কত দিন বাঁচবেন, কোন কোন অসুখে ভুগবেন, তার সবটাই নাকি নির্ভর করবে সময়ের উপরেই। কী খাচ্ছেন, কতটা এবং কোন সময়ে খাচ্ছেন, এই তিনটি বিষয়ে যদি সঠিক নিয়ম মানা যায়, তা হলে আয়ুষ্কাল বেড়ে যাবে অনেকটাই। বিশেষ করে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে জলখাবার খেলে অকালবার্ধক্য রোধ করা যাবে, শরীরের একটি ঘড়ি আছে, যাকে বলে ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’। এই ঘড়িটিও ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড ধরেই চলে। এই ঘড়ি অনুযায়ীই শরীরের ক্রিয়াকর্ম চলতে থাকে। আমেরিকার মাস জনারেল ব্রিগহ্যাম হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, একজন মানুষ কখন খাবেন, কখন ঘুমোবেন, তা ঠিক করে দেয় ওই ঘড়ি। তাই ওই সময়ের অন্যথা হলেই তখন শরীরের বাকি কাজগুলি এলোমেলো হয়ে যায়। শরীরের ঘড়ি বলে সকালের জলখাবার খাওয়া উচিত ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে। যিনি রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমোতে যান, তাঁর সকাল ৮টার মধ্যে প্রাতরাশ সেরে ফেলা উচিত। আবার যিনি সকাল সকাল ভারী শরীরচর্চা করেন, তাঁর শরীরচর্চা শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা পরে জলখাবার খাওয়া উচিত। এই সময় ধরে চললে, হজমপ্রক্রিয়া যেমন ঠিক ভাবে এগোবে, তেমনই হরমোনের গোলমাল হবে না। ফলে শরীরের কলকব্জা সক্রিয় থাকবে বহু দিন, পিছিয়ে যাবে বার্ধক্যের সময়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই এই নিয়ম মানেন না, যে কারণেই নানা অসুখবিসুখ দেখা দেয়।
‘কমিউনিকেশন মেডিসিন’ জার্নালে এই গবেষণার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও রয়েছেন এই গবেষণায়। তাঁরা জানিয়েছেন, ২৯৪৫ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ৪২ থেকে ৯৪। অনেক বয়স্কেরাও ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের এক দলকে নিয়ম মেনে জলখাবার খাওয়ানো হয়, অন্য দলকে তাঁদের ইচ্ছামতো চলতে দেওয়া হয়। দেখা যায়, যে দলের লোকজন রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে গিয়েছিলেন ও সকাল ৮টার মধ্যে প্রাতরাশ সেরেছেন, তাঁদের শরীরে জটিল কোনও রোগ হয়নি। বরং তাঁদের হৃদ্রোগ ও ডায়াবিটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে গিয়েছে। আর যাঁরা অনিয়ম করেছেন, তাঁদের স্থূলত্ব বেড়েছে, হজমের গোলমাল ও হরমোনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। জলখাবার খাওয়ার সময়ে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই কী খাচ্ছেন, তা-ও জরুরি। ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, ফাইবার, ভিটামিন ডি-এর মতো গুরুত্বপূ্র্ণ উপাদান প্রাতরাশে রাখতেই হবে। আর রাখতে হবে প্রোটিন। প্রাতরাশে ঠিক কতটা প্রোটিন দরকার, সে বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই অনেকেরই।প্রতি দিন প্রাতরাশে ২৫ থেকে ৩০ গ্রামের মতো প্রোটিন থাকলে ভাল হয়। এক জন প্রাপ্তবয়স্কের শরীরের প্রতি কেজি ওজন পিছু ০.৮ গ্রাম প্রোটিনের দরকার হয়। যাঁরা ভারী শরীরচর্চা করেন, তাঁরা প্রতি কেজি ওজন পিছু ১.৩ গ্রাম থেকে ১.৬ গ্রাম প্রোটিন খেতে পারেন। বয়স, উচ্চতা, ওজন, কী ধরনের কাজ করেন, কতটা পরিশ্রম করেন, এই সব কিছুর উপরেই নির্ভর করবে দিনে ঠিক কতটা প্রোটিন জরুরি। প্রাতরাশে প্রোটিন অবশ্যই খেতে হবে, কিন্তু মেপে। যাঁরা দু’টি করে ডিমসেদ্ধ খাচ্ছেন, তাঁরা সঙ্গে দুটি রাগি বা বাজরার রুটি ও এক বাটি ফল রাখুন। এতে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবারের চাহিদা মিটে যাবে। মুগ ডালের ইডলি বা দোসা, পনিরের পুর ভরা দোসা খাওয়া যেতে পারে। ভারী শরীরচর্চা করলে প্রাতরাশে দু’টি ডিম খাওয়া যেতে পারেই। বাদামও রাখতে পারেন পরিমিত পরিমাণে। খেয়াল রাখতে হবে, প্রাতরাশই শক্তির উৎস। সকালের প্রথম খাবারই সারা দিনের শক্তির জোগান দেবে। তাই প্রাতরাশে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার রাখাই উচিত।
কিডনির অসুখ হয়ে উঠতে পারে নিঃশব্দ ঘাতক। কারণ, কিডনির সমস্যা বুঝে উঠতেই দেরি হয়ে যায় অনেক সময়ে। চিকিৎসকেরা বলেন, কিডনি অনেক সময় যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে লক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়। অথচ সময়ে চিকিৎসা হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিডনির অসুখের নিরাময় সম্ভব। সেই কারণে, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রত্যঙ্গ নিয়ে হেলাফেলা করা ঠিক নয়। সামান্যতম উপসর্গেও সতর্কতা প্রয়োজন। পেটে, পিঠে ব্যথা হয় নানা কারণে। কখনও গ্যাস-অম্বলে, কখনও আবার শোয়া-বসার ভঙ্গিমার দোষে। কিন্তু কোনটি সাধারণ ব্যথা আর কোনটি কিডনির অসুখের ইঙ্গিতবাহী, তা বুঝতে না পারলেই বিপদ। এ ক্ষেত্রে শুধু ব্যথা কমানো যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসার। অনেক সময় কোমরের নীচের অংশে বা পিঠের দিকে ব্যথা লোকেরা পেশির টান, পেশির ব্যথা বলে ভুল করে ফেলেন। অনেক সময় এটাই কিন্তু কিডনির অসুখের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। ব্যাথা কোথায় হচ্ছে, সেই স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। হাড়ের দুর্বলতা, বসার ভঙ্গির বলে কোমরে ব্যথা হলেও সেটি হবে শিরদাঁড়ার মাঝের অংশে কোমরের একেবারে নীচের দিকে। ব্যথা নিতম্ব থেকে ঊরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিডনির অসুখে ব্যথা ঠিক পিঠের তলদেশে সব সময় হয় না। বরং ব্যথা হয় পাঁজর যেখানে শেষ হচ্ছে, তার নীচে। শিরদাঁড়া সংলগ্ন অংশ নয়, ব্যথা হয় কোমরের দিকে। কখনও কখনও ব্যথা তলপেটের দিকেও হয়। কোমর থেকে তলপেটের মাঝের অংশ বা তলপেটেও ব্যথা হতে পারে। মাংশপেশিতে টান ধরলে বা বসার ভঙ্গিমায় ভুল হওয়ার ফলে ব্যথা হলে আরাম করে বসলে সেটি কমে যাবে। তা ছাড়া, বিশ্রাম নিলে কষ্টও কমবে। কিডনির ব্যথা শুরু হলে যে ভাবেই শোয়া-বসা হোক না কেন, কোনও ভঙ্গিতেই আরাম মিলবে না। শুয়ে থাকলেও এই ব্যথা কমবে না। ওষুধ প্রয়োগে সাময়িক আরাম মিলতে পারে। সাধারণ ব্যথায় মাংসপেশিতে ব্যথা হতে পারে। জোরে চাপ দিলে ব্যথা লাগবে। মাংসপেশি প্রসারিত হলেও যন্ত্রণা হবে। কিন্তু কিডনির অসুখে এমনটা হয় না। যে জায়গায় যন্ত্রণা হচ্ছে, সেখানে চাপ দিলে আলাদা কোনও ব্যথার অনুভূতি হয় না। চিকিৎসক সতর্ক করছেন, ব্যথার সঙ্গে কোমরের নীচে দিকে ফোলা ভাব, প্রস্রাবের সময় জ্বালা, যন্ত্রণা, প্রস্রাবের রং বদলে যাওয়া কিডনির অসুখের ইঙ্গিতবাহী। তীব্র ব্যথা কিডনিতে পাথর হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। ব্যথা কিছু ক্ষণ পরে না কমলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
খাবারের জগতে চিজ়ের খাতির আলাদাই। পিৎজা হোক বা রিসোত্তো খাবারে মিশে থাকা চিজ়ের স্বাদ অনবদ্য। মুচমুচে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হোক বা ভাজাভুজি। চিজ সসে্র সঙ্গত কিন্তু দারুণ জমে। স্যান্ডউইচ থেকে স্যালাডেও চিজ়ের সঙ্গ দারুণ। ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ জার্নালে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা সংক্রান্ত তথ্য বলছে, চিজ়ের মতো দুগ্ধজাত পণ্য কার্ডিয়োভাস্কুলার অসুখের ঝুঁকি কমায় ৩.৭ শতাংশ। স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায় ৬ শতাংশ। ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষাতেও প্রকাশ পেয়েছে চিজ় হার্টের অসুখ, টাইপ ২ ডায়াবিটিস, হাড় ভঙ্গুর হওয়ার প্রবণতা কমায়। দুধ থেকে তৈরি হয় চিজ। তৈরির পদ্ধতি, স্বাদ, গুণগত মানের উপর ভিত্তি করে এর নানা রকম নামও আছে।উপকারিতাও কম নয়। এক টুকরো পার্মেসন চিজ় মানবদেহে দৈনিক ক্যালশিয়ামের চাহিদার ৩০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। তা ছাড়া, এতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিনও মেলে। জ়িঙ্ক, রাইবোফ্ল্যাভিন, ভিটামিন বি১২-এর উপস্থিতি খাবারটির পুষ্টিগুণ বাড়িয়েছে। স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে, লোহিত কণিকা উৎপাদনে ভিটামিন এবং খনিজগুলির ভূমিকা রয়েছে। কোনও কোনও চিজ়ে মেলে ভিটামিন কে২, স্বাস্থ্যের জন্য যা বিশেষ উপযোগী। চিজ় ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কমিয়ে টাইপ ২ ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।
বেরি জাতীয় ফল খাওয়া শরীরের জন্য খুবই ভাল। কিডনির অসুখ হোক বা ডায়াবিটিস, বেরি জাতীয় ফল খাওয়ারই পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। বেরিজাতীয় ফলে অ্যান্থোসায়ানিন নামক এক ধরনের ফ্ল্যাভোনয়েড থাকে, যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, অকালবার্ধক্য ঠেকায় এবং শরীর তরতাজা ও চনমনে রাখে। স্মৃতিশক্তি প্রখর করে। ডায়াবিটিসেও নিশ্চিন্তে খাওয়া যায় বেরি জাতীয় ফল। ব্লুবেরি সে ক্ষেত্রে খুবই উপকারী। এই ফলে ফাইবার থাকে বেশি। ক্যালোরি কম। নানা ধরনের ক্যানসারের আশঙ্কাও কমায় ব্লুবেরি। আবার ওজন কমাতে চাইলেও ব্লুবেরির সাহায্য করতে পারে। হৃদ্রোগের আশঙ্কাও কমিয়ে দেয় এই ফলগুলি। এতে থাকা অ্যান্থোসায়ানিন শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ফলগুলিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবারও আছে, যা হজম ক্ষমতা বাড়ায়। বাতের ব্যথায় ভুগছেন যাঁরা, বিশেষ করে অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে, তাঁদের জন্য খুবই উপকারী বেরি জাতীয় ফল। ত্বকের বলিরেখার সমস্যা দূর করতেও বেরি জাতীয় ফল রোজের ডায়েটে রাখতে পারেন। ত্বকের কোষে কোলাজেন উৎপানেও সাহায্য করে বেরি জাতীয় ফল। ক্যালশিয়াম থাকার জন্য হাড় মজবুত রাখতেও চিজ় খাওয়া দরকার। বিশেষত, বয়সকালে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এই ধরনের ঝুঁকি কমাতে পাতে চিজ় রাখা ভাল। শুধু পুষ্টিগুণে নয়, চিজ় সমৃদ্ধ খাবার পরিতৃপ্তিও আনে। কিন্তু স্বাস্থ্যকর উপায়ে খেলেও রোজ কি চিজ় খাওয়া ভাল, এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। পুষ্টিগুণে ভরপুর চিজ় নিয়মিত খাওয়া যায়, তবে পরিমিতিবোধ খুব জরুরি। চিজে ক্যালোরির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। ফলে প্রতি দিন চিজ় খেলে ওজন বেড়ে যেতে পারে। তা ছাড়া, এই খাবারে ফ্যাটের মাত্রাও বেশি। কোনও কোনও চিজ়ে সোডিয়ামের মাত্রা বেশি। ফলে রক্তচাপ উপরের দিকে থাকলে চিজ় বেশি খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে, নুন যুক্ত চিজ় খাওয়া বন্ধ করতে হবে। চিজ খেলেও খুব সামান্য পরিমাণে খেতে হবে। দুধে থাকা ল্যাক্টোজ হজমে সমস্যা হলে, সব ধরনের চিজ় হজম হবে না। এই ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন রকম চিজ়ের পুষ্টিগুণ আলাদা। স্বাস্থ্যের কথা ভাবলে গোডা, পার্মেসন, সেডার এই ধরনের চিজ ভাল। এতে থাকে প্রোবায়োটিক, যা পেটের স্বাস্থ্য ভাল রাখে। পিৎজা, পাস্তা নিয়মিত খাওয়া ঠিক নয়। চিজ়ের পুষ্টিগুণ পেতে হলে ফল, ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। কম নুন এবং কম ক্যালোরির চিজ। চিজ স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর নয়। একাধিক গবেষণায় এর পুষ্টিগুণ প্রমাণিত। কিন্তু পরিমিত পরিমাণে না খেলেই সমস্যা। তখন উপকার, অপকারে বদলে যেতে পারে।




