। সূর্যকুমার বলেন, ‘‘আমাদের সরকার এবং বিসিসিআই একমত হয়েই এখানে খেলতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা ওদের পাকিস্তানের মুখের মতো জবাব দিতে পেরেছি। জীবনে কিছু কিছু বিষয় স্পোর্টসম্যান স্পিরিটের চেয়েও বেশি জরুরি। আমরা পহেলগাঁওয়ে নিহতদের পরিবারের পাশে আছি। আমরা এই জয় ভারতীয় ফৌজের সেই সেনানীদের উৎসর্গ করছি, যাঁরা অপারেশন সিঁদুরে লড়াই করেছিলেন।’’ কড়া বিবৃতি। সন্দেহ নেই। খুব সপ্রতিভ? উইংসের ধার থেকে প্রম্পট? দেশজ জনতার ভক্ত অংশ এবং সরকারের চাপে?
সূর্যদের হাত না মেলানোর প্রতিবাদ পাকিস্তানের, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বয়কট পাক অধিনায়কের, এই সাইড শো। পহেলগাঁওয়ের ঘটনার প্রতিবাদে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে না খেললে দেশভক্তির চাপটা আসত না। বিশ্ব অ্যাথলেটিক মিটে ভারতের এক নম্বর জ্যাভলিন থ্রোয়ার নীরজ চোপড়া নামবেন। যাঁর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের আরশাদ নাদিম। ৫ অক্টোবর মহিলাদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে কলম্বোয় ভারত-পাক ম্যাচ। নীরজ বিশ্ব মিটে নাদিমের বিরুদ্ধে নামলে কি দেশবাসীর রোষের মুখে পড়বেন? ন৫ অক্টোবরের ম্যাচের আগে এই জিগির তোলা হবে যে, হরমনপ্রীত সিংহ-স্মৃতি মন্ধানারা কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে খেলতে নামছেন? বিরিঞ্চিবাবাদের নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ। ২১ সেপ্টেম্বর, আগামী রবিবার এশিয়া কাপের সুপার ফোরে আবার ভারত-পাক মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ২৮ সেপ্টেম্বর এশিয়া কাপের ফাইনালেও ভারত-পাক ম্যাচের সম্ভাবনা। ভারতীয় ক্রিকেটারদের কোনও দেশভক্তিই নেই। আবার পাকিস্তানের সঙ্গে খেলতে নেমে পড়ল? আমদের দেশের ক্রিকেটারেরা এক একজন ঈশ্বর। গাড়ি-বাড়ি-ঘড়ির বৈভব, বাহুলগ্না সুন্দরী, আশরীর ট্যাটুর কোলাজ, ঝাকানাকা জীবনযাপন। এই ম্যাচ না খেললে যার সর্বোচ্চ পরিমাণ হতে পারত ১,৭০০ কোটি টাকা গুনাকার। ময়দান ছেড়ে সরে আসাটা বীরের কাজ নয়। সুযোগ পেলেই ঘেঁটি ধরে শোধ নেওয়া উচিত। এটা যুদ্ধক্ষেত্র নয়। খেলার মাঠ। পাকিস্তান নেহাতই দুধ-ভাত। অপারেশন সিঁদুরে যেমন, ক্রিকেটের মাঠেও একই প্রতিচ্ছবি।





