প্রসূন ব্যানার্জী
প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলার
কিছু লিখতে বসলেই স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিরে যাই চার-পাঁচ দশক আগে, আমার ফুটবলার জীবনের দিনগুলোতে। খিদিরপুর ক্লাবে এক মরশুম খেলেই সই করেছিলাম মোহনবাগানে। আর এই ক্লাবে সই করার পরে বহু বছর হয়েছে, পুজোর সময়টা কলকাতাতে থাকাই হয়নি। কারণ সেই সময় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে কলকাতার বাইরে একাধিক সর্বভারতীয় ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলতে যেতে হত। কখনও দার্জিলিংয়ে গোল্ড কাপে। কখনও দিল্লিতে ডুরান্ড কাপ বা ডিসিএমে। দিল্লিতে খেলা হলে তবুও প্রবাসী বাঙালিদের পুজোতে বা দিল্লি কালী বাড়িতে গিয়ে অঞ্জলিটা দিতে পেতাম। কিন্তু অন্য কোনও শহরে গেলে তা হত না। এই সময়ে দেশের হয়ে খেলতে একাধিকবার বিদেশেও চলে যেতে হতো। যেখানে পুজো ব্যাপারটাই ছিল না। তাই তখন প্লেনে বা ট্রেনে ওঠার সময়ে বেশ কয়েকটা পূজাবার্ষিকী সংখ্যা কিনে নিতাম। এখনকার মতো তখন মোবাইল কেন, টেপ রেকর্ডারে গান শোনারও কোনও ব্যবস্থা ছিল না। হোটেলে টিভি দেখারও কোনও সুযোগ ছিল না। তাই বই পড়ে, আড্ডা মেরেই খেলা ও প্র্যাক্টিসের বাইরে আমাদের অবসর সময়টা কাটত। যে কথাটা বলব বলে লেখাটা শুরু করেছিলাম, সেটা হলো বর্তমানে ভারতীয় ফুটবলারদের ভীষণভাবে ম্যাচের সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে। বিদেশি বাদ দিন, এখন আমাদের স্বদেশি ফুটবলাররাও বছরে কোটি কোটি টাকা পেমেন্ট পাচ্ছে ক্লাব ফুটবল খেলে। তা পাক। যুগ বদলাচ্ছে। আর্থ-সামাজিক কাঠামোও বদলাচ্ছে। পেমেন্টের কাঠামোও তো বদলাবে। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের মানের উন্নয়ন তো হচ্ছে না। বরং দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছে আমার প্রাণের খেলা। টানা চার বার হাওড়া সদর কেন্দ্র থেকে লোকসভা নির্বাচনে জিতে আমি সাংসদ। দেশের প্রথম ও একমাত্র ফুটবলার-সাংসদ আমিই। সাংসদ হওয়ার সূত্রেই নানা কাজে সারা দেশে ঘুরে বেড়াতে হয় আমাকে। আর সব জায়গাতেই আমাকে শুনতে হয়, কেন আমাদের দেশের ফুটবলের এমন অধঃপতন? এই প্রশ্নের জবাব এক কথায় হয় না। তবে ভারতীয় টিমের প্রাক্তন অধিনায়ক হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের দেশের ফুটবলারদের আরও অনেক বেশি ম্যাচ খেলতে হবে। তার জন্য দেশের ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে স্বমহিমায়।
এক কোটি টাকা বছরে পেমেন্ট পাওয়া এক জন ভারতীয় ফুটবলার এখন বছরে মেরেকেটে কুড়িটা ম্যাচও খেলেছে না। আইএসএল বা আই লিগ ছাড়া দেশে সেই অর্থে বড় টুর্নামেন্ট নেই। সুপার কাপ, ডুরান্ড কাপ হলেও ক্লাবগুলো এই টুর্নামেন্টগুলোকে গুরুত্বই দেয় না। স্থানীয় লিগে তারকা ফুটবলারদের খেলানোই হয় না। সন্তোষ ট্রফিতে সিনিয়র ফুটবলারদের খেলানো তো বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেই কবেই! তাহলে ফুটবলাররা নিজেদের মেলে ধরবে কোথায়? কী ভাবেই বা তারা তৈরি করবে ম্যাচ টেম্পারামেন্ট। আর ম্যাচ না খেলার জন্য জাতীয় টিমের হয়ে খেলার সময় এই ফুটবলারদের মধ্যে লড়াকু মানসিকতা গিয়েছে হারিয়ে।
আবার ফিরি আমাদের সময়ে। মার্চ মাসে দলবদল হয়ে যেত। পয়লা বৈশাখে বারপুজোর দিনই শুরু হয়ে যেত জোরকদমে প্র্যাক্টিস। মে মাসে শুরু হতো কলকাতা লিগ। তিন মাস ধরে চলা লিগেই আমাদের কুড়িটার বেশি ম্যাচ খেলতে হতো। লিগ শেষ হলেই শুরু আইএফএ শিল্ড। তখন শিল্ড চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে সব মিলিয়ে প্রায় দশটা ম্যাচ খেলতে হতো। শিল্ড শেষ হতে না হতেই ব্যাগ-পত্তর গুছিয়ে বরদলৈ কাপ, দার্জিলিং গোল্ড কাপ, তার পরে ডিসিএম, ডুরান্ড কাপ, রোভার্স কাপ। ফিরতে না ফিরতেই দাক্ষিণাত্য সফরে বেরিয়ে পড়া। নাগজি, বন্দেরকর, স্ট্র্যাফোর্ড কাপে খেলতে হতো। পরে চালু হয় ফেডারেশন কাপ। এ সব খেলে ফিরেই আবার বাংলা টিমের হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে খেলতে চলে যাওয়া। সন্তোষ ট্রফি তিন-চার সপ্তাহ ধরে চলত। ম্যাচও খেলতে হতো অনেকগুলো করে। সন্তোষ ট্রফির সময়েই বিভিন্ন ক্লাবের রিক্রুটাররা ঝাঁপিয়ে পড়ত ফুটবলারদের তুলে নেওয়ার জন্য। আবার জাতীয় নির্বাচকরাও থাকতেন দেশের টিম গঠনের জন্য ফুটবলার বাছতে। ক্লাব ও বাংলার হয়ে খেলার পরে দেশের হয়ে বছরে অনেকগুলো ম্যাচ খেলতে যেতে হত নানা জায়গায়। তার জন্য শিবিরেও থাকতে হতো মাসের পরে মাস। এখানেই শেষ নয়, আমাদের প্রায় সব ফুটবলারকেই অফিস টিমের হয়েও খেলতে হতো। আবার খেলতে যেতে হতো নানা প্রদর্শনী ম্যাচেও। কেউ কেউ তো জেলার ফুটবল লিগেও নিয়মিত খেলেছে জাতীয় তারকা হয়ে যাওয়ার পরেও। এখানকার দিনে এ সব গল্প কথার মতো শোনাবে। সারা বছর ধরে তাই সব মিলিয়ে আমরা একশোর বেশি ম্যাচ খেলেছি। তাতে আমরা আনফিট হয়নি। অসুস্থও হয়নি। চোট লাগলে কয়েক দিনের বিশ্রামে সেরেও উঠেছি। আমাদের ফুটবলার জীবন কমেও যায়নি। পনেরো-কুড়ি বছর তো সবাই দাপিয়ে খেলেছে আমাদের সময়ে। ফলে ফুটবল খেলাটা আমাদের কাছে ছিল জল-ভাতের মতো। এখানকার ছেলেদের দেখে মনে হয়, বহু কষ্ট করে যেন তারা খেলছে! সারা বছর ধরেই খেলার সঙ্গে থেকেছি বলেই বোধহয় আমাদের রক্তে ফুটবলটা মিশে গিয়েছে। যা খেলা ছাড়ার এত বছর পরেও রয়ে গিয়েছে। এখনও কোনও জায়গায় খেলে হলে দাঁড়িয়ে পড়ে উত্তেজনার আঁচ পোহাই। ফুটবল নিয়ে আলোচনা হলে জোর করেই নাক গলিয়ে ফেলি। এখনকার কথায় ফিরি। ছেলেদের ম্যাচের সংখ্যা বাড়াতেই হবে। ইউরোপের ফুটবলের দিকে তাকিয়ে দেখুন। কয়েক বছর আগেও মেসি-রোনাল্দোরা যখন ইউরোপের ক্লাবে খেলত, তখন তারা সারা বছরে চল্লিশটার বেশি ম্যাচ খেলত ক্লাবের জার্সিতে। সঙ্গে দেশের হয়ে আরও গোটা পনেরো-কুড়ি ম্যাচ। সেখানে আমাদের সুনীল ছেত্রী, শুভাশিস বসুরা তো তিরিশটা ম্যাচও খেলে না সারা মরশুমে। মার্চ-এপ্রিলে ফুটবল সিজ়ন এখন শেষ হয়। তার পরের মরশুম শুরু হয় অগস্টে। অর্থাৎ তিন থেকে চার মাস ফুটবলাররা বিশ্রামে চলে যাচ্ছে। এটা শুধু যে কোনও ফুটবলার নয়, যে কোনও খেলোয়াড়ের কাছেই ফিটনেস নষ্ট হয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। আমার পরামর্শ, ফুটবলারদের সারা বছর খেলার মধ্যে রাখতে দেশের সব নামি টুর্নামেন্টগুলো ফের চালু হোক। ক্লাবগুলো গুরুত্ব দিয়েই টুর্নামেন্টগুলো খেলুক, তাদের সব তারকাকে নিয়েই। আমাদের দেশের ক্রিকেটারদের কথাটা ভাবুন। ক্রিকেটে ভারত বিশ্বসেরা। কারণ ক্রিকেটাররা সারা বছর ধরেই খেলে চলেছে। ওদের অফ সিজ়ন বলে কিছু হয় না। আইপিএল খেলছে। তার পরে দেশের হয়ে তিন ফর্ম্যাটে সারা বছর ধরেই অজস্র ম্যাচ খেলার হাতছানি। যারা দেশের হয়ে খেলে না, তারা দীর্ঘ ফর্ম্যাটের রঞ্জি ট্রফি ও জাতীয় পর্যায়ের ওয়ান ডে আর টি-টোয়েন্টিতে খেলে। আনফিট হয়ে পড়লে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিতে মাসের পর মাস পড়ে থেকে ফিটনেস ট্রেনিং করে। ভারতীয় ফুটবলারদের সামনে সেই সুযোগ কোথায়? আর না খেলে, কম প্র্যাক্টিস করে ফুটবলারদের মানসিকতায় ঢুকে গিয়েছে ফাঁকিবাজি। এই ফাঁকিবাজি মানসিকতা শুধু তাদের ক্ষতি করছে না, ভারতীয় ফুটবলকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে।




